খামেনির ছেলে মোজতাবাসহ শীর্ষ মোল্লাদের হত্যার পরিকল্পনা

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে দেশটির সর্বোচ্চ নেতার ছেলে মোজতাবা খামেনিসহ শীর্ষ মোল্লাদের হত্যার পরিকল্পনা বিবেচনায় রেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আলোচনা ভেঙে গেলে শাসক পরিবর্তনের লক্ষ্যে নেতৃত্বে আঘাত হানার বিকল্প সামনে রাখা হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তবে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্বকে ‘ডিক্যাপিটেশন ক্যাম্পেইন’-এর মাধ্যমে আঘাত করার পরিকল্পনা তার সামনে উপস্থাপিত হয়েছে। তালিকায় রয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও তার ৫৫ বছর বয়সী ছেলে মোজতাবা খামেনি।
মোজতাবা খামেনিকে দীর্ঘদিন ধরেই বাবার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হয়। তিনি প্রভাবশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি)-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। যুক্তরাষ্ট্র এই বাহিনীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে। ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নেওয়া মোজতাবা পবিত্র নগরী কোমে ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন করেছেন, যা সাংবিধানিক ধর্মীয় যোগ্যতার শর্ত পূরণ করে।
হোয়াইট হাউজ সূত্রে জানা গেছে, আলোচনায় সমঝোতা হলে ইরানকে সীমিত বা ‘প্রতীকী’ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দেওয়া হতে পারে। শর্ত হলো পারমাণবিক বোমা তৈরির পথ যেন না থাকে। তবে আলোচনায় অগ্রগতি না হলে নাটকীয় হত্যাকাণ্ডভিত্তিক অভিযানও বিকল্প হিসেবে রাখা হয়েছে। এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে বলেন, “প্রতিটি পরিস্থিতির জন্য বিকল্প আছে। একটি বিকল্পে আয়াতুল্লাহ, তার ছেলে ও মোল্লাদের সরিয়ে দেওয়ার কথা রয়েছে।”
এদিকে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির নৌবাহিনীর এক-তৃতীয়াংশের বেশি জাহাজ ইরানের দিকেই মোতায়েন করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর সর্বোচ্চ পরিমাণ বিমান শক্তি জড়ো করা হয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা বলছেন। ই-৩ সেন্ট্রি নজরদারি বিমানের বহরের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি মোতায়েনকে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই বিমানের রাডার আগত ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও প্রতিরোধে সহায়তা করে।
শুক্রবার ট্রাম্প নিশ্চিত করেন, তিনি ইরানের ওপর “সীমিত” হামলার বিষয়টি বিবেচনা করছেন, যাতে তেহরানকে পারমাণবিক চুক্তিতে রাজি করানো যায়। তত্ত্বগতভাবে এমন হামলা যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রদর্শন করবে, কিন্তু বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া উসকে দেবে না, এমন হিসাব করা হচ্ছে। তবে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি স্পষ্ট।
হোয়াইট হাউজের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ইরান যদি এমন প্রস্তাব দেয় যা রাজনৈতিকভাবে দেশে তুলে ধরা যায়, ট্রাম্প তা বিবেচনা করবেন। তিনি বলেন, “ইরানিরা যদি হামলা ঠেকাতে চায়, এমন প্রস্তাব দিক যা আমরা ফিরিয়ে দিতে পারি না। তারা সুযোগ হাতছাড়া করছে। লুকোচুরি করলে ধৈর্য থাকবে না।”
বৃহস্পতিবার ট্রাম্প ইরানকে চুক্তিতে আসতে “১০ থেকে ১৫ দিন” সময় দেন। বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড শুক্রবার ভূমধ্যসাগরে প্রবেশ করেছে এবং ওই সময়সীমার মধ্যেই ইরানের নাগালে পৌঁছাবে।
দুই ইসরায়েলি কর্মকর্তা মনে করেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের অবস্থানের ব্যবধান পূরণ করা কঠিন; সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির সম্ভাবনা বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েল সরকার। তবে এমন সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক সূত্র। গত জুনে সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলার পর এক বছরেরও কম সময়ে এটি হবে দ্বিতীয়বার যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান আক্রমণ।
তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলো সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। আঞ্চলিক কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে মধ্যপ্রাচ্য আরও অস্থিতিশীল হবে। কারও কারও মতে, ছাড়ের আশায় সময়ক্ষেপণ করে তেহরান ভুল হিসাব করছে; অন্যদিকে বিপুল সামরিক সমাবেশের কারণে ট্রাম্পও চাপে রয়েছেন। ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি পরিত্যাগে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি না দেয়, তবে পিছিয়ে আসা তার জন্য কঠিন হতে পারে।
সম্ভাব্য পাল্টা হামলার আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র এই সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্য থেকে কিছু কর্মী সরিয়ে নিতে শুরু করেছে। শুক্রবার ইরানে কমপক্ষে ২০টি সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত বিক্ষোভকারীদের ৪০ দিনের শোকপালন শেষে এসব কর্মসূচি হয়। অর্থনৈতিক সংকট ও তেহরানে পানির সংকট ঘিরে রাস্তায় নামা হাজারো বিক্ষোভকারীর মৃত্যু হয়। এই সহিংসতাই ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পাল্টা হুমকির প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে।



