নতুন আশা, নতুন সুযোগ, নতুন শুরু

পবিত্র রমজান মাস আগমনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ আধ্যাত্মিক এক আলো ও নূরে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। মনে হয়- চারিদিকে যেন সওয়াব ও কল্যাণের বৃষ্টি ঝরছে এবং আল্লাহর প্রিয় বান্দারা তাদের রবের রহমত ও নেয়ামত লাভের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। সিয়াম সাধনার এই মাস অন্তরের প্রশিক্ষণ, আত্মশুদ্ধি ও সবরের (ধৈর্য) অনুশীলনের মাস।
এই মাসে প্রত্যেক সৎকর্মপ্রত্যাশীরই ইচ্ছা থাকে যে, সে নেক আমলে অগ্রসর হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করবে এবং নিজের দুনিয়া ও আখিরাতকে সুন্দর ও কল্যাণময় করে তুলবে। তবে গৃহস্থালি ও পেশাগত ব্যস্ততার কারণে কিছু নারী ও অসুস্থ মানুষেরা মাঝে মাঝে রোজা রাখা বেশ কঠিন মনে করেন। রমজানে তারা প্রচণ্ড ক্লান্তি ও অবসাদ অনুভব করেন, দিনগুলো অস্বাভাবিক দীর্ঘ মনে হয় এবং মনে বারবার এই প্রশ্ন জাগে- ‘আমি কি সুস্থভাবে ও নিরাপদে পুরো মাস রোজা রাখতে পারব?’
এ ধরনের অনুভূতি ও আবেগ একেবারেই স্বাভাবিক। কারণ, আমাদের নফস (প্রবৃত্তি) স্বভাবতই আরামপ্রিয়, আর রোজা দাবি করে ধৈর্য ও কষ্টসহিষ্ণুতা। রমজান মাসে আমরা ক্ষুধা-তৃষ্ণা এবং অন্যান্য নফসের চাহিদাকে সংযত করে শুধু আত্মাকে তৃপ্ত করি না; বরং আল্লাহর নৈকট্য লাভ এবং আত্মিক বিকাশও অর্জন করি।
একটি বিষয় মনে রাখা উচিৎ যে, যখন আমরা অসুস্থ হই বা অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়ি, তখন চিকিৎসক কখনোই আমাদের বেশি বেশি খাওয়া ও ঘুমানোর পরামর্শ দেন না; বরং তিনি খাদ্য ও ঘুম নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ব্যায়াম করার নির্দেশ দেন। মানে- আমাদের মানসিক ও শারীরিক উন্নতির জন্য পরিশ্রম ও কষ্ট অপরিহার্য। ঠিক তেমনি, পরিশ্রম ও কষ্ট স্বীকার না করে আত্মিক পরিশুদ্ধি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করাও সম্ভব নয়।
যেমন- আমরা জিমে ব্যায়াম করতে গিয়ে ঘামে ভিজে যাই, শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয়ে যায়, তবুও আমরা নিয়মিতভাবে পরিশ্রম চালিয়ে যাই- শারীরিক সুস্থতা অর্জনের জন্য। ঠিক তেমনি, রমজানুল মোবারকে যে আত্মিক পরিশ্রম ও সাধনা করা হয়, তা আমাদের দেহ, আত্মা এবং ঈমানকে শক্তিশালী করে তোলে।
আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনুল কারিমের সুরা আনকাবুতে ইরশাদ করেছেন, ‘আর যারা আমার পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায় তাদেরকে আমি অবশ্য অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব। অবশ্যই আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের সঙ্গে আছেন।’ (আয়াত: ৬৯) উল্লিখিত আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, যারা আল্লাহর পথে চেষ্টা-সংগ্রাম করে, আল্লাহ তাদেরকে সঠিক পথের দিশা দেন। আর রমজানের প্রতিটি রোজা, প্রতিটি ইবাদত এবং প্রতিটি নেক আমল- সবই আল্লাহর পথে সেই প্রচেষ্টা ও সাধনারই একটি রূপ।
কারণ, আল্লাহ তায়ালা আমাদের কাছ থেকে পরিপূর্ণতা প্রত্যাশা করেন না; বরং তিনি আমাদের নিয়ত ও প্রচেষ্টাকেই দেখেন। কেউ দুর্বল হোক, অসুস্থ হোক বা গুনাহগার- রমজান সবার জন্যই রহমতের মাস। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘সমস্ত কাজের ভিত্তি নিয়তের ওপর নির্ভরশীল, আর প্রত্যেক ব্যক্তি তাই-ই পাবে, যা সে নিয়ত করেছে।’ (সহিহ বুখারি)
এই হাদিস আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, আল্লাহ তায়ালা আমাদের নিয়ত দেখেন এবং তার পথে করা সামান্য প্রচেষ্টাকেও বৃথা যেতে দেন না। অন্য আরেকটি হাদিসে এই প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের প্রত্যাশা নিয়ে রোজা রাখে, তার পূর্বের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’
আমরা যদি অসুস্থতার পর প্রথমবার রোজা রাখি অথবা রোজার সময় দুর্বলতা ও ক্লান্তি অনুভব করি, তাহলে এতে উদ্বিগ্ন বা লজ্জিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ, খাঁটি নিয়ত নিয়ে করা আমাদেরর সামান্য প্রচেষ্টাও আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মূল্যবান এবং তা সওয়াবের কারণ। আর রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আল্লাহ তায়ালা তার আরশ থেকে তার প্রিয় বান্দাদের প্রতি ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন এবং তাদের সুন্দর নিয়তে সন্তুষ্ট। রমজানুল মোবারক আমাদের এ শিক্ষাও দেয় যে, প্রতিটি কষ্ট ও কঠিনতার সঙ্গে রয়েছে স্বস্তি, আর প্রতিটি অন্ধকার একদিন আলোতে রূপান্তরিত হতে পারে।
সুতরাং, আমাদের উচিত রমজানকে আত্মনবীকরণ ও নতুন সূচনার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা। এই বরকতময় মাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, আমরা যেন সৎ নিয়ত নিয়ে আল্লাহর পথে চলতে চলতে অতীতের গুনাহ, ভুলত্রুটি ও অনুশোচনা থেকে মুক্তি লাভ করি এবং অন্যদের দেওয়া কষ্ট ও দুঃখের ফলাফল আল্লাহর ওপর ন্যস্ত করি। আর এই কামনা করি যে, আল্লাহ তায়ালা রমজান মাসকে যেন এমনভাবে প্রেরণ করেন, যেন তা উদীয়মান সূর্য- যাতে পাপাচারের দীর্ঘ রাত্রির অবসান ঘটে এবং আমাদের হৃদয় নূরের আলোয় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই মাস আমাদের আহ্বান জানায়, আমরা যেন এটি সহানুভূতি, সেবা ও ভালোবাসার অনুভূতি নিয়ে অতিবাহিত করি। আশপাশের প্রয়োজনমুখী মানুষের জন্য সময় বের করি এবং তাদের সহায়তা করে তাদের দোয়া অর্জন করি। রমজানুল মোবারক আমাদের এ সুযোগও দেয় যে, আমরা অন্তরে জমে থাকা প্রতিটি দুঃখ-কষ্টের ভার থেকে মুক্ত হয়ে নতুন অঙ্গীকার ও নতুন আশাবাদ নিয়ে সামনে এগিয়ে যাই। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাওফিক দান করেন। আমিন।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও মাদ্রাসা শিক্ষক



