Uncategorized

নতুন সরকারের সামনে শীর্ষ চার চ্যালেঞ্জ 

ইতিহাসে এমন মুহূর্ত খুব কমই আসে, যখন একটি রাষ্ট্র তার জরাজীর্ণ পুরোনো কাঠামো ভেঙে নতুনভাবে নিজেকে সংজ্ঞায়িত করার সুযোগ পায়। নবনির্বাচিত সরকারের সামনে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার তেমনই এক ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এই রাষ্ট্র পুনর্গঠনের পথটি মোটেও মসৃণ নয়। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের সামনে এখন রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন পরীক্ষা, যেখানে চারটি খাতকে শীর্ষ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে— অর্থনীতি, শিক্ষা, বাণিজ্য ও কূটনীতি। 

ভঙ্গুর অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর লড়াই 

নতুন সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে একটি স্বস্তিদায়ক অর্থনীতি পাচ্ছে না। বরং অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া ২৩ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা নিয়ে যাত্রা শুরু করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের পৃথক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভঙ্গুর অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে সরকারকে অনেক ‘অজনপ্রিয়’ সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. কে মুজেরি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “ভঙ্গুর এই অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে নতুন সরকারকে ‘জনপ্রিয় নয় এমন’ অনেক সিদ্ধান্তই হয়তো নিতে হতে পারে। আইএমএফের চাপ এড়িয়ে যাওয়া নতুন সরকারের জন্য কঠিন হবে। তারপরও এসব সিদ্ধান্তের বেশিরভাগই আসবে আইএমএফের তরফ থেকে।”   

অর্থনীতির পাঁচ প্রধান চ্যালেঞ্জ 

বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের জন্য অর্থনীতিকে সবল করতে নিতে হবে পাঁচ চ্যালেঞ্জ। এগুলো হলো— 

বাজার নিয়ন্ত্রণ: দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি রোধ ও খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা। 

ব্যাংকিং খাত: বিপর্যস্ত ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফেরানো ও রাজস্ব ঘাটতি দূর করা। 

ঋণ ও বিনিয়োগ: পাহাড়সম বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণের বোঝা সামলানো। 

মুদ্রা স্থিতি: ডলার সংকট নিরসন ও টাকার অবমূল্যায়ন রোধ করা। 

কর্মসংস্থান: বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি। 

অর্থ মন্ত্রণালয় সুত্রে জানা গেছে, অর্থন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের সঙ্গে দর-কষাকষিসহ দীর্ঘ অগ্রাধিকারের তালিকা নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। বিশেষ করে এলডিসি থেকে উত্তরণ অন্তত তিন বছর পেছানোর বিষয়টি সরকারের নীতিগত অবস্থানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। 

শিক্ষা খাতে শৃঙ্খলা ও মানোন্নয়ন 

সরকারের সামনে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত চ্যালেঞ্জের দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থা। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই শিক্ষা খাতে চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। মব কালচারের মাধ্যমে অনৈতিক দাবি আদায়, পরীক্ষা ছাড়া পাশ এবং সচিবালয়ে ঢুকে পড়ার মতো ঘটনাগুলো শিক্ষা ব্যবস্থাকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে।

শিক্ষার সংস্কারে করণীয় 

সন্ত্রাসমুক্ত ক্যাম্পাস: ছাত্র-সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তার রোধে কঠোর পদক্ষেপ। 

মেধাভিত্তিক নিয়োগ: মেডিক্যাল, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষক নিয়োগে শতভাগ স্বচ্ছতা ও মেধার প্রতিফলন। 

যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম: কর্মসংস্থানমুখী ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন। 

আস্থার পরিবেশ: শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরিয়ে আনা এবং শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

রাজধানীর দনিয়া এ কে স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ জাতীয় সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেকোনও ধরনের ছাত্র-সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তার রোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।  মেধাভিত্তিক ভর্তি ও নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃষি ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেধার ভিত্তিতে ভর্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা আনতে হবে। শিক্ষাক্রম সংস্কার করতে হবে।” 

কূটনীতি: ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা 

সরকারের সামনে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত চ্যালেঞ্জের তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নয়ন। পরিবর্তিত ভূ-রাজনীতিতে নতজানু না হয়ে পারস্পরিক সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক রক্ষা করা সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে তলানিতে নামা কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার এবং পরাশক্তিদের প্রতিযোগিতার মাঝে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা জরুরি। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা ও চীনের অর্থনৈতিক প্রভাবের মধ্যে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে এগোতে হবে। 

কূটনৈতিক অগ্রাধিকার 

ভারত সম্পর্ক: প্রতিবেশী ভারতের সাথে বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এবং সীমান্ত হত্যা বন্ধ। 

ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য: চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতার মাঝে দেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা। 

রোহিঙ্গা ইস্যু: আন্তর্জাতিক জনমত গঠন করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে শক্ত অবস্থান নেওয়া। 

এলডিসি উত্তরণ: বাণিজ্যের স্বার্থে এলডিসি থেকে বের হওয়ার সময়সীমা পুনর্মূল্যায়ন। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “নতুন সরকারের সামনে প্রধান কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হচ্ছে— ভারতের সঙ্গে নতুন করে বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর সম্পর্ক স্থাপন করা। নতুন সরকারকে পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়নে যেকোনও ধরনের প্রতিকূলতা রোধ করতে হবে।” 

বাজার সিন্ডিকেট ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ 

সরকারের সামনে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত চ্যালেঞ্জের চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে মুল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। অসাধু সিন্ডিকেট ও মজুতদারদের হাতে জিম্মি বাজার ব্যবস্থাকে মুক্ত করা সাধারণ মানুষের প্রধান প্রত্যাশা। জানুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতি ৮ দধমিক ২৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে অসহনীয় করে তুলেছে।

বাজার ব্যবস্থাপনায় পদক্ষেপ 

শূন্য সহনশীলতা: কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও আইনের প্রয়োগ। 

সরবরাহ সচল রাখা: জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের সরবরাহ চেইন থেকে মধ্যস্বত্বভোগীদের অপসারণ। 

ভোক্তা অধিকার: বাজার মনিটরিংয়ে স্বচ্ছতা এবং নীতিনির্ধারণে ভোক্তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজির হোসাইন জানান, পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে। নিত্যপণ্য-সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণের পাশাপাশি ভোক্তাদের সমান অংশগ্রহণ দরকার। নিত্যপণ্যের বাজারে কারসাজি রোধে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে যথাযথ আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। 

শেষ কথা 

যদিও বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রতিটি চ্যালেঞ্জ একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত, তবুও এই চার খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। বিগত দিনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দেশের অর্থনীতিতে যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে, তার প্রভাবে বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা। একদিকে স্থবির ব্যবসা-বাণিজ্যকে সচল করা, অন্যদিকে পুরোপুরি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়া শিক্ষা খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে শিক্ষাঙ্গনে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরিয়ে আনা সরকারের জন্য এক বিশাল পরীক্ষা।

অর্থনৈতিক ফ্রন্টে ডলার সংকট, টাকার অবমূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজার সিন্ডিকেট ও মজুতদারদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ করা এখন প্রধান অগ্রাধিকার। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণ; ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার প্রভাব সামলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারলেই এই ‘নতুন বাংলাদেশ’ সঠিক পথে এগোবে। ভুল সিদ্ধান্ত দেশকে আবার পুরনো সংকটে ফিরিয়ে নিতে পারে, তাই প্রতিটি পদক্ষেপে সরকারকে হতে হবে সতর্ক ও সাহসী। 




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button