ভারতে ‘হিন্দুত্ববাদী’ উত্থানের নতুন গবেষণাগার এখন সম্ভল

আদালতের নির্দেশে আইনজীবী যখন ১৬শ শতকের এক ঐতিহাসিক মসজিদের সরু গলি দিয়ে বেরিয়ে আসছিলেন, তখন চারপাশ ঘিরে নিরাপত্তা রক্ষী আর সমর্থকদের ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি। অন্যদিকে মসজিদ রক্ষায় জড়ো হওয়া উত্তেজিত মুসলিম জনতা। মুহূর্তের মধ্যেই সেই উত্তেজনা রূপ নিলো প্রাণঘাতী সংঘাতে। পুলিশের লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস আর গুলিতে ঝরল অন্তত পাঁচটি প্রাণ।
উত্তরপ্রদেশের সম্ভল শহরের এই চিত্রটি কেবল একটি দাঙ্গার গল্প নয়; বরং এটি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র থেকে ‘হিন্দু’ রাষ্ট্রে রূপান্তরের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। ভারতের হিন্দু ডানপন্থিদের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রার প্রতীক এখন এই শহর। যেখানে প্রশাসন, পুলিশ এবং বিচার বিভাগ; সবই যেন এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।
ইতিহাস বনাম আইনি লড়াই
সম্ভলের শাহি জামে মসজিদটি মুসলিমদের কাছে তাদের পরিচয়ের এক দুর্গ। কিন্তু হিন্দুত্ববাদীদের কাছে এটি ‘বিদেশি আগ্রাসনের’ এক ঘৃণ্য প্রতীক। তাদের দাবি, এই মসজিদটি একটি প্রাচীন মন্দিরের ওপর নির্মিত। এই প্রত্নতাত্ত্বিক দাবিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ২০২৪ সালের শেষের দিকে আদালতে আবেদন করেন আইনজীবী বিষ্ণু শঙ্কর জৈন। উল্লেখ্য, এই জৈনের বাবা ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের নেপথ্যে থাকা আইনি দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন।
আদালতের আদেশের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রাতের অন্ধকারে শুরু হয় জরিপ কাজ। আমলাতন্ত্রের চিরচেনা ধীরগতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রশাসনের এই ‘অস্বাভাবিক তৎপরতা’ স্থানীয় মুসলিমদের মনে ভীতি ও সন্দেহের জন্ম দেয়।
দমনে ‘বুলডোজার’ নীতি ও ডিজিটাল নজরদারি
সংঘর্ষের পর সম্ভলকে বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় ইন্টারনেট। পুলিশ প্রায় ২ হাজার ৭৫০ জন ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করে, যা স্থানীয় মুসলিমদের কাছে এক নীরব হুমকি, যেকোনও সময় যেকোনও নাম সেখানে যুক্ত হতে পারে। ফোনের লোকেশন ডেটা ব্যবহার করে আটক করা হয় কয়েক ডজন মানুষকে।
নিহত ১৭ বছর বয়সী আয়ানের মা নাফিসা কান্নভেজা কণ্ঠে বলেন, ‘এই ব্যবস্থা আর তাদের বপন করা ঘৃণা আমার ছেলেকে কেড়ে নিলো।’ নিহতদের পরিবারগুলো অভিযোগ করেছে, পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ না করতে তাদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এমনকি মসজিদের পক্ষে লড়াই করা আইনজীবীকেও জেলে পাঠানো হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘হিরো’ বনাম কোণঠাসা জনপদ
সম্ভলের এই বদলে যাওয়া বাস্তবতার সবচেয়ে দৃশ্যমান মুখ হলেন পুলিশ প্রধান অনুজ চৌধুরী। কুস্তিগীর থেকে পুলিশ হওয়া এই কর্মকর্তা ইনস্টাগ্রামে পেশিবহুল ছবি আর ধর্মীয় রীতিনীতি পালনের ভিডিও দিয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়। তিনি সরাসরিই বলেন, “আগে মুসলিমদের তোষণ করার পুলিশি ব্যবস্থা ছিল, এখন আমরা শুধু আইন কার্যকর করছি।”
অন্যদিকে, উত্তরপ্রদেশের বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এই শহরকে তার ‘স্ট্রংম্যান’ ভাবমূর্তি গড়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। আগামী বছরের নির্বাচনে এটিই হতে চলেছে তার তুরুপের তাস। তার শাসনে এখন প্রকাশ্য হিন্দু ধর্মীয় আচারই ‘স্বাভাবিকতা’, আর অন্য ধর্মের প্রকাশ সেখানে সংকুচিত।
বদলে যাওয়া সম্ভল
সম্ভলের ৩ লাখ জনসংখ্যার তিন-চতুর্থাংশই মুসলিম। কিন্তু এখন তাদের ধর্মীয় উৎসব বা প্রার্থনা ব্যক্তিগত পরিসরেই সীমাবদ্ধ রাখতে হচ্ছে। মসজিদের ঠিক পাশেই তৈরি করা হয়েছে বিশাল এক পুলিশ স্টেশন, যার দেয়ালে আঁকা হয়েছে মহাভারতের রণক্ষেত্রের দৃশ্য।
গত জুলাইয়ে যখন ‘কানওয়ার যাত্রা’ পালিত হয়, তখন মুসলিম পাড়ার ভেতর দিয়ে উচ্চশব্দে ডিজে বাজিয়ে মিছিল গেছে। স্থানীয় হিন্দু নেতা কান্তিক্রান্ত তিওয়ারি তৃপ্তির হাসি হেসে বলেন, “আগে এসব এলাকা দিয়ে আমরা খুব ভয়ে ভয়ে যেতাম। এখন পরিস্থিতি বদলেছে।”
ভারতের দুই বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ দেবেশ কাপুর এবং অরবিন্দ সুব্রহ্মণ্যম তাদের নতুন বই ‘ওয়ান সিক্সথ অব হিউম্যানিটি’-তে লিখেছেন, “ভারত এখন লেনদেনভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক গোঁড়ামির দিকে ধাবিত হচ্ছে।” সম্ভল আজ সেই প্রাতিষ্ঠানিক গোঁড়ামির এক জীবন্ত গবেষণাগার।



