Uncategorized

আয়াতুল্লাহ খামেনি ও শাহাদাতের রাজনীতি

ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারকদের মধ্যে একটি দীর্ঘদিনের ধারণা রয়েছে যে, চরম চাপ, নিষেধাজ্ঞা, একাকীত্ব আর সামরিক ঝুঁকি শেষ পর্যন্ত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে নতিস্বীকার করতে বাধ্য করবে। কিন্তু এই ধারণা সম্ভবত খামেনি এবং তার রাজনৈতিক দর্শনকে বুঝতে ভুল করছে। খামেনির কাছে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ কোনও রাজনৈতিক বিকল্প নয়, বরং এটি তার অস্তিত্ব ও পরিচয়ের বিচ্যুতি।

খামেনির কাছে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব কোনও শেষ হয়ে যাওয়া ঘটনা নয়; এটি একটি চলমান সংগ্রাম। তার কাছে ‘প্রতিরোধ’ কোনও সাময়িক কৌশল নয়, বরং এটি তার ব্যক্তিগত পরিচয়। শাহ-বিরোধী আন্দোলন, কারাবাস এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধের অগ্নিপরীক্ষায় তার এই রাজনৈতিক সত্তা গড়ে উঠেছে।

তার সাহিত্যপ্রীতিও এই মানসিকতার প্রতিফলন ঘটায়। মিখাইল শলোখভ-এর ‘অ্যান্ড কোয়ায়েট ফ্লোস দ্য ডন’ উপন্যাসের নায়ক গ্রিগরি মেলেখভ যেভাবে যুদ্ধ ও বিপ্লবের ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও ব্যক্তিগত সম্মান ও সহনশীলতা আঁকড়ে ধরে থাকেন, খামেনি সেই দর্শনেই বিশ্বাসী। তার কাছে প্রতিকূলতার মধ্যে টিকে থাকাই হলো আত্মবিশ্বস্ততা।

১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের শেষে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জাতিসংঘ প্রস্তাব মেনে নেওয়াকে ‘বিষের পেয়ালা পানের’ সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল। খামেনি ১৯৮৯ সালে যখন ক্ষমতা পান, তখন তার সামনে খোমেনির মতো কারিশমাটিক কর্তৃত্ব ছিল না। গত তিন দশক ধরে তিনি তার পূর্বসূরির ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজের এক আপসহীন ভাবমূর্তি তৈরি করেছেন। নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ গ্রহণ করা মানে হবে তার সযত্নে লালিত সেই আদর্শিক ধারাবাহিকতার পতন। তাই ‘বিষের পেয়ালা’ পান না করাটা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়, বরং খোমেনির ছায়া থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার একটি লড়াইও বটে।

পশ্চিমা বিশ্ব মনে করে সামরিক হুমকি দিলে খামেনি নমনীয় হবেন। কিন্তু এই ধারণা কাজ করে তখন, যখন ‘বেঁচে থাকা’ হয় সর্বোচ্চ লক্ষ্য। খামেনির মহাবিশ্বে ‘শাহাদাত’ বা আত্মবলিদান হলো একটি নৈতিক বিজয়।

যদি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে তার মৃত্যু হয়, তবে খামেনি একজন অবরুদ্ধ শাসক থেকে ‘শহীদ’-এ রূপান্তরিত হবেন। এতে তার আমলের অর্থনৈতিক স্থবিরতা বা অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের ব্যর্থতাগুলো ঢাকা পড়ে যাবে এবং তার উত্তরাধিকার একটি ত্যাগের মহিমায় স্থিতিশীল হবে। এই ‘শাহাদাত’ পরবর্তী উত্তরসূরিদের জন্য বরং নমনীয় হওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে, কারণ তখন তারা এক পবিত্র উত্তরাধিকার নিয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

খামেনির কাছে পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল একটি দরকষাকষির ঘুঁটি বা বোমা বানানোর সক্ষমতা নয়; এটি একটি বিপ্লবী রাষ্ট্রের মর্যাদার প্রতীক। তার বক্তৃতায় পশ্চিমা চাপকে তিনি কেবল মতবিরোধ হিসেবে দেখেন না, বরং দেখেন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্বের প্রতি শত্রুতা হিসেবে। তার কাছে অর্থনৈতিক সংকটের চেয়ে ‘অপমান’ অনেক বেশি বিপজ্জনক।

২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিকে তিনি মেনে নিয়েছিলেন কারণ সেখানে ‘বীরত্বপূর্ণ নমনীয়তা’ দেখানোর সুযোগ ছিল, যা সরাসরি আত্মসমর্পণ ছিল না। কিন্তু ট্রাম্প যখন সেই চুক্তি থেকে সরে যান, তখন খামেনির এই বিশ্বাসই পোক্ত হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাসযোগ্য নয় এবং একবার নতিস্বীকার করলে তারা আরও নতুন নতুন দাবি তুলবে।

নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং সামরিক হামলা তাদের দুর্বলতাকে উন্মোচিত করেছে। এই চাপ হয়তো খামেনিকে আবারও কোনও ‘নমনীয়তার’ দিকে ঠেলে দিতে পারে। কিন্তু ওয়াশিংটন যদি মনে করে ইরান নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করবে, তবে তারা সম্ভবত খামেনির মনস্তাত্ত্বিক মানচিত্র বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র এমন একজন নেতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, যার কাছে চাপের মুখে আপস করা মানেই হলো অস্তিত্বের পরাজয়। আর যিনি পরাজয়ের চেয়ে মৃত্যু বা ব্যক্তিগত ঝুঁকি গ্রহণকেই শ্রেয় মনে করেন। খামেনির কাছে ‘বিষের পেয়ালা’ অস্পৃশ্যই থেকে যাবে।

ফরেন পলিসি অবলম্বনে।




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button