‘সরীসৃপতন্ত্র’ প্রেম ও মানবীয় সম্পর্কের টানাপড়েন : সাজিদ উল হক আবির

প্রশ্ন: মেলায় আপনার নতুন কী বই প্রকাশিত হচ্ছে?
সাজিদ উল হক আবির: বছরখানেক ধরে দুটো বইয়ের কাজ করছিলাম। একটা আমার দ্বিতীয় উপন্যাস ‘সরীসৃপতন্ত্র’, অন্যটি মিলান কুণ্ডেরার উপন্যাস ‘দা আনবিয়ারেবল লাইটনেস অফ বিয়িং’ এর অনুবাদ। প্রথমটির কাজ শেষ করে প্রকাশকের দফতরে জমা দিতে পেরেছি। অনুবাদ উপন্যাসটির ভাষা সম্পাদনার কাজ শেষ করতে পারিনি। কাজেই, আশা করছি আমার উপন্যাস সরীসৃপতন্ত্র নিয়েই এবারের বইমেলায় পাঠকদের সম্মুখে হাজির হব।
প্রশ্ন: বইটি নিয়ে পাঠকদের কিছু বলুন? বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা কি এই বইয়ের বিষয়বস্তুকে প্রভাবিত করেছে?
উত্তর: প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশটুকু থেকে উত্তরটা শুরু করি। যে উপন্যাসে আমার সমাজ ও রাজনীতি বিষয়ে কিছু বক্তব্য রাখার থাকে, সে উপন্যাসের চরিত্রগুলিকে আমি বর্তমান সময়ে স্থাপন করি না কখনো। কারণ ‘বর্তমান’ খুব ঘোলাটে একটা ব্যাপার। চলমান সময়ে ঠিক-বেঠিক নির্ণয় করা যায় না। ঘটে যাওয়া ঘটনার সঙ্গে লেখকের একটা নৈর্ব্যক্তিক দূরত্ব তৈরি না হলে সে ব্যাপারে মন্তব্য হয়ে যায় আবেগ প্রসূত এবং ব্যক্তিগত বায়াসনেসের দোষে দুষ্ট। আমি লেখক হিসেবে বর্তমানের দিকে তাকাই বরাবর নিজের চরিত্রগুলিকে বর্তমান থেকে বেশ কিছুটা আগে স্থাপন করে। অতীতের সূত্র ধরে বোঝার চেষ্টা করি আমরা যে বর্তমানে দাঁড়িয়ে আছি, তা এমনটা হলো কেন।
যাইহোক, আমার উপন্যাস সরীসৃপতন্ত্রে মুখ্য বিষয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রেম এবং মানবীয় অন্যান্য সম্পর্কের টানাপড়েন। সময়কাল ১৯৮৭। এরশাদ বিরোধী রাজনীতির টালমাটাল এক বছর। নূর হোসেন শহিদ হওয়ার আগের তৃতীয় দিন থেকে উপন্যাসের গল্প শুরু হয়ে সমাপ্ত হয় যে মিছিলে নূর হোসেন শহিদ হয়, সে মিছিলে এসে। অবশ্য উপন্যাসের চরিত্রেরা সবাই কাল্পনিক। বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে, হাসনাবাদ এলাকার ‘টাইগারপাড়া’ নামক কাল্পনিক এক মহল্লার ঘটনা এ উপন্যাসে উঠে এসেছে।
প্রশ্ন: শুরু থেকেই মেলা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছিল, এমন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইভেন্টের প্রতি কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা আছে?
উত্তর: কর্তৃপক্ষ বলতে কাকে বোঝাচ্ছেন? বাংলা একাডেমিকে? একাডেমি তো গত ২ বছরে যথেষ্ট ব্যস্ত সময় কাটিয়েছে। বেশ কিছু উদ্যোগ প্রশংসা কুড়িয়েছে। কাজেই আলাদা করে বইমেলা নিয়ে তাদের অবহেলা আছে কিনা, জানি না। যে মন্ত্রণালয়ের অধীনে একাডেমি কাজ করে, তার কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে আমাদের মতো প্রভাব বলয়ের বাইরে অবস্থান করা লেখকদের দূরত্ব অনেক। কাজেই তাদের মাথায় কি কাজ করেছে মেলা নিয়ে, আমার জানা নেই।
প্রকাশকদের মধ্যে একটা বড় বিভাজন লক্ষ্য করেছি এ বছরের মেলা নিয়ে। একদল চেয়েছিলেন মেলাটা ডিসেম্বরেই হয়ে যাক। আরেকদল চেয়েছিলেন একুশের সংশ্লিষ্টতার জন্য মেলা ফেব্রুয়ারিতেই হোক। যেহেতু নিজেদের বইয়ের বিক্রি মেলার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত, যদি প্রকাশকেরা মেলার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারতেন, তবে সবার জন্য ভালো হতো।
প্রশ্ন: সময় কমিয়ে আনা ও রমজানের কারণে মেলায় কেমন প্রভাব পড়বে?
