Uncategorized

রূপকথার দৃশ্যপটে এখন কেবলই যুদ্ধের ক্ষত আর হাহাকার

শীতের সকালে রাশিয়ার ইয়েলেতস শহরটিকে দেখলে মনে হতে পারে কোনও এক রুশ রূপকথার গল্প। নদীর তীরে বরফ কেটে মাছ ধরছেন জেলেরা, দূরে সোনালী গম্বুজওয়ালা অর্থোডক্স চার্চের অপূর্ব দৃশ্য। কিন্তু মস্কো থেকে ৩৫০ কিলোমিটার দক্ষিণের এই শহরে পা রাখলেই সেই রূপকথার ঘোর কেটে যায়। সেখানে এখন কেবলই যুদ্ধের দামামা আর দীর্ঘশ্বাসের প্রতিধ্বনি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে পুতিন যখন ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ শুরু করেছিলেন, ক্রেমলিনের ধারণা ছিল এটি হবে খুব সংক্ষিপ্ত এবং সফল। কিন্তু চার বছর পেরিয়ে গেলেও সেই সংঘাত থামেনি। রাশিয়ার জন্য এই যুদ্ধ এখন নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে সেই ‘গ্রেট প্যাট্রিয়টিক ওয়ার’-এর চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেয়ালজুড়ে বীরত্ব, মনে হাহাকার

ইয়েলেতস শহরের একটি নয়তলা অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকের পাশ দিয়ে হাঁটলে দেখা যায় বিশাল এক ম্যুরাল। সেখানে আঁকা রয়েছে যুদ্ধে নিহত স্থানীয় পাঁচ সেনার ছবি। ওপরে লেখা ‘রাশিয়ার বীরদের গৌরব’। রাশিয়ার সরকার হতাহতের সঠিক সংখ্যা প্রকাশ না করলেও এই ছোট শহরটি গেলেই বোঝা যায় ক্ষয়ক্ষতির গভীরতা। প্রতিটি কবরস্থান আর স্মৃতিস্তম্ভে নতুন নতুন নাম যুক্ত হচ্ছে।

বাস স্টেশনের টিকিট সংগ্রাহক ইরিনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘আমার বন্ধুর স্বামী সেখানে নিহত হয়েছেন। আমার এক ভাইপোর ছেলে আর নাতিও আর নেই। অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে। এই তরুণদের জন্য আমার খুব মায়া হয়।’

যুদ্ধের অর্থনীতিতে পিষ্ট জীবন

ইরিনা শুধু স্বজন হারানোতেই ব্যথিত নন, জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী খরচ তাকে দিশেহারা করে তুলেছে। তিনি বলেন, ‘গ্যাস-বিদ্যুতের বিল আমাদের দম বন্ধ করে দিচ্ছে। জিনিসের দাম আমাদের পিষে ফেলছে। টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে।’ রাশিয়ার বাজেট ঘাটতি বাড়ায় এবং অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ায় সরকার ভ্যাট ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২২ শতাংশ করেছে। অর্থমন্ত্রণালয় সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এই অতিরিক্ত অর্থ খরচ হবে ‘প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা’ খাতে।

ইয়েলেতস শহরের একটি ছোট বেকারির মালিক আনাস্তাসিয়া বাইকভাও শোনালেন একই সংকটের কথা। তিনি বলেন, ‘গ্যাস-বিদ্যুতের বিল, দোকান ভাড়া আর কর সব বেড়ে গেছে। ফলে রুটি-বিস্কুটের দাম না বাড়িয়ে আমাদের উপায় নেই। এভাবে চলতে থাকলে ছোট ব্যবসাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। তখন শহরটা কেবল একটা অন্ধকার ছাই রঙের বিরানভূমিতে পরিণত হবে।’

দোরগোড়ায় যখন যুদ্ধ

সীমান্ত থেকে ২৫০ কিলোমিটার দূরে হলেও যুদ্ধের আঁচ এখন এই শহরের ঘরের ভেতর পৌঁছে গেছে। ইউক্রেনীয় ড্রোনের আক্রমণ থেকে বাঁচতে ইয়েলেতসের বাসস্টপে কিংবা পার্কে এখন বসানো হয়েছে কংক্রিটের জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র। একসময় যে দেশে ড্রোনের কোনও বালাই ছিল না, এখন সেখানে প্রায় প্রতি রাতে সাইরেন বাজে।

শহরের একটি প্যানকেক ক্যাফের সাইনেও দেখা যায় যুদ্ধের প্রতীক ‘V’ এবং ‘Z’ অক্ষর। সেখানে লেখা, ‘প্যানকেক নিন, তারপর পুরো পৃথিবী।’ যা পুতিনের সেই বিতর্কিত উক্তি, ‘রাশিয়ার সীমানা কোথাও শেষ হয় না’-কে স্মরণ করিয়ে দেয়।

অভিযোগ নেই, আছে বিভ্রান্তি

অবাক করার বিষয় হলো, এত অর্থনৈতিক কষ্ট আর স্বজন হারানো সত্ত্বেও অনেকে প্রকাশ্য কোনও প্রতিবাদ করছেন না। প্রবীণ পেনশনভোগী ইভান পাভলোভিচ উচ্চমূল্য আর বাড়ির ভাঙা লিফট নিয়ে ক্ষুব্ধ হলেও যুদ্ধের সমর্থন দিতে পিছপা হন না। তিনি বলেন, ‘আমি তরুণ হলে নিজেই যুদ্ধ করতে যেতাম। তবে হ্যাঁ, যুদ্ধ না থাকলে আমরা হয়তো আরও আরামে বাস করতে পারতাম।’

বাস স্টেশনের ইরিনা অবশ্য কিছুটা বিভ্রান্ত। তিনি বলেন, ‘জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় আমরা জানতাম কেন লড়াই করছি। কিন্তু এখন কিসের জন্য লড়াই করছি, তা আমি নিশ্চিত নই।’

ইউক্রেন যুদ্ধ পঞ্চম বছরে পদার্পণ করতে যাচ্ছে। রাশিয়ার সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনও উদ্দীপনা নেই, আছে কেবল টিকে থাকার লড়াই। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কায় মানুষ এখন কেবলই ভালো সময়ের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button