ইরানে কী চান ট্রাম্প, যুদ্ধ না ক্ষমতার পরিবর্তন?

ইরানে হামলার প্রকাশ্য হুমকি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের লক্ষ্য আসলে কী, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না। স্বল্পস্থায়ী সংঘাত না কি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ, কোন পথে হাঁটবেন তিনি, তা নিয়ে মার্কিন সামরিক মহলে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। মধ্যপ্রাচ্যে ইতোমধ্যে রণতরি আর যুদ্ধবিমানের বহর পাঠিয়েছেন ট্রাম্প, যার ফলে পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতা এখন খাদের কিনারায়। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
ট্রাম্পের সামনে এখন অনেকগুলো বিকল্প। তিনি কি কেবল ইরানের ক্ষমতার মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর্পসকে (আইআরজিসি) লক্ষ্য করে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চালাবেন? না কি ইসরায়েলের চাওয়া অনুযায়ী তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করবেন? অথবা তার চূড়ান্ত লক্ষ্য কি ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন? ইরান অবশ্য আগেই জানিয়ে রেখেছে, হামলা হলে তার ফল হবে ভয়াবহ।
বৃহস্পতিবার ট্রাম্প জানিয়েছেন, কোনও পারমাণবিক চুক্তি না হলে আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে তিনি ইরানে হামলার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের সামনে রাখা সামরিক বিকল্পগুলোর মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির ওপর সরাসরি হামলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ট্রাম্প বারবারই কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলে আসছেন, তবে তার শর্তগুলো বেশ কঠিন। তিনি এমন একটি চুক্তি চান যা কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি নয়, বরং ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং হিজবুল্লাহ ও হামাসের মতো গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থনও বন্ধ করবে। ইরান অবশ্য শুরু থেকেই এসব শর্তে নতিস্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে।
ওমান এবং সুইজারল্যান্ডে দুই দফা পরোক্ষ আলোচনা হলেও কোনও সমাধান আসেনি। বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডে আবারও আলোচনায় বসার কথা রয়েছে দুই পক্ষের। ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ জানিয়েছেন, এত বিপুল পরিমাণ মার্কিন সামরিক উপস্থিতির পরও ইরান কেন এখনও ‘আত্মসমর্পণ’ করছে না, তাতে ট্রাম্প ‘বিস্মিত’।
ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক অ্যালেক্স ভাটানকা বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভবত একটি সীমিত সংঘাত চাইছে যা মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যকে বদলে দেবে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রকে কোনও দীর্ঘস্থায়ী চোরাবালিতে আটকে ফেলবে না।’ তার মতে, ইরান এখন একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু বিধ্বংসী সামরিক অভিযানের আশঙ্কা করছে, যা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ও প্রতিরোধ ক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেবে।
গত জানুয়ারিতে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক প্রাণহানির পর ট্রাম্পের সুর আরও কঠোর হয়। তিনি কয়েকবার ইরানি জনগণকে ‘সাহায্য’ করার জন্য হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছিলেন। ট্রাম্প প্রায়ই মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরানোর দাবি করেন এবং গাজায় হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির কৃতিত্ব নিজের বলে প্রচার করেন। তার দাবি, ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন হলে এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি আসবে। তবে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা আশঙ্কা করছেন, ট্রাম্প আমেরিকাকে একটি রক্তক্ষয়ী বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ১৩টি রণতরি অবস্থান করছে। এর মধ্যে রয়েছে গত মাসের শেষে পৌঁছানো বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন, নয়টি ডেস্ট্রয়ার এবং তিনটি ফ্রিগেট। বিশ্বের বৃহত্তম রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ডও গত শুক্রবার জিব্রাল্টার প্রণালি পার হয়ে ভূমধ্যসাগরে প্রবেশ করেছে। এ ছাড়া কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান এবং হাজার হাজার মার্কিন সেনা এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মোতায়েন রয়েছে, যা ইরানের পাল্টা হামলার সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠতে পারে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের সাবেক প্রেসিডেন্ট রিচার্ড হাসের মতে, ইরানের ওপর হামলার প্রভাব কী হবে তা স্পষ্ট নয়। তিনি লিখেছেন, ‘এটি বর্তমান সরকারকে দুর্বল করার বদলে উল্টো শক্তিশালীও করতে পারে। আর বর্তমান সরকার যদি পড়েও যায়, তবে সেখানে কারা ক্ষমতায় আসবে তা কারোরই জানা নেই।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সিনেটের এক শুনানিতে স্বীকার করেছেন, খামেনির পতন হলে কী ঘটবে তা কেউ জানে না। অন্যদিকে, উপসাগরীয় আরব দেশগুলো ট্রাম্পকে কোনও ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্ক করে দিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, যুদ্ধ শুরু হলে তারা ইরানের পাল্টা হামলার শিকারে পরিণত হতে পারে।
সিএসআইএস-এর মোনা ইয়াকুবিয়ান এএফপিকে বলেছেন, ইরান ভেনেজুয়েলার চেয়ে অনেক বেশি জটিল দেশ। গত ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালিয়ে নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেফতার করলেও ইরানের ক্ষেত্রে ‘মূল নেতৃত্বকে হত্যার চেষ্টা’ দেশের ভেতরে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে।