উত্তর: বইয়ের বিক্রি আসলে মেলার শেষ দিকেই হয়। কাজেই সময় কমিয়ে আনা বইয়ের বিক্রিতে বড় প্রভাব ফেলবে বলে মনে হয় না। লেখক-পাঠকেরা মেলায় ঘুরে ঘুরে আড্ডা দেওয়ার জন্য সময় কিছু কম পাবেন, এই কারণে সময় কমিয়ে আনায় লেখক-পাঠকদের মন কিছুটা ভার হতে পারে। সময় কমিয়ে আনলে প্রকাশকদের স্টল মেনটেইন করার খরচও কিছু কমে আসবে।
তবে রমজান মাসের প্রেক্ষাপটে মেলায় মানুষের সমাগম কিছুটা কম হতে পারে।
প্রশ্ন: গত বছর মেলা নিয়ে প্রকাশকদের হতাশা দেখেছি, অনেকের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল—এ বছর এমন কিছু আশঙ্কা আছে?
উত্তর: জাতীয় নির্বাচনের ১০ দিনের মাঝেই মেলা শুরু হবে বলে, নিরাপত্তা নিয়ে কিছুটা শঙ্কা থেকেই যায়। ক্ষমতা ও প্রশাসনিক পালাবদল তখনও ঠিকঠাক মতো হয়তো সেরে উঠবে না।
প্রশ্ন: একটি সুন্দর বইমেলা আয়োজন করতে কী কী পদক্ষেপ নিলে ভালো হয়?
উত্তর: মেলা সুন্দর হতো আমাদের শৈশবে, যখন বই ছিল স্বপ্নের প্রতিশব্দ। প্রতি বছর বইমেলা মানে নতুন নতুন বই নেড়েচেড়ে দেখা, বাছাই করে কিছু বই কেনা, সেগুলো পড়তে পড়তে বছরের অর্ধেক পার করে ফেলা, তারপর বছরের বাকি সময়টুকু পরের বইমেলার অপেক্ষায় দিন কাটত। লেখক হিসেবে মেলায় গেলে ইদানীং মন খারাপ হয়ে যায়। বইয়ের স্টলের সামনে বই কেনার চেয়ে সেলফি তোলার জন্য ভিড় বেশী হয়। আসল কেনাবেচা হয় মেলার খাবারের স্টলগুলোতে।
সামগ্রিকভাবে জাতির মননে পরিবর্তন না আনলে, জাতি বইমুখী না হলে বইমেলার অবকাঠামোগত, এবং প্ল্যানিং এ পরিবর্তন এনে মেলাকে সফল করা যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে আছি বলে, গবেষণা সূত্রে জানি, উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, যেমন, ডেনমার্ক ও ফিনল্যান্ডের স্কুলগুলোতে ডিজিটাল মিডিয়ামে পড়াশোনা সম্পূর্ণ বন্ধ করে ট্র্যাডিশনাল ম্যাথড, তথা বই ও খাতাকলম ভিত্তিক পড়াশোনা ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ফ্রান্স, ইতালি এবং বেলজিয়াম এখনও এ ব্যাপারে পাইপলাইনে আছে। আমরা পড়ে আছি টেকনোলজির গাড্ডায়। স্মার্টফোনে রিলস-শর্টস দেখা বন্ধ করানো না গেলে বইমেলার আয়োজন নিয়ে যত পরিকল্পনাই করা হোক, সবই ব্যর্থ হবে। আজকালকার বাচ্চাদের তো বইয়ের সঙ্গে শৈশবের স্মৃতি নাই তেমন। মেলায় গিয়ে তারা ছবি তোলা ছাড়া করবে কি?
প্রশ্ন: মেলায় এবং সারা বছর যত বই প্রকাশিত হয় তার ডিজিটাল ডেটাবেইজ কি বাংলা একডেমি বা কোনো কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করতে পারে?
