Uncategorized

সড়কে রেহাই পাচ্ছেন না সরকারি কর্মকর্তা-পুলিশ সদস্যরাও

ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে ততই বেপরোয়া হয়ে উঠছে ছিনতাইকারীরা। তাদের সামনে পড়লে চাপাতির কোপ থেকে বাঁচতে নিজের কাছে থাকা সবকিছু দিয়ে দিতে হচ্ছে ভুক্তভোগীদের। যারাই দিতে চাচ্ছেন না তাদের ওপর পড়ছে চাপাতির কোপ। এ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না ছিনতাইয়ের কবলে পড়া সরকারি উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারাও। এমনকি চাপাতির কোপের ভয়ে অস্ত্র পর্যন্ত ছিনতাইকারীর হাতে দিয়ে দিচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। সব মিলিয়ে রাজধানীতে চাপাতি হাতে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে ছিনতাইকারীরা।  

দুদকের মহাপরিচালক ছিনতাইয়ের শিকার

শনিবার (৭ মার্চ) রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে তারাবি নামাজ শেষে হাঁটাহাঁটি করছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক মোতাহার হোসেন। এ সময় তিনি ছিনতাইয়ের শিকার হন। তিন ছিনতাইকারী তার আইফোন, মানিব্যাগ ও হাতঘড়ি ছিনিয়ে নেয়। আইফোনের পাসওয়ার্ড জানতে চেয়ে তাকে মারধরও করা হয়। ছিনতাইকারীদের কাছে ধারালো চাপাতি ছিল। এ ঘটনায় মোতাহার হোসেনের স্টাফ কর্মকর্তা জাবেদ হোসেন সজল পরদিন মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন। পরে মোবাইল ফোন উদ্ধারসহ দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। 

মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেজবাহ উদ্দিন বলেন, এ ঘটনায় সন্দেহভাজন দুজনকে আটক করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

নারায়ণগঞ্জে পুলিশের অস্ত্র ছিনতাই

সোমবার (৯ মার্চ) ভোরে নারায়ণগঞ্জ শহরের নিতাইগঞ্জ এলাকায় দায়িত্ব পালনের সময় শীতলক্ষ্যা পুলিশ ফাঁড়ির সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) লুৎফর রহমানের ওপর হামলা চালায় মোটরসাইকেলে আসা তিন ছিনতাইকারী। তারা এএসআইয়ের ব্যবহৃত গুলিভর্তি পিস্তলটি ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। ঘটনার পরপরই জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক দল সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে ওই দিন সন্ধ্যায় মিশাল নামে এক ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করে। পরে সোমবার দিবাগত রাত পৌঁনে ৩টার দিকে অভিযানকালে মিশালের দেখানো পথে, বন্দর উপজেলার উইলসন রোড এলাকার শরিফ উদ্দিন নামে এক ব্যক্তির বাড়ির সামনে পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বস্তার ভেতরে কাপড়ের শপিং ব্যাগে মোড়ানো অবস্থায় ছিনতাই হওয়া পিস্তলটি উদ্ধার করা হয়। এছাড়া একটি চাপাতি, একটি ছোরা এবং একটি বড় চাকু উদ্ধার করা হয়েছে।

শুধু এই ঘটনাগুলো নয়, ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে চারিদিকে বাড়ছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। ঈদে শপিং করে বাড়ি ফেরার পথে ছিনতাইকারীর হাতে পড়ার বর্ণনা লেখেন আতিয়া সুলতানা নামে এক নারী। বাংলামোটর ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সময় তার হাতে থাকা ব্যাগটি নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। অল্পের জন্য তিনি ছিনতাইকারীদের হাতে থাকা চাপাতির কোপ থেকে রক্ষা পান বলে জানান। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবেশের মূল চত্বরে একটু সামনে চাপাতির কোপের ভয়ে এক প্রবাসীর ভাই তার ব্যাগ দিয়ে দেন ছিনতাইকারীর হাতে। ব্যাগে ১৫ হাজার টাকা ও মোবাইল ফোন ছিল। এ ঘটনার ভিডিও সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়।   

