তুরস্কে রমজানের শুরুতেই ফিরলো সেকুলার-রক্ষণশীল দ্বন্দ্ব

তুরস্কে পবিত্র রমজান মাস সাধারণত সামাজিক প্রশান্তি ও সংযমের সময় হিসেবে পরিচিত। তবে এ বছর রমজানের শুরুতেই দেশটিতে নতুন করে দানা বেঁধেছে সেকুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ বনাম রক্ষণশীল গোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের পুরোনো দ্বন্দ্ব। বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি টেলিভিশন সিরিজ, যা নিয়ে এখন তুালকালাম চলছে গোটা তুরস্কে। সমালোচকদের মতে, ওই নাটকে সেকুলার তুর্কিদের অহংকারী, জনবিচ্ছিন্ন এবং ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি অশ্রদ্ধাশীল হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটর এ খবর জানিয়েছে।
‘আন্ডার দ্য সেম রেইন’ নামের ওই নাটক সিরিজটি শুরু হয় ৯ ফেব্রুয়ারি। একটি রক্ষণশীল এবং একটি সেকুলার পরিবারের মধ্যকার মানসিক টানাপোড়েনই এই নাটকের মূল উপজীব্য। তবে সোমবার প্রচারিত দ্বিতীয় পর্বটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
নাটকের বিতর্কিত দৃশ্যে দেখা গেছে, একটি সেকুলার পরিবারের নারী চরিত্র তার ধর্মপ্রাণ অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য শুকরের মাংস রান্না করেছেন, যা ইসলামে নিষিদ্ধ। অতিথিরা যখন এই খাবার দেখে আঁতকে ওঠেন, তখন ওই নারী চরিত্রটিকে বেশ উদ্ধতভাবে বলতে শোনা যায় যে, তিনি এটি তার হবু খ্রিস্টান পুত্রবধূর জন্য করেছেন। এরপর তিনি একটি খোঁচা দিয়ে বলেন, ‘আমি নিজে এটি খাই না, তবে যারা খায় তাদের আমি শ্রদ্ধা করি। অন্যদের মতো আমরা অসহিষ্ণু নই।’
এই দৃশ্য প্রচারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভের জোয়ার বয়ে যায়। দর্শকদের অভিযোগ, লেখকেরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সেকুলার তুর্কিদের নেতিবাচকভাবে তুলে ধরে উসকানি দিচ্ছেন।
উল্লেখ্য, তুরস্কের ৯৮ শতাংশ মানুষ মুসলিম এবং তারা ধর্মীয় পালনে বৈচিত্র্য রাখলেও শুকরের মাংস দেশটিতে সামাজিকভাবে অত্যন্ত বর্জনীয়।
এই বিতর্ক এখন আর স্রেফ টিভির পর্দায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং পৌঁছে গেছে দেশটির সংসদে। কুর্দিপন্থি ডেম পার্টির এমপি পেরিহান কোকা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘অত্যন্ত সস্তা এবং বানোয়াট এক চিত্রনাট্যের মাধ্যমে মুসলিম-সেকুলার বিতর্ককে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’
তিনি অভিযোগ করেন, নাটকটি প্রচারকারী চ্যানেল এটিভি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ানের বড় জামাতা বেরাত আলবায়রাকের পরিবারের মালিকানাধীন। ফলে সরকার আবারও ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে, দেড় শতাধিক শিক্ষাবিদ ও শিল্পী তুরস্কের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি নির্দেশনার বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়েছেন। ওই নির্দেশনায় রমজান উপলক্ষে স্কুলগুলোতে বিশেষ কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, এর ফলে রোজা রাখা এবং না-রাখা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভেদ তৈরি হবে।
এর জবাবে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বুধবার কড়া ভাষায় বলেন, ‘যারা বিভিন্ন বিবৃতি দিয়ে ৮৬ মিলিয়ন মানুষের রমজানের আনন্দকে ম্লান করতে চায় এবং জাতির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়, তাদের আমরা ছেড়ে দেব না।’ এরদোয়ান প্রায়ই তার রক্ষণশীল জনসমর্থন গোষ্ঠীকে সেকুলার অভিজাতদের দ্বারা অবহেলিত বা প্রান্তিক হিসেবে তুলে ধরে থাকেন। ১৯৫০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে হিজাব পরার ওপর যে নিষেধাজ্ঞা ছিল, তা রক্ষণশীলদের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল যা এরদোয়ানের দুই দশকের শাসনামলে অনেকটা মুছে গেছে।
বিতর্ক তুঙ্গে ওঠায় নাটকের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই দৃশ্যটি কোনও ধর্মীয় বা জীবনযাত্রার বিরোধ দেখানোর জন্য নয়, বরং ‘অহংকার বনাম শালীনতার চিরন্তন লড়াই’ দেখানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে। তবে জনরোষের মুখে এটিভি কর্তৃপক্ষ নাটকের চিত্রনাট্যকার দলে নতুন একজনকে অন্তর্ভুক্ত করেছে বলে জানা গেছে। তুরস্কের সম্প্রচার নিয়ন্ত্রক সংস্থা আরটিইউকে-এর কাছেও এই সিরিজের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা পড়েছে।



