ভিন্নমাত্রার একুশ ও ভিন্নযাত্রায় একুশ!

অমর একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন কি একটি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড? নাকি এটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠান? নাকি ইতিহাস উদযাপনের বংশ পরম্পরার রীতিনীতি? নাকি একুশ উৎযাপন শেষ বিচারে একটি রাজনৈতিক অনুষ্ঠান? আমরা একুশকে নিয়ে কি কখনও এভাবে ভেবেছি? প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি আসে, আমরা শোকের প্রতীকী পোশাক সাদা-কালো শাড়ি-পাঞ্জাবি পরে খালি পায়ে ভাষা শহীদদের সম্মান জানাতে শহীদ মিনারে যাই, পুষ্পস্তবক অর্পণ করি। সমবেত কণ্ঠে তুলে নিই “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?” কিন্তু আমরা ভুলে যাই।
বছরের ৩৬৫ দিনের একটা দিন উদযাপনের মধ্য দিয়ে আমরা একুশকে এবং অমর একুশের ভাষা-শহীদদের স্মরণ করি; আর বাকি ৩৬৪ দিন আমরা বিস্মরণ করি। তাই প্রশ্নটা জোরালোভাবে মাথায় কাজ করছে, অমর একুশে উদযাপন কি সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক নাকি রাজনৈতিক অনুষ্ঠান বা অনুশীলন। ২০২৫ সালের অমর একুশে উদযাপনের যে তরিকা আমরা দেখেছি, কোনোরকম দায়সারা গোছের কিছু একটা করা, সেটাও এ প্রশ্ন উত্থাপনের পেছনের অনুঘটনের কাজ করেছে। আমাদের সমাজ যেখানে সবকিছুতে দ্বিধাবিভক্ত এবং দ্বি-বিভাজনের করাতে কাটা, সেখানে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ এবং বিপক্ষ শক্তির রাজনীতি ও রাজনৈতিক দর্শন নির্ধারণ করে অমর একুশে উদযাপনের আবেগ, রীতি ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের মেকিপনা বা গভীরতা। তাই, এবছরে ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখের পর বাংলাদেশের গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা শুরুর প্রাক্কালে অমর একুশে একটি ভিন্নমাত্রা, ভিন্ন তাৎপর্য এবং ভিন্ন ব্যাঞ্জনা নিয়ে হাজির হয়েছে।
২০২৫ সালের অমর একুশে উৎযাপনে কোথায় জানি আত্মার টানের একটু অভাব ছিল; কোথায় জানি আবেগের ঘাটতি ছিল; কেমন জানি ভালোবাসার টানাটানি ছিল; আর ছিল অমর একুশের ইতিহাসের সূর্যসন্তানদের প্রতি এবং ইতিহাসের এ গৌরবান্বিত অধ্যায়ের প্রতি অন্তরের গভীর থেকে প্রকৃত শ্রদ্ধার অভাব। তাই ২০২৬ সালের অমর একুশে ফেব্রুয়ারি ভিন্নমাত্রা নিয়ে হাজির হয়েছে আমাদের জাতীয় জীবনে।
মোটাদাগে আমার সবাই কমবেশি জানি, ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার রাজপথে কী ঘটেছিল। যদিও সে জানাজানিতে এখনও অনেক কিছু অজানা আছে। ভাষা আন্দোলন সম্পর্কিত যে মহাবয়ান সমাজে এবং জনপরিসরে জারি আছে তার বরাত দিয়ে আমরা মোটামুটি সবাই জানি যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে ঢাকার রাজপথে সেদিন নেমে আসা বাঙালি ছাত্রজনতার ওপর পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর নির্বিচার গুলিবর্ষণে শহীদ হয় সালাম, বরকত, রফিক, জাব্বারের মতো বাংলার নির্ভীক দামাল সন্তানেরা। তখন থেকেই আমরা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কী ভুলিতে পারি’ কণ্ঠে তুলে নিয়েছি, চেতনায় ধারণ করেছি এবং অন্তরে লালন করেছি। সমাজের প্রগতিশীল অংশ একুশকে কখনও ভুলেনি বা ভুলতে পারেনি। আর পারে নাই বলেই, একুশ আমাদের পথ দেখিয়েছে, সাহস জুগিয়েছে, এবং নির্ভীক প্রতিবাদী হওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছে।
