প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরও শাহজালালে থার্ড টার্মিনাল চালু নিয়ে শঙ্কা

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষে (বেবিচক) বিগত কয়েক বছর ধরে ব্যর্থ প্রশাসন এখনও বহাল তবিয়তে থাকায় দেশের অন্যতম মেগা প্রজেক্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল চালু হওয়া নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন দ্রুত প্রকল্পটি চালু করতে।
তবে বেবিচক কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের অদক্ষতা ও উদাসীনতার কারণে থার্ড টার্মিনাল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে কিনা তা নিশ্চিত নয়। অতীতের ভুল সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণে প্রতি বছর দেশের কোটি কোটি টাকা ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে।
সূত্রে জানা গেছে, গত ২২ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠকে বসেন। তিনি এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি)-এর সঙ্গে আলোচনায় বসার নির্দেশ দেন এবং যতদ্রুত সম্ভব থার্ড টার্মিনাল চালুর জন্য নির্দেশ দেন।
ওই বৈঠক শেষে বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী চেষ্টা করছেন যেন সামনে থার্ড টার্মিনাল চালু করা যায়। তিনি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর এ সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বেবিচকের বেশিরভাগ কর্মকর্তা। তারা বলছেন, এতদ্রুত প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে ভেবে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া প্রশংসার যোগ্য। তবে আগে থার্ড টার্মিনাল চালু করা যেত, শুধুমাত্র ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তার অদক্ষতা ও একগুঁয়েমির কারণে তা সম্ভব হয়নি।
বিশেষ করে থার্ড টার্মিনাল নির্মাণে অংশ নেওয়া জাপানের মিৎসুবিশি করপোরেশন ও ফুজিতা করপোরেশন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং সি অ্যান্ড টি করপোরেশনের যৌথ কনসোর্টিয়াম ‘এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি)’-র সঙ্গে দেনা-পাওনা নিয়ে কর্মকর্তাদের উদাসীনতা চরমে পৌঁছেছিল। এমনকি তারা মেগা প্রকল্পটিকে বিতর্কিত করার চেষ্টা পর্যন্ত করেছিল। এ কারণে প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। শুধুমাত্র এই কর্মকর্তাদের কারণে এডিসি-র দেনা-পাওনা আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে গিয়েছে, যা দেশের ভাবমূর্তিকে ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। রায়ে তাদের পক্ষে হয়েছে, যার ফলে ১৬৫০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে।
এছাড়াও ওই কর্মকর্তারা কক্সবাজার বিমানবন্দরকে যথেষ্ট প্রস্তুতি ছাড়াই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘোষণা করেছিলেন। পরবর্তীতে চালুর আগেই আবার তা বন্ধ ঘোষণা করতে হয়। এর ফলে এভিয়েশন খাতে দেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।
এর মধ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আগুনে পুড়ে যায় হাজার কোটি টাকার মালামাল। ঘটনার তদন্তে গঠিত কমিটিও বেবিচকের কর্মকর্তাদের উদাসীনতাকে সামনে আনে। সদস্য (অপারেশনস) মেহবুব খান ও সদস্য (নিরাপত্তা) আসিফ ইকবালকে দায়ী করা হয়। মন্ত্রণালয় থেকে তাদের প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হলেও তা এখনও কার্যকর হয়নি বলে গুঞ্জন রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সদস্য (অপারেশনস) মেহবুব খানের একগুয়েমীর কারণে বেবিচক শত শত কোটি টাকা রাজস্বও বঞ্চিত হয়েছে। তিনি বিমানবন্দরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লিজ হঠাৎ বাতিল করে তাদের উচ্ছেদ করেছেন
সূত্র বলছে, গতবছর নভেম্বর মাসে সিলেট ও সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে একজন নারী উদ্যোক্তাকে কোনও কারণ ছাড়াই হেনস্তা, অপমান ও জোরপূর্বক অপদস্থ করা হয়। এ সময় তার কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগকৃত তিনটি ব্যবসার মালামাল সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন সদস্য (অপারেশনস) মেহবুব খান। উপ-পরিচালক আখতার হোসেনের ফোনের মাধ্যমে দুই বিমানবন্দরের কিছু কর্মচারীকে দিয়ে মালামাল সরানো হয়। ওই সময় উদ্যোক্তা হাসিনা আহমেদ বা তার কোনও প্রতিনিধি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। পরে তিনি মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দিলে বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা প্রদান করেননি।
ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের মালিকরা বিষয়টি উচ্চ আদালতে নিলে পুনরায় লিজ বন্ধ হয়ে যায়, যা বর্তমানে চলমান। অথচ এই খাত থেকে বেবিচক প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেসব কর্মকর্তারা বেবিচকের তথা দেশের এতবড় মেগা প্রজেক্টকে বারবার বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছেন এবং থার্ড টার্মিনাল চালু হতে দেননি, তাদের রেখে দিয়ে কতটা সফলভাবে প্রকল্পটি চালু করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেবিচকের কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, থার্ড টার্মিনাল চালু হলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উঁচুতে উঠবে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার একটি বিমানবন্দর হাব হিসেবে পরিচিত হবে এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। তবে, গুটি কয়েক কর্মকর্তা বারবার প্রকল্প বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছেন। তাদের বেবিচক থেকে সরানো প্রয়োজন। এছাড়া, চালুর মাঝখানে আবার তারা এমন কিছু করতে পারে যাতে থার্ড টার্মিনাল পুনরায় আটকে যায়। যেহেতু প্রধানমন্ত্রী এর গুরুত্ব অনুধাবন করেছেন, তাই তার সতর্ক নজরদারিতে প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গতা পাবে
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহেদুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বর্তমান প্রশাসন দিয়ে থার্ড টার্মিনাল সফলভাবে চালু করা যাবে কি না তা নিয়ে তারও যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে। এডিসির সঙ্গে প্রশাসন যে আলোচনায় বসে, তাতে কোনো ফলাফল আসেনি এবং আমাদের বিশাল অঙ্কের টাকার ক্ষতি হয়েছে। সেই কর্মকর্তারা আবার আলোচনায় বসে কতটুকু সফলতা আনতে পারবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।
তিনি বলেন, সরকার যদি আন্তঃমন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করে যেখানে দক্ষ লোকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তবে প্রকল্পে পজিটিভ রেজাল্ট আসতে পারে। জাপান ও কোরিয়া আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র। তাদের সঙ্গে একযোগে কাজ করলে ভালো ফল পাওয়া যেত। কিন্তু অদক্ষতা ও অদূরদর্শিতার কারণে তা সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও বলেন, সবক্ষেত্রেই বেবিচক দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এর কারণে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। কিছু উল্টাপাল্টা সিদ্ধান্তের কারণে এভিয়েশন খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকার বেবিচককে ভেঙে রেগুলেটরি ও অপারেটিভ দুটি বডি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। দক্ষ লোকদের অন্তর্ভুক্ত করে দ্রুত কার্যকর করলে অগ্রগতি সম্ভব।
বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এস এম লাবলুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এটি মন্ত্রণালয়ে আলোচনা হয়েছে। এখনও কাজ শুরু হয়নি। থার্ড টার্মিনাল চালু বিষয়টি জাপানের সঙ্গে আলোচনা হবে। আর টাকা-পয়সার বিষয়টি এখনই দিতে হবে না। আমরা সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত চালুর চেষ্টা করবো। আগুনের ঘটনায় তদন্ত কমিটির কিছু ফাইন্ডিংস রয়েছে, আমরা তা নিয়ে কাজ করছি। অন্যান্য সার্বিক বিষয় মন্ত্রণালয় দেখবে।
প্রসঙ্গত, শাহজালালের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প একনেকে অনুমোদিত হয় ২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর। প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৩ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। পরে আরও ৭ হাজার ৭৮৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা বাড়িয়ে প্রকল্পের আকার দাঁড়ায় প্রায় ২১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে নির্মাণকাজ শুরু হয়। খরচের বড় অংশ আসে জাপানি সহযোগী সংস্থা জাইকার কাছ থেকে।



