Uncategorized

শুল্ক জটিলতায় অনিশ্চয়তা, করণীয় ঠিক করতে বৈঠক বুধবার 

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি সই হওয়া বাণিজ্যচুক্তি এখন অনিশ্চয়তার মুখে। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত পাল্টা শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করার পর পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়েছে। এর মধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসন আবারও বৈশ্বিকভাবে নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে, যার একটি অংশ ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যসম্পর্ক, বিশেষ করে ৯ ফেব্রুয়ারি সই হওয়া ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোক্যাল ট্রেডের (এআরটি)’ ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন। লক্ষ্য— বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের করণীয় নির্ধারণ। 

চুক্তির ভিত্তি কি টিকছে?

গত ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টা শুল্কের প্রেক্ষাপটে একটি বাণিজ্যচুক্তি সই হয়। ওই চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ১৯ শতাংশ শুল্ক ধার্য করে। তবে শর্ত ছিল— মার্কিন তুলা ব্যবহার করলে শূন্য শুল্কে রফতানির সুযোগ পাওয়া যাবে। বিনিময়ে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ তুলা, সয়াবিন এবং অন্তত চারটি বোয়িং বিমান কিনতে হবে। 

কিন্তু মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের আরোপিত পাল্টা শুল্কের এখতিয়ার বাতিল করায় প্রশ্ন উঠেছে— যে শুল্কের ভিত্তিতে চুক্তি, সেই ভিত্তিই যদি না থাকে, তাহলে চুক্তির অবস্থান কী? ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাল্টা শুল্ক বাতিল হলে চুক্তির যৌক্তিকতাও দুর্বল হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে চুক্তিটি পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি।

নতুন শুল্ক, নতুন অনিশ্চয়তা 

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ট্রাম্প প্রশাসন আবার নতুন করে বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়। মঙ্গলবার থেকে ১০ শতাংশ হারে নতুন শুল্ক কার্যকর হয়েছে। যদিও ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে, তা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়নি। 

ট্রাম্প তার মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের সুযোগ নিয়ে যদি কোনও দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘খেলা’ করার চেষ্টা করে, তাহলে তাদের ওপর আরও কঠোর শুল্ক আরোপ করা হবে।

এ অবস্থায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে দ্বৈত উদ্বেগ— একদিকে বিদ্যমান ১৯ শতাংশ শুল্ক চুক্তির ভবিষ্যৎ, অন্যদিকে নতুন ঘোষিত বৈশ্বিক শুল্ক কাঠামো। 

সরকারের অবস্থান: অপেক্ষা ও মূল্যায়ন 

বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আদালত যে এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, সেটি তাদের অভ্যন্তরীণ আইনগত বিষয়। এখন যুক্তরাষ্ট্র ১২২ ও ৩০১ ধারার আওতায় কী ধরনের শুল্ক আরোপ করবে, সেটি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। কারণ এরই মধ্যে যে শুল্ক আদায় হয়েছে, তার ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। 

তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে সব দিক পর্যালোচনা করা হবে।” 

ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব: বাতিল নয়, পুনর্মূল্যায়ন 

বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে চুক্তির বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা জরুরি। এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসানও একই মত দেন। তার ভাষ্য, চুক্তিটি পুরোপুরি বাতিল না করে দুই পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে পুনর্গঠন করা উচিত। কারণ বর্তমান বাস্তবতায় চুক্তির ভিত্তি দুর্বল হয়ে গেছে। 

ব্যবসায়ীরা আরও বলছেন, যদি চুক্তি কার্যকর না থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র যে সাধারণ শুল্কহার নির্ধারণ করবে, সেটিই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। 

বৈশ্বিক প্রভাব ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত 

শুল্ক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অস্থির নীতির প্রভাব কেবল বাংলাদেশেই সীমিত নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে একটি চুক্তির অনুমোদন স্থগিত করার কথা জানিয়েছে। ভারতও পূর্বনির্ধারিত আলোচনা স্থগিত করেছে। ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবেশে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

বাংলাদেশের জন্য এখন প্রশ্ন— যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি পুনর্বিবেচনা করবে, নাকি নতুন বৈশ্বিক শুল্ক কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করবে? একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্ভাব্য বাণিজ্যচুক্তি এগিয়ে নেওয়া হবে কিনা, তাও বিবেচনায় আসছে। 

সামনে কী?

বুধবারের বৈঠক তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে তিনটি বিষয় প্রধান হয়ে উঠতে পারে—

১) বিদ্যমান ১৯ শতাংশ শুল্কচুক্তি বহাল থাকবে, নাকি পুনর্মূল্যায়ন হবে? 

২) নতুন ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক বাংলাদেশের ওপর কীভাবে প্রযোজ্য হবে? 

৩) দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে কী কৌশল নেওয়া হবে? 

রফতানির সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। তৈরি পোশাক খাতসহ বিভিন্ন শিল্প এ বাজারের ওপর নির্ভরশীল। তাই আইনি ও নীতিগত এই জটিলতার দ্রুত সমাধান না হলে রফতানি খাতে অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে।

বর্তমান বাস্তবতায় সরকারকে একদিকে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করতে হবে, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় বাস্তবসম্মত ও নমনীয় কৌশল নিতে হবে। বুধবারের বৈঠক সেই কৌশল নির্ধারণের প্রথম ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। 




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button