বিমানের সেই ফিরোজকে দেওয়া হলো অবসর

নানা অনিয়ম, আর্থিক অনাচার এবং নারী সহকর্মীদের সঙ্গে অশোভন আচরণের দায়ে অভিযুক্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জুনিয়র গ্রাউন্ড অফিসার ফিরোজ-উজ-জামানকে অবশেষে অবসরে দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) বিমানের ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) উম্মে কুলছুমের সই করা আদেশে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়। এই আদেশের কপি বাংলা ট্রিবিউনের হাতে এসেছে। পাশাপাশি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একাধিক কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিতও করেছেন।
জানা যায়, সিন্ডিকেট করে লাখ লাখ টাকা আত্নসাৎ, নারী সহকর্মীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ সঙ্গে নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করা তার একগুয়েমি আচরনে অতিস্ট ছিলেন সবাই। অবশেষে এসবের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে অতি সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়েছিল। এরই প্রেক্ষিতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে বিভাগীয় মামলা দায়ের করে। এরপর স্বাক্ষ্য গ্রহণসহ সমস্ত অভিযোগের প্রমাণাদি নিয়ে চার্জশিটও প্রস্তুত হয় । সবশেষ তাকে তার বিরুদ্ধে অভিযোগে তার বক্তব্য প্রদানের ৭ দিন সময় বেঁধে দেওয়া হলে তিনি স্বেচ্ছায় অবসরে যাবেন বলে আবেদন করেন। তার আবেদনের প্রেক্ষিতে তাকে অবসর দেওয়া হয়।
অভিযোগে জানা যায়, ফিরোজ-উজ-জামান, পি-৩৬৫০৭, বিগত ১৯৯৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি গ্রাউন্ড সার্ভিস অ্যাসিসট্যান্ট হিসাবে গ্রাহক সেবা পরিদফতরে কাজে যোগদান করেন। তিনি অফিস চলাকালে বিমানের নির্ধারিত ইউনিফর্ম পরিধান না করে, অর্পিত দায়িত্ব পালনে বিরত থাকেন। দায়িত্ব ও পদমর্যাদার সীমা অতিক্রম করে ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক অনিয়ম, আর্থিক অনাচার এবং কর্মক্ষেত্রে অনৈতিক আচরণে লিপ্ত ছিলেন।
বিমানের তদন্তে একাধিক সাক্ষ্য, লিখিত জবানবন্দি, সিসিটিভি ফুটেজ এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থে সহকর্মীদের উপর প্রভাব খাটিয়েছেন, ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছেন। ডিউটি রোস্টার ও হজ পোস্টিং প্রক্রিয়াকে বাণিজ্যিক রূপ দিয়েছেন এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মাধ্যমে একটি বেআইনি আর্থিক লেনদেনের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন, যার সত্যতা নিরাপত্তা তদন্তে পাওয়া যায়। তার এই কর্মকান্ড শুধু প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকে বিপন্ন করেনি বরং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ভাবমূর্তি নৈতিক মান ও সেবা-নিরপেক্ষতার চেতনারও পরিপন্থি হয়েছে।
তিনি যে দুর্নীতি ও অনিয়ম করেছেন প্রমাণ পাওয়া যায়, তা একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নৈতিক ও প্রশাসনিক ভিত্তিকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। অবৈধ অর্থ লেনদেন এবং প্রভাব ব্যবহার শুধু ব্যক্তিগত অসততা নয় বরং প্রতিষ্ঠানটির স্বচ্ছতা এবং সুশাসনের প্রতি আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে।
তিনি জুনিয়র নারী কর্মীকে দাফতরিক পরিধির বাইরে অশোভন হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ, কু-প্রস্তাব প্রদানসহ বিভিন্ন জুনিয়র বিমানকর্মীর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার, ভয়-ভীতি প্রদর্শন, ধারকৃত টাকা ফেরত না দেওয়াসহ অপেশাদার আচরণ করার মাধ্যমে বিমান বিধি লঙ্ঘন করেছেন মর্মে অভিযোগ ও প্রমাণ পাওয়া যায়।
তার বিরুদ্ধে পত্র স্মারক নং-৩০,৩৪,০০০০,০৯৩, ১৪,০০০,২৫/২৯৪ তারিখ-২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়। তিনি একই বছরের ২০ নভেম্বর কর্তৃপক্ষ বরাবর কারণ দর্শানো নোটিশের জবাব প্রদান করেন, যা কর্তৃপক্ষের নিকট সন্তোষজনক বিবেচিত হয়নি। তার এ ধরনের কর্মকান্ডের ফলে শুধু বিমানের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বরং বাংলাদেশ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স লিঃ কর্তৃক গৃহীত ও অনুসৃত বাংলাদেশ বিমান কর্পোরেশন কর্মচারী (চাকরি) প্রবিধানমালা, ১৯৭৯ এর ৫৫(১)(বি), (সি) এবং ৫৫(২) এর (বি), (সি), (ডি) (জি), (এইচ) (ওয়ায়), (জেডডি), (জেড এইচ) এবং ((জেড আই) বিধি অনুযায়ী অসদাচরণের সামিল ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
বিমানের একটি সূত্র বলছে, ফিরোজ এতটাই বেপরোয়া ছিল যে তিনি কোনও নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করেনি। যখনই কেউ তার অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গেছে তখনই তাকে নানাভাবে হুমকি ও হয়রানি করেছে।
সূত্র বলছে, এসব কিছু থেকে বাঁচতেই সেচ্ছায় অবসর বেছে নেয় সে। কর্তৃপক্ষ সেটি অনুমোদন করে।



