ভূ-রাজনীতির মোড় পরিবর্তন ও এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

২০২২ সালের সেই ফেব্রুয়ারিতে যখন রাশিয়ার ট্যাঙ্কগুলো ইউক্রেন সীমান্ত অতিক্রম করেছিল, অনেকের ধারণা ছিল এটি একটি আঞ্চলিক সংঘাত যা দ্রুতই থেমে যাবে। কিন্তু চার বছর পর আজ সেই সংঘাত কেবল ইউক্রেনের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্ব ভূ-রাজনীতির এক মহানির্ণায়ক সন্ধিক্ষণ। ইউক্রেন যুদ্ধের চার বছর পূর্ণ হওয়ার প্রাক্কালে ইউরোপ আজ নতুন করে অস্ত্রসজ্জায় বাধ্য হচ্ছে, পরিবর্তন আসছে জ্বালানি অর্থনীতির মানচিত্রে, আর বদলে যাচ্ছে দীর্ঘদিনের বৈশ্বিক মিত্রতার সমীকরণ। মার্কিন সাময়িকী ফরেন পলিসির এক পর্যালোচনায় এমন পরিস্থিতির কথা উঠে এসেছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও বেগবান করেছে। ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়া বন্ধ করা এবং রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করার ব্যাপারে ট্রাম্পের অতি আগ্রহ ইউরোপকে বাধ্য করছে নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরাই নিশ্চিত করতে। ওয়াশিংটন যখন পশ্চিমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজের গোলার্ধের দিকে মনোনিবেশ করছে, ইউরোপ তখন নতুন মিত্রের সন্ধানে এগোচ্ছে এক ‘পোস্ট-আমেরিকান’ বা আমেরিকা-পরবর্তী বিশ্বের পথে।
গত চার বছরে এই যুদ্ধ অসংখ্য সামরিক পূর্বাভাসকে ভুল প্রমাণ করেছে। কিয়েভের কোনও প্রথাগত নৌবাহিনী নেই, তবুও তারা রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরের বড় অংশকে ডুবিয়ে দিয়েছে বা তাড়িয়ে দিয়েছে। ডনবাসের রণক্ষেত্র থেকে ৩ হাজার মাইল দূরে রাশিয়ার কৌশলগত বোমারু বিমান ধ্বংস করছে ইউক্রেনীয় ড্রোন। গত বছর ইউক্রেন প্রায় ৩০ লাখ ড্রোন উৎপাদন করেছে, যার অনেক যন্ত্রাংশ তৈরি হয়েছে থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তিতে। অন্যদিকে, রাশিয়ার ড্রোনগুলো ফাইবার অপটিক গাইডেন্স সিস্টেম ব্যবহার করায় পূর্ব ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্র এখন মাকড়সার জালের মতো সরু তারে ঢাকা পড়ে আছে।
সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো ইউক্রেনীয়দের টিকে থাকা। রাশিয়ার বিশাল সামরিক বাহিনীর তুলনায় তারা জনবল ও সম্পদে অনেক পিছিয়ে থাকলেও দমে যায়নি। অথচ ক্রেমলিনের পরিকল্পনা ছিল মাত্র ১০ দিনে কিয়েভ দখল করা। এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, রাশিয়ার হয়ে উত্তর কোরিয়ার সেনারা প্রাণ দিচ্ছে, আর আফ্রিকার মালিতে রাশিয়ার ভাড়াটে যোদ্ধাদের মারতে সাহায্য করছে ইউক্রেনীয় গোয়েন্দারা।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যুদ্ধ থামানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবতা ভিন্ন। ভ্লাদিমির পুতিন মনে করেন সময় তার পক্ষে, তাই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আলোচনা এখন রাশিয়ার কাছে শুধু একটি লোকদেখানো বিষয়। পুতিন বুঝতে পেরেছেন ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্য রাশিয়ার সঙ্গে লাভজনক ব্যবসায়িক চুক্তি করা। এই সুযোগে পুতিন ট্রাম্পকে তুষ্ট রেখে ইউক্রেনের ওপর চাপ প্রয়োগ করছেন।
অভিজ্ঞ কূটনীতিকদের বদলে ট্রাম্প তার আবাসন ব্যবসায়ী বন্ধু স্টিভ উইটকফকে বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। উইটকফ ছয়বার রাশিয়া সফর করলেও এখনও ইউক্রেন যাননি। সাবেক কেজিবি কর্মকর্তা পুতিন খুব সহজেই এই মার্কিন প্রতিনিধিদের প্রভাবিত করছেন। রাশিয়ার দাবি মেনে একটি শান্তি পরিকল্পনা ফাঁস হয়েছে, যেখানে ইউক্রেনকে তার নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের অংশ ছেড়ে দেওয়া, ন্যাটোর আশা ত্যাগ করা এবং সামরিক শক্তি কমিয়ে ফেলার শর্ত দেওয়া হয়েছে। তবে ইউক্রেন ও ইউরোপ এই একতরফা শর্ত মানতে নারাজ।