ভ্যান নিয়ে যাত্রাবাড়ীর দিকে যাওয়ার সময় ফয়জুর রহমান নামে এক বৃদ্ধ জুরাইনের মুন্সিবাড়ী এলাকায় ছিনতাইয়ের শিকার হন। ধারালো অস্ত্রের পোঁচ দিয়ে তার মোবাইল ফোন এবং ৫ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।

অভিযোগ রয়েছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই পথচারীরা ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন।

রাজধানীতে ৪৩২ ছিনতাইপ্রবণ স্থান

গোয়েন্দা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর আটটি ক্রাইম জোনে ৪৩২টি ছিনতাইপ্রবণ স্থান রয়েছে। এসব এলাকায় প্রায় ৯৭৯ জন ছিনতাইকারী সক্রিয়। এর মধ্যে মিরপুর ও তেজগাঁও বিভাগে ৩৮৬ জন, মতিঝিল ও ওয়ারী বিভাগে ২১২ জন, রমনা ও লালবাগ বিভাগে ২১৭ জন এবং উত্তরা ও গুলশান বিভাগে ১৫৪ জন ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাসে ডিএমপির বিভিন্ন থানায় ছিনতাইয়ের ঘটনায় ৩০৮টি অভিযোগ দেওয়া হয়।

পুলিশ সদর দফতরের মাসিক অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে সারা দেশে ছিনতাইসহ দস্যুতার ঘটনায় ১৬৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীতে ২৯টি এবং ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ৪২টি মামলা হয়। এছাড়া ফেব্রুয়ারি মাসে ১৩৭টি মামলা হয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এসব ছিনতাইয়ের প্রায় ৬৫ শতাংশই মোটরসাইকেল ব্যবহার করে সংঘটিত। এছাড়া প্রায় ২০ শতাংশ ছিনতাই সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে এবং বাকি ১৫ শতাংশ ছদ্মবেশে বা কথার ছলে পথচারীদের বিভ্রান্ত করে সংঘটিত হয়।

তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, অপরাধের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। কারণ বেশির ভাগ ভুক্তভোগী আইনি ঝামেলা এড়াতে মামলা না করে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) মোহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, ছিনতাই প্রতিরোধে রাত্রিকালীন টহল বাড়ানো হয়েছে। প্রতিটি থানায় বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেফতার করা হয়।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাতের বেলা পুলিশের টহল কম থাকায় ছিনতাইকারীরা সুযোগ পাচ্ছে। বেকারত্ব, মাদকাসক্তি, পর্যাপ্ত সিসিটিভি ও স্ট্রিট লাইটের অভাব এবং আইনি দুর্বলতাও ছিনতাই বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।

বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিশ্লেষক ড. কুদরাত-ই খুদা বাবু বলেন, যে কোনও উৎসবকে ঘিরে এ ধরনের অপরাধীরা সক্রিয় হয়ে উঠে। তারা পুলিশের অস্ত্র পর্যন্ত ছিনতাই করে। সরকারী উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারাও রেহাই পান না।

তিনি বলেন, পুলিশ আগের চেয়ে এখন সক্রিয়, তাদের আরও সক্রিয় হতে হবে। এসব ছিনতাইকারীকে দমন করতে হবে। মানুষের মনে আস্থা আনতে হবে, যেন তারা রাতের বেলাতেও ঘুরতে নিরাপদ মনে করে।

বেসরকার ব্যাংকের কর্মকর্তা নাজমুল হক রানা বলেন, পাড়া-মহল্লাতে রাত ১০টার পর যদি বের হতে ভয় পেতে হয় তাহলে আমাদের আর বলার কিছু নাই।

তিনি বলেন, পুলিশকে এসব ছিনতাইকারী কিশোরগ্যাংয়ের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ করতে হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেভাবে মোহাম্মদপুরে পুলিশ প্রতিদিন অভিযান চালায় এ রকম সব এলাকাতে অভিযান চালাতে হবে। মানুষের মধ্যে থাকা ভীতি ও আতঙ্ক দূর করতে হবে।  

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ছিনতাই-ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সারা দেশের পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ছিনতাই প্রতিরোধে টহল জোরদার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সড়ক, মহাসড়ক, নৌ ও রেলপথে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মহাসড়কে ডাকাতি ও দস্যুতা রোধে হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি জেলা পুলিশকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। র‌্যাবও এই কাজে সহায়তা করছে।




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button