উন্নয়নশীল বিশ্বে জনপ্রশাসন সংস্কার কেন প্রায়ই ব্যর্থ হয়?

জনপ্রশাসন হলো রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। একটি দক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও জনমুখী প্রশাসন উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে গতিশীল করে তোলে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—বিশ্বের অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশে জনপ্রশাসন সংস্কারের প্রচেষ্টা কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জন করতে পারেনি। উন্নয়ন পরিকল্পনা, দাতা সংস্থার সহায়তা এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির পরও প্রশাসনিক কাঠামো ও সেবার মানে যে মৌলিক পরিবর্তন প্রত্যাশিত ছিল, তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় না। এই ব্যর্থতার পেছনে নানাবিধ কারণ বিদ্যমান।
জনপ্রশাসন বোদ্ধাগণের মতে এই ব্যর্থতার অন্যতম কারণ রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। জনপ্রশাসন সংস্কার কার্যক্রম টেকসই করতে হলে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দৃঢ় রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি থাকা জরুরি। কিন্তু বেশিরভাগ উন্নয়নশীল দেশে সংস্কার কর্মসূচি শুরু হয় আন্তর্জাতিক চাপ বা আর্থিক সহায়তার শর্ত পূরণের জন্য, বাস্তব রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির কারণে নয়। ফলে নীতিগতভাবে সংস্কারের ঘোষণার পরেও তার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক নেতৃত্বের আগ্রহ থাকে সীমিত। শাসকগোষ্ঠী প্রায়ই ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত রাখার চেষ্টা করে, যাতে প্রশাসন তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, মালাওয়িতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর চাপ সত্ত্বেও সংস্কারের বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মালাওয়ির সরকার সংস্কারের জন্য পর্যাপ্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রদর্শন করেনি, যার ফলে সংস্কার কার্যক্রম ব্যর্থ হয়েছে।
সেই সাথে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি একটি বড় বাধা। দুর্নীতি অনেক উন্নয়নশীল দেশে প্রশাসনের শিকড়ে প্রোথিত একটি ব্যাধি। নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নে স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রশাসনিক গঠন ব্যাহত হয়। সংস্কার কর্মসূচির অর্থ ও সম্পদও অনেক সময় অনিয়ম ও অপব্যবহারের শিকার হয়। ফলে সংস্কারের লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থতা আসে এবং জনগণের আস্থা হারায় প্রশাসন।
পাশাপাশি, আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা অনেক সময় সংস্কার কার্যক্রমকে ব্যহত করে। সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও পর্যাপ্ত বাজেট। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এ তিন ক্ষেত্রেই ঘাটতি দেখা যায়। প্রশাসনিক আধুনিকায়নের জন্য প্রয়োজন তথ্যপ্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা, যা আর্থিক সংকটের কারণে প্রায়ই সম্ভব হয় না। অনেক সংস্কার প্রকল্প টেকসই হওয়ার আগেই বাজেট সংকটের মুখে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, জাম্বিয়ার সরকার বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ গ্রহণ করলেও, পর্যাপ্ত বাজেট ও দক্ষ জনবল না থাকায় সেগুলো বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে।
সংস্কার কার্যকর না হওয়ার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ বিদেশি মডেলের অনুপযুক্ত প্রয়োগ। অনেক সময় বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা দাতা সংস্থার চাপের মুখে উন্নয়নশীল দেশগুলো পশ্চিমা প্রশাসনিক মডেল গ্রহণ করে। কিন্তু এসব মডেল স্থানীয় বাস্তবতা, সংস্কৃতি ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে সংস্কার কার্যক্রম বিদেশি তত্ত্বনির্ভর হয়ে পড়ে এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর হয় না। উদাহরণস্বরূপ, নিউ পাবলিক ম্যানেজমেন্ট (NPM) মডেল অনেক দেশে প্রয়োগ হলেও স্থানীয় বাস্তবতায় তা সাফল্য পায়নি।
