Uncategorized

ভারতের পররাষ্ট্রনীতির আমূল পালাবদল ও ফিলিস্তিন প্রশ্ন

আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ইসরায়েল যাচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ২০১৭ সালের ঐতিহাসিক সফরের ৯ বছর পর এটি তার দ্বিতীয় ইসরায়েল যাত্রা। মোদির এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন পশ্চিম তীরের দখলদারত্ব নিয়ে ভারতের অবস্থান কিছুটা অস্পষ্ট এবং গাজায় ইসরায়েলি অভিযানের মুখে গ্লোবাল সাউথের খুব কম নেতাই বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে দেখা করেছেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।

প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা থেকে শুরু করে প্রযুক্তি সব ক্ষেত্রেই ভারত ও ইসরায়েল এখন ঘনিষ্ঠ মিত্র। তবে এই বন্ধুত্বের সমান্তরালে ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘদিনের মুক্তি সংগ্রামের প্রতি নয়াদিল্লির সমর্থন ক্রমে ফিকে হয়ে আসছে কি না, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

সম্পর্কের বিবর্তন: শত্রুতা থেকে প্রকাশ্য আলিঙ্গন

ভারত ও ইসরায়েলের সম্পর্কের যাত্রাটি মোটেও আজকের মতো সহজ ছিল না। দশকের পর দশক ধরে এই সম্পর্কের চড়াই-উৎরাইকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করা যায়:

১৯৩০ ও ৪০-এর দশক (বিরোধিতা): ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকা ভারত ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছিল। ১৯৩৮ সালে মহাত্মা গান্ধী লিখেছিলেন, “ইংল্যান্ড যেমন ইংরেজদের, ফিলিস্তিনও তেমনই আরবদের।” ১৯৪৮ সালে ভারত ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে ভোট দেয়।

১৯৫০-এর দশক (স্বীকৃতি কিন্তু দূরত্ব): ১৯৫০ সালে ভারত ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিলেও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেনি। এমনকি ৪ দশক ধরে ভারতীয় পাসপোর্টে ইসরায়েল ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা ছিল।

ভারতের পররাষ্ট্রনীতির আমূল পালাবদল ও ফিলিস্তিন প্রশ্ন

১৯৬০ ও ৭০-এর দশক (গোপন সমরাস্ত্র ও ফিলিস্তিন প্রেম): ১৯৬২-র চীন যুদ্ধ এবং ১৯৬৫ ও ১৯৭১-এর পাকিস্তান যুদ্ধের সময় ইসরায়েল ভারতকে গোপনে অস্ত্র সরবরাহ করে। বিনিময়ে ভারতের কাছে কূটনৈতিক স্বীকৃতি চাইলেও ইন্দিরা গান্ধী তা প্রত্যাখ্যান করেন। উল্টো ১৯৭৪ সালে ভারত প্রথম অনারব দেশ হিসেবে পিএলও-কে স্বীকৃতি দেয়।

১৯৯০-এর দশক (কূটনৈতিক সম্পর্কের শুরু): শীতল যুদ্ধের সমাপ্তি এবং ১৯৯১ সালে ভারতের অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর ১৯৯২ সালে পি ভি নরসিমা রাও ইসরায়েলের সঙ্গে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধে ইসরায়েল ভারতকে লেজার-গাইডেড বোমা দিয়ে বড় সহায়তা করে।

২০১৪ থেকে বর্তমান (প্রকাশ্য বন্ধুত্ব): মোদি ক্ষমতায় আসার পর হঠকারিতা ঝেড়ে ফেলে ভারত ইসরায়েলকে ‘খোলাখুলি’ আলিঙ্গন করে। ২০১৭ সালে মোদি প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইসরায়েল সফর করেন।

ফিলিস্তিন কি গুরুত্ব হারাচ্ছে?

ভারত দাফতারিকভাবে এখনও ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’ এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন বজায় রেখেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতিসংঘে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ভোটে ভারতের ভোটদান থেকে বিরত থাকার ঘটনা বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালে ইসরায়েলের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাবে ভারত ভোট দেয়নি।

যদিও গত সপ্তাহে ভারত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের নিন্দা জানিয়ে ১০০টি দেশের সঙ্গে যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছে, তবে তা করা হয়েছে কিছুটা দেরিতে। ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেস এই সফরকে ‘ভণ্ডামি’ বলে অভিহিত করে অভিযোগ করেছে যে প্রধানমন্ত্রী ফিলিস্তিনিদের স্বার্থ বিসর্জন দিচ্ছেন।

কৌশলগত ভারসাম্য নাকি নতুন অক্ষ?

বিশ্লেষকদের মতে, মোদি এক বিশেষ ‘কৌশলগত ভারসাম্য’ বজায় রাখছেন। একদিকে তিনি ইসরায়েলের কাছ থেকে উন্নত প্রযুক্তি ও অস্ত্র নিচ্ছেন, অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি ও শ্রমবাজারের স্বার্থ রক্ষা করছেন। আবার ইরানের মতো আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গেও ভারতের সুসম্পর্ক জরুরি।

তবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার চরম উত্তেজনার মাঝে মোদির এই ইসরায়েল সফর মধ্যপ্রাচ্যে ভারতের ভাবমূর্তিকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। মোদি কি তার বন্ধু নেতানিয়াহুর কাছে গাজা ও পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে কোনও উদ্বেগ প্রকাশ করবেন? নজর এখন সেদিকেই।




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button