Uncategorized

৩০০ টাকা বাঁচাতে ৩ ঘণ্টার লড়াই 

রাজধানীতে এখন চলছে পণ্য কিনে কয়েকশ’ টাকা বাঁচানোর লড়াই। সাশ্রয়ী দামে টিসিবির পণ্য কিনতে একেকজন সাধারণ মানুষকে রাজপথে গড়ে অন্তত তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। মাত্র ৩০০ টাকা সাশ্রয়ের আশায় শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছাড়া বাকি ৬ দিনই কাকডাকা ভোর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ চলে দিনের শেষ বেলা পর্যন্ত। 

৩০০ টাকার জন্য ৩ ঘণ্টার সংগ্রাম 

টিসিবি (ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ) বর্তমানে সারা দেশে ৪৫০টি ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের মাধ্যমে সয়াবিন তেল, মসুর ডাল, চিনি, ছোলা ও খেজুর—এই পাঁচটি পণ্যের একটি প্যাকেজ ৫৯০ টাকায় বিক্রি করছে। 

সংস্থাটির ট্রাক থেকে একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ দুই লিটার সয়াবিন তেল, দুই কেজি মসুর ডাল, এক কেজি চিনি, এক কেজি ছোলা ও আধা কেজি খেজুর কিনতে পারছেন। প্রতি লিটার তেলের দাম রাখা হচ্ছে ১১৫ টাকা। এ ছাড়া প্রতিকেজি চিনি ৮০, মসুর ডাল ৭০, ছোলা ৬০ ও আধা কেজি খেজুরের দাম ৮০ টাকা। সব মিলিয়ে এক প্যাকেজ পণ্য কিনতে খরচ হয় ৫৯০ টাকা।

বাজার দরে সমপরিমাণ পণ্য কিনতে খরচ হয় ৯০০ থেকে ৯২০ টাকা। অর্থাৎ, টিসিবির লাইনে দাঁড়ালে একজন ক্রেতার সাশ্রয় হচ্ছে অন্তত ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা। এই কয়টি টাকা বাঁচাতে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ রোদ উপেক্ষা করে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন। 

সরেজমিন চিত্র 

রাজধানীর প্রেস ক্লাব, সচিবালয় এলাকা, মতিঝিল, মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও উত্তরার বিভিন্ন পয়েন্টে সরেজমিন দেখা যায় টিসিবির ট্রাকের পেছনে নারী-পুরুষের দীর্ঘ সারি। ট্রাক আসার আগেই সকাল থেকেই লাইনে ৫০-৬০ জন ছাড়িয়ে যায়। ক্রমেই লাইনে মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এ যেন এক লড়াই, রীতিমতো যুদ্ধের মতো। 

পণ্য পৌঁছানোর পর টোকেন সংগ্রহ থেকে শুরু করে মালামাল বুঝে পাওয়া পর্যন্ত চলে ধাক্কাধাক্কি ও বিশৃঙ্খলা। অনেক সময় পণ্য না পেয়েই খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে অনেককে। অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদের সময় রোদে আর বৃষ্টির সময় বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকছেন, এমনকি পণ্য না পেয়ে খালি হাতেও ফিরছেন অনেকে। ভিড়ের কারণে ট্রাকের পেছনে হুড়োহুড়ি ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে, যা জনদুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। 

হুড়োহুড়িতে আহত হলেন নারী ক্রেতা 

লাইনে দাঁড়ানো মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাহিদার তুলনায় পণ্য কম হওয়ায় মানুষ দ্রুত পণ্য পাওয়ার জন্য হুড়োহুড়ি করে। এর ফলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। এতে পণ্য বিক্রিতে সময়ক্ষেপণ হয়। লাইনে দাঁড়ানো প্রতিটি মানুষের সময় নষ্ট হচ্ছে গড়ে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। অনেক সময় পণ্য বিক্রির জন্য টিসিবির ট্রাক স্থান পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। তখন সেই ট্রাক ধরার চেষ্টায় মানুষ দৌড়ে পেছনে ছোটে। চলন্ত ট্রাকের পেছনে ঝুলে পড়তেও দেখা যায়। 

অতিরিক্ত ভিড় ও অব্যবস্থাপনার কারণে মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরে ৬/সি রোডে টিসিবির চলন্ত ট্রাকের পেছনে ঝুলতে গিয়ে এক নারী ছিটকে পড়ে আহত হয়েছেন। স্থানীয়রা জানান, ট্রাকচালক ভিড় এড়াতে স্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করলে পণ্য পাওয়ার আশায় কয়েকজন চলন্ত ট্রাকের পেছনে ঝুলে পড়েন, যার ফলে এই দুর্ঘটনা ঘটে। 

চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ অপ্রতুল 

টিসিবির মুখপাত্র শাহাদত হোসেন জানিয়েছেন, বর্তমানে সারা দেশে ৪৫০টি ট্রাকের মাধ্যমে প্রতিদিন পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। এভাবে ট্রাক সেলের মাধ্যমে প্রায় ৩৫ লাখ ভোক্তার কাছে ২৩ হাজার টন পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। প্রতিটি ট্রাকে ৪০০ জনের বরাদ্দ থাকে, কিন্তু লাইনে দাঁড়ায় এর দ্বিগুণেরও বেশি মানুষ। বরাদ্দ বাড়ানো গেলে জনভোগান্তি কমতো বলে তিনি জানান। তবে রমজানে চাহিদা ব্যাপক বেড়ে যাওয়ায় শৃঙ্খলা রক্ষা করতে হিমশিম খেতে হয়। 

চক্ষুলজ্জা ছেড়ে লাইনে মধ্যবিত্তরা 

রাজধানীর জিরোপয়েন্ট এলাকায় আব্দুল গনি রোডে টিসিবির ট্রাক সেলের কার্যক্রম পরিচালনা করছে ডিলার কর্তৃক নিয়োজিত কর্মচারী রমজান আলী। তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, আগে কেবল হতদরিদ্রদের দেখা গেলেও এখন অনেক স্বল্প আয়ের চাকরিজীবী ও মধ্যবিত্ত মানুষও চক্ষুলজ্জা ছেড়ে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। সচিবালয়ের অনেক কর্মচারীও এখন টিসিবির লাইনে শামিল হচ্ছেন। 

রাজধানীর যাত্রাবাড়ি সংলগ্ন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে কাজলা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ানো টিসিবির ট্রাকের পণ্য কেনার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছেন আব্দুল হক নামের একজন ৭০ বছর বয়স্ক বৃদ্ধ। তিনি জানিয়েছেন, “ছেলে অফিসে গেছে, নাতির স্কুল বন্ধ। স্কুলে যাওয়া লাগে নাই, তাই সকালটা বসেই ছিলাম। ছেলে ফোন করে জানিয়েছে টিসিবির পণ্য কেনার জন্য। তাই এসেছি। এখান থেকে এক প্যাকেজ মাল ৫৯০ টাকা দিয়ে নিলে কমপক্ষে ৩০০ টাকা সাশ্রয় হয়।” 

উল্লেখ্য, সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১২ মার্চ পর্যন্ত ২০ দিনব্যাপী এই ট্রাক সেল কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে মানুষের কষ্ট কমাতে প্রতিটি পয়েন্টে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, শৃঙ্খলাবদ্ধ লাইন ব্যবস্থাপনা ও টোকেন ব্যবস্থাপনা চালুর দাবি জানিয়েছেন সাধারণ ভুক্তভোগীরা।




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button