তাই তো একুশের হাত ধরে একুশের পরম্পরা হিসাবে বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসে এসেছে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২ এর ছাত্র আন্দোল, ১৯৬৬ ছয়দফার আন্দোলন, ১৯৬৯ গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের বিপুল বিজয় এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা। এসব কিছুতেই প্রেরণা ছিল একুশের চেতনা, প্রতিবাদী উত্তরাধিকার এবং দেশপ্রেমের তীব্র আবেগ। তাই বাঙালির স্বাধীকার আন্দোলনে এবং স্বাধীনতার সোপানে ক্রমান্বয়ে পৌঁছানোর পেছনে অমর একুশে, একুশের চেতনা এবং ভাষা আন্দোলনের মূল প্রতিবাদী দর্শনটি তীব্র প্রেরণা হিসাবে কাজ করেছে। তাই একুশ কেবলই সন্তান হারানোর শোকে কাতর কোনও বিশেষ দিবস নয়; বরং একুশ একটি চেতনার নাম, একুশ একটি বিপ্লবের নাম, একুশ একটি দর্শনের নাম, একুশ একটি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করার উজ্জ্বল নজিরের দিন।
কবি মাহবুব—উল—আলম তাই লিখেছিলেন, ‘আমি কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’। একুশ আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে শোককে শক্তিতে পরিণত করে অধিকতর তীব্রতায় দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বাধীকার থেকে স্বাধীনতা অর্জনের দার্শনিকতা থেকে প্রায়োগিক বাস্তবায়নের দিকে ধাবিত হতে হয়। একুশ কেন্দ্রীক যাবতীয় লেখালেখিতে আমরা একুশকে একদিকে যেমন পাই দেশের জন্য আত্মত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বীবিত হওয়া প্রেরণা, তেমনি অন্যদিকে পাই পাকিস্তান বিরোধী একটি তীব্র দার্শনিক ভিত্তির প্রস্তরিত সূচনা যা বাঙালিকে একটি স্বাধীনতা ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের দিকে ধাবিত করেছিল। তাই আমরা স্বীকার করি কিংবা না-করি ভারত বিরোধিতার নামে অতিমাত্রায় পাকিস্তান প্রীতি আমাদের একুশের মাহাত্মকে ম্লান করেছে। একুশের আবেগকে খাটো করেছে।
এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের হাত ধরে পাকিস্তান নামক ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের দর্শন নিয়ে যে রাষ্ট্রের জন্ম হয়, তার অধীন পূর্ব—পাকিস্তান হিসাবে তৎকালীন পূর্ববাংলার, বর্তমান বাংলাদেশের, একত্রে একসাথে থাকা রীতিমত প্রায় অসম্ভব ছিল। এটা ছিল কেবলই একটা সময়ের ব্যাপার। পাকিস্তানি শাসকশ্রেণি কর্তৃক রাষ্ট্রভাষা হিসাবে উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার চিন্তা একুশে ফেব্রুয়ারির জন্ম দিয়েছে। ভাষার প্রশ্নে একত্রিত হওয়া, প্রতিবাদী হওয়া এবং নিজের জীবন দিয়ে ভাষার দাবি আদায় করার মধ্য দিয়েই মূলত তৎকালী পূর্ব—পাকিস্তানের জনগণের সামনে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায় যে, পাকিস্তানের সাথে একসঙ্গে থাকা এবং বসবাস করা সম্ভব নয়। এই যে অ—সম্ভাবনার গভীর রাজনৈতিক উপলব্ধি, সেটাই বাঙালির জন্য একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বপ্ন, বাসনা এবং আকাঙ্ক্ষার জন্ম দেয়। এরকম একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রচিন্তার ভেতর দিয়েই মূলত বাঙালির রাজনৈতিক চেতনা তথা বাঙালির একটি জাতীয়তাবাদী সত্তার জন্ম দেয় যা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদেরকে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক কমিউনিটি হিসাবে ইতিহাসে হাজির করে এবং তাৎপর্যের সাথে স্থান দেয়।
তাই ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের একটি গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে কালজয়ী পিরিয়ড যা ‘বাংলাদেশ’ নামক একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে। অতএব একুশ একাত্তরকে প্রেরণা জুগিয়েছে। আর একাত্তর প্রশ্নে আমাদের জাতীয় জীবনে কোনও চূড়ান্ত ফয়সালা না-হওয়ার কারণে ২০২৫ সালের ‘একুশ’ ততটা আবেগে-ভালোবাসা-শ্রদ্ধায় মহিমান্বিত ছিল না। কিন্তু ২০২৬ সালের একুশ একটি ভিন্নমাত্রা নিয়ে নতুন যাত্রা শুরু করেছে।
সবাইকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ও ‘অমর একুশে’র শুভেচ্ছা।
লেখক: নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।