ইউক্রেনের সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আন্দ্রি জাগোরোদনিউক মনে করেন, এই যুদ্ধ এখন পুতিন সরকারের অস্তিত্বের ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাশিয়ার অর্থনীতি এখন যুদ্ধকালীন উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। তাই যুদ্ধ থামলে পুতিনের রাজনৈতিক বৈধতা সংকটে পড়তে পারে। ইউক্রেনীয়দের ভয় হলো, এখন কোনও ছাড় দিলে রাশিয়া সেই সুযোগে পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করবে এবং পরে আরও বড় হামলা চালাবে।
ইউরোপীয় দেশগুলো নিরাপত্তা গ্যারান্টির কথা বললেও তার কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ রাশিয়ার মতো একটি শক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর মতো প্রস্তুতি বা মানসিকতা এখনও অনেক পশ্চিমা দেশের নেই।
ইউক্রেন থেকে শিক্ষা নিয়ে ফিনল্যান্ড, পোল্যান্ড এবং বাল্টিক দেশগুলো (এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়া) যুদ্ধের জন্য জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। পোল্যান্ড তার জিডিপির প্রায় ৪.৫ শতাংশ সামরিক খাতে ব্যয় করছে, যা ন্যাটোর মধ্যে সর্বোচ্চ। ফিনল্যান্ড রাশিয়ার গভীরে আঘাত হানতে সক্ষম মিসাইল সংগ্রহ করছে। এস্তোনিয়া তার ছোট বাজেটের মধ্যেও বিশাল সংরক্ষিত বাহিনী ও সীমান্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। পশ্চিম ইউরোপ যখন দোদুল্যমান, তখন পূর্ব ও উত্তর ইউরোপের এই দেশগুলোই এখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে মূল প্রতিরোধ দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার-এর জর্জ ব্যারোস মনে করেন, পুতিন বিশ্বকে এটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে রাশিয়ার জয় অনিবার্য। ট্রাম্পও এখন সেই সুরে কথা বলছেন। অথচ যুদ্ধের বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ২০২৫ সালে রাশিয়া ইউক্রেনের মাত্র শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ এলাকা দখল করতে পেরেছে। এই গতিতে পুরো ডনেস্ক দখল করতে রাশিয়ার ২০২৭ সাল পর্যন্ত সময় লাগবে, আর পুরো ইউক্রেন দখল করতে লাগবে প্রায় এক শতাব্দী। প্রতিদিন রাশিয়ার গড়ে ১ হাজার ২০০ সেনা হতাহত হচ্ছে। রাশিয়ার স্বর্ণের রিজার্ভ কমছে এবং অর্থনীতিতে শ্রমিকের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
এই যুদ্ধ ইউরোপ ও এশিয়াকে এক সুতায় গেঁথে দিয়েছে। রাশিয়ার পক্ষে উত্তর কোরিয়ার অস্ত্র ও সেনা আসা যেমন একটি নতুন বাস্তবতা, তেমনি ইউক্রেনের পক্ষে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সমর্থনও গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপ এখন রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদার করছে।
যুদ্ধের চার বছর পর একটি বিষয় স্পষ্ট, ইউক্রেনের নিরাপত্তা এখন আর কেবল ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করছে না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং পোল্যান্ড-ফিনল্যান্ডের মতো দেশগুলোই এখন এই যুদ্ধের নেতৃত্ব নিচ্ছে। প্রকৃত শান্তি তখনই আসবে যখন ভ্লাদিমির পুতিন ক্রেমলিন ছাড়বেন এবং ইউক্রেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ পাবে।



