গাজা শান্তি মিশনে ‘বাদ পড়া’ কি তুরস্কের জন্য শাপে বর?

গাজা উপত্যকায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে গঠিত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী (আইএসএফ) থেকে শেষ পর্যন্ত তুরস্ককে বাদ দেওয়া হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি তুরস্কের জন্য একটি কূটনৈতিক ধাক্কা মনে হলেও বিশ্লেষকদের মতে, এটি আঙ্কারার জন্য একটি ‘কৌশলগত আশীর্বাদ’ বা শাপে বর হতে পারে। এর ফলে তুরস্ক একটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক অভিযান থেকে বেঁচে গেলো, অথচ উপত্যকাটিতে রাজনৈতিক ও মানবিক প্রভাব বজায় রাখার পথ তাদের জন্য এখনও খোলা। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটর এ খবর জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সভাপতিত্বে বোর্ড অব পিস-এর বৈঠকে গাজায় মোতায়েনযোগ্য আন্তর্জাতিক বাহিনীর রূপরেখা চূড়ান্ত হয়। গাজায় সেনা পাঠানোর জন্য তুরস্ক আগে থেকেই আগ্রহ দেখিয়ে এলেও ট্রাম্পের প্রস্তাবিত এই বাহিনীতে তাদের রাখা হয়নি।
গাজায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতির ঘোরবিরোধী ইসরায়েল। তেল আবিবের আশঙ্কা, হামাসের সঙ্গে আঙ্কারার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গোষ্ঠীটির নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
উল্লেখ্য, তুরস্ক একমাত্র ন্যাটো সদস্য দেশ, যারা হামাসকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। হামাসের রাজনৈতিক নেতারা কাতার এবং তুরস্ক উভয় দেশেই অবস্থান করেন। গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান গোষ্ঠীটিকে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে অভিহিত করলে দুই দেশের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে।
গাজা পুনর্গঠন কার্যক্রম তদারকিতে গঠিত বোর্ড অব পিস-এর প্রথম সভায় আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনীর (আইএসএফ) কমান্ডার মেজর জেনারেল জ্যাসপার জেফারস জানান, গাজায় সেনা মোতায়েন করবে পাঁচটি দেশ। সেগুলো হলো ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, কাজাখস্তান, কসোভো ও আলবেনিয়া। এছাড়া গাজার পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছে মিসর ও জর্ডান।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এই সভায় উপস্থিত হয়ে পুনরায় সেনা পাঠানোর প্রস্তাব দিলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। জাতিসংঘে পাস হওয়া প্রস্তাব অনুযায়ী, এই বাহিনী ফিলিস্তিনি পুলিশের সঙ্গে মিলে গাজার সীমান্ত এলাকা সুরক্ষিত করবে এবং হামাসসহ অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত করবে।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের তুর্কি প্রোগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক গোনুল তোল আল-মনিটরকে বলেন, “আপাতত আইএসএফ-এ যোগ না দেওয়া তুরস্কের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।” তিনি মনে করেন, ইসরায়েলি বাহিনী গাজা থেকে পুরোপুরি প্রত্যাহারের স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি ছাড়া সেখানে তুরস্কের সেনা মোতায়েন করা হলে এরদোয়ানকে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হতো। এতে মনে হতো আঙ্কারা আসলে ইসরায়েলের গাজা নীতিকেই সহায়তা করছে।
এছাড়া হামাস শেষ পর্যন্ত নিরস্ত্রীকরণে রাজি হবে কিনা, তা নিয়ে এখনও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। এমন অস্থিতিশীল পরিবেশে তুর্কি সেনাদের সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকতো।
সেনা মোতায়েন করতে না পারাটা ওয়াশিংটনে আঙ্কারার প্রভাবের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করলেও গাজায় প্রভাব ধরে রাখতে তুরস্কের তুরুপের তাস হলো তাদের মানবিক সহায়তা এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ।
আটলান্টিক কাউন্সিলের ফেলো পিনার দোস্ত বলেন, “ইসরায়েলের আপত্তি সত্ত্বেও গাজার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তুরস্ক প্রভাবশালী ফ্যাক্টর হিসেবেই থাকবে।” খোদ ট্রাম্পও এরদোয়ানের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে গাজা শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, “প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান চমৎকার কাজ করেছেন। তিনি অনেক সাহায্য করেছেন।”
এছাড়া মানবিক সহায়তার দিক থেকে তুরস্কের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। তুর্কি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা এএফএডি এবং তুর্কি রেড ক্রিসেন্টের মাধ্যমে গাজায় ইতোমধ্যে ১ লাখ টনের বেশি খাদ্য, ওষুধ ও ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে আঙ্কারা। এই মানবিক কর্মকাণ্ডই গাজার সাধারণ মানুষের মধ্যে তুরস্কের গ্রহণযোগ্যতা ও প্রভাব টিকিয়ে রাখবে।