সেই সঙ্গে রাজনৈতিক মতবাদের ধারাবাহিকতার অভাব ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সংস্কার কার্যক্রমকে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত করে। সংস্কার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যার ফলাফল তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যায় না। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক নীতি ও অগ্রাধিকার বদলে যায়। নতুন সরকার পুরনো সরকারের নেওয়া সংস্কার কর্মসূচি বাতিল বা স্থগিত করে দেয়। এই ধারাবাহিকতার অভাব সংস্কারের স্থায়িত্ব নষ্ট করে এবং আমলাতান্ত্রিক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। উদাহরণস্বরূপ, উগান্ডা ও তানজানিয়াতে সংস্কার উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও, রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে সেগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয়নি।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতা অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। প্রশাসনিক সংস্কার তখনই সফল হয় যখন জনগণ ও কর্মকর্তারা উভয়েই পরিবর্তনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। কিন্তু অনেক সমাজে প্রথাগত রীতি, পদমর্যাদাভিত্তিক সংস্কৃতি ও পরিবর্তনের প্রতি ভয় সংস্কারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণ মানুষও প্রায়ই মনে করে “যেভাবে চলছে, সেভাবেই চলুক” – এই মনোভাব সংস্কারকে জনগণের সমর্থন থেকে বঞ্চিত করে। উদাহরণস্বরূপ, পাকিস্তানে ইআরপি (এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং) সিস্টেম বাস্তবায়নের সময় সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতা ও সামাজিক মানসিকতা প্রযুক্তি গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করেছে।
জবাবদিহিতার দুর্বলতা সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দেখা দেয়। জনপ্রশাসনের মূল উদ্দেশ্য জনগণের সেবা নিশ্চিত করা। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জনগণের প্রতি নয়, বরং রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি দায়বদ্ধ থাকেন। এতে জনগণের আস্থা হারায় প্রশাসন এবং সংস্কারের উদ্দেশ্য অর্থহীন হয়ে পড়ে।
এছাড়াও, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকাংশই ঔপনিবেশিক শাসনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছে। ঔপনিবেশিক প্রশাসন জনগণের সেবা নয়, বরং শাসনের উদ্দেশ্যে গঠিত হয়েছিল। স্বাধীনতার পরও সেই কাঠামো ও মানসিকতা টিকে আছে। কর্মকর্তারা প্রায়ই নিজেদেরকে জনগণের উপরে মনে করেন, জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে নয়। এই মানসিকতার কারণে পরিবর্তন বা জবাবদিহিতার ধারণা তাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়, ফলে সংস্কারের প্রতি প্রতিরোধ সৃষ্টি হয়।
বৈশ্বিক তথ্য ও উপাত্ত এবং গবেষণা লব্ধ তত্ত্ব ধারণা দেয় যে,উন্নয়নশীল দেশ যেমন বাংলাদেশে কার্যকর জন প্রশাসন সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও ধাপে ধাপে পরিকল্পিত পদ্ধতি। প্রথমত, প্রশাসনিক কাঠামোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করতে তথ্যপ্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার অপরিহার্য, যাতে নাগরিক সেবা দ্রুত ও দক্ষভাবে প্রদান করা যায়। দ্বিতীয়ত, মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর জোর দিতে হবে – যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও পদোন্নতির সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হ্রাস করে প্রশাসনের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া পেশাগত মানদণ্ডে পরিচালিত হয়। পাশাপাশি, দুর্নীতি দমন ও নীতি বাস্তবায়নের পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। এইসব পদক্ষেপ সম্মিলিতভাবে একটি কার্যকর জন প্রশাসন সংস্কার নিশ্চিত করতে পারে ।
উন্নয়নশীল বিশ্বের জনপ্রশাসন সংস্কার ব্যর্থতার পেছনে রয়েছে গভীর প্রাতিষ্ঠানিক ও মানসিক বাধা। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, ঔপনিবেশিক মানসিকতা, দুর্নীতি, সম্পদের ঘাটতি এবং সংস্কারের ধারাবাহিকতা না থাকা—সব মিলিয়ে এই ব্যর্থতা সৃষ্টি করে।
তবে আশার কথা হলো, কিছু দেশ ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সফলভাবে প্রশাসনিক সংস্কার করতে পেরেছে। সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো—দৃঢ় রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি, স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণমূলক প্রশাসন, দক্ষ জনবল গঠন এবং সংস্কৃতিগত মানসিকতার পরিবর্তন।
জনপ্রশাসন কেবল সরকারি যন্ত্র নয়; এটি জনগণের আস্থা, উন্নয়ন এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। তাই উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এখন সময় এসেছে সংস্কারকে রাজনৈতিক সুবিধার নয়, বরং জনগণের কল্যাণের প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করার।
লেখক: জনপ্রশাসন ও জননীতি বিশ্লেষক।