উত্তর: প্রকাশিত বইয়ের তালিকা সংরক্ষণ করা যেতে পারে। প্রতিটি ভালো প্রকাশনা সংস্থাই নিজ নিজ প্রকাশিত বইয়ের আপডেটেড তালিকা প্রকাশ করেন প্রতিবছর। কিন্তু প্রকাশিত সমস্ত বই-ই ডিজিটাল ডাটাবেইজে জমা করে রাখতে হবে ই-ভার্শনে—আমি এমনটার পক্ষপাতী না। কারণ, যে বইয়ের যোগ্যতা আছে, তা ছাপার হরফে, মলাটবদ্ধ অবস্থাতেই টিকে যাবে। আর যে বই টেকার না, সেটাকে ই-বুক বানিয়ে ই-বুকের রাজ্যে আরও জঞ্জাল বাড়ানোর পক্ষপাতী আমি না। অধিক ম্যাটেরিয়াল থাকার ঝামেলা হলো, তাতে দরকারি ম্যাটেরিয়াল দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়।
প্রশ্ন: বইমেলায় পাঠক-লেখক সম্পর্ক বা যোগাযোগের বর্তমান বাস্তবতা কী?
উত্তর: লেখক বলতে বর্তমানে তো একটা বিচিত্র এবং ডাইভার্স গোষ্ঠীকে বোঝায়। বলতে চাইছি, প্রাবন্ধিক, কবি, কথাসাহিত্যিক—এরাও লেখক, আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় ফেমাস এমন সেলিব্রেটি/ইনফ্লুয়েন্সারদের বইও দেদারসে বেরুচ্ছে, এবং বিক্রি হচ্ছে। ইনফ্লুয়েন্সারদের একভাবে দেখছি মেলায় নিজের বইয়ের ক্রেতা বা পাঠকদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করতে। তারা সরাসরি লাইভ ভিডিয়ো করছেন, মজার মজার ভিডিয়ো বানাচ্ছেন। অনেকে প্রচারণা পাচ্ছেন নেগেটিভ মার্কেটিং-এর টেকনিক কাজে লাগিয়ে।
যারা শুধু লেখার কাজটাই যত্ন করে করেন, নিজের পাবলিক পারসোনা ঠিকভাবে হাইলাইট করতে পারছেন না, তারা সেভাবে পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগটা তৈরি করতে পারছেন না।
বোদ্ধা পাঠকদের একটা বড় সমস্যা হলো, তারা গত হয়ে যাওয়া কিংবদন্তিতুল্য লেখকদের লেখারও সমালোচনার তীরে বিদ্ধ করে অভ্যস্ত। সমসাময়িক লেখকদের তাদের কেউ কেউ ধর্তব্যেই আনেন না। লেখায় কি নেই সে নিয়েই সমস্ত আলাপ। কি আছে—সেদিকে পাঠক সমালোচকদের নজর কম। নতুন লেখকদের জন্য বড় নির্মম একটা সময় এটা।
প্রশ্ন: প্রচুর বই ছাপা হচ্ছে কিন্তু বইয়ের মান ও সম্পাদনা নিয়ে প্রকাশকরা কতটা সচেতন বলে মনে করেন?
উত্তর: বইয়ের সম্পাদনার দায়িত্ব, বর্তমান সময়ের বিবেচনায়, আমি মনে করি না পুরোপুরি প্রকাশকের দায়িত্ব। একজন ভালো প্রুফরিডারকে দেখিয়ে নিজের বইয়ের বানান নির্ভুল করা, সম্ভব হলে আরও কিছু পয়সা খরচ করে একজন ভাষা সম্পাদককে দেখিয়ে নেয়া—এগুলো লেখকের দায়িত্বের ভেতরেই পড়ে। বইয়ের প্রচ্ছদ তো ভালোই হয়। মেলার প্রতিটা স্টলেই একাধিক বই এমন পাবেন, যেটা মলাটের কারণে আপনার হাতে তুলে নিতে মন চাইবে। কিন্তু ভেতরের কনটেন্ট কেমন হবে, সেটা নির্ণয় করা তো প্রকাশকের দায়িত্ব না। সেটা নিশ্চিত করা লেখকের কাজ। আপনি জানেন, আপনার লেখাটা বই আকারে ছাপার মতো না, তবুও পয়সা দিয়ে একটা বই ছাপাচ্ছেন, এতে তো লেখক হিসেবে আপনার আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগার কথা।


