নাদিয়া হোসেনের সঙ্গে বিবিসি কেন সম্পর্ক ছেদ করেছিল?

লন্ডনের এক শীত সকাল। টিভি পর্দায় ভেসে উঠল সেই পরিচিত মুখ, নাদিয়া হুসেন। একসময় যাকে ‘বেক অব’-এর প্রিয় মুখ বলে ডাকা হতো, আজ তিনি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন। বললেন, ‘হাই গাইজ, তোমাদের আমার জীবনের একটা আপডেট দিতে যাচ্ছি।’
গল্পটা শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালে। সেই বছর গ্রেট ব্রিটিশ বেক অব-এর তাঁবুতে দাঁড়িয়ে এক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী জিতে নেন শিরোপা। সেদিনের তার কথা মনে আছে অনেকেরই, ‘আমি কেউ নই, কিন্তু আজ আমি কেউ হয়েছি’। এরপরই শুরু হয় উত্থান। বিবিসিতে একের পর এক অনুষ্ঠান, ‘দ্য ক্রনিকলস অব নাদিয়া’, ‘নাদিয়াস এশিয়ান ওডিসি’। মুসলিম পরিচয় নিয়ে গর্ব করে তিনি দেখিয়েছেন এশিয়ার রান্না, বলেছেন নিজের শেকড়ের গল্প। বই চুক্তি, বিজ্ঞাপন সবই পেয়েছেন।
দশক পেরিয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে হঠাৎ করেই থেমে গেল সেই পথচলা। বিবিসি জানালো, নাদিয়ার সঙ্গে আর কোনও অনুষ্ঠান তারা করবে না। চুপচাপ, গুঞ্জন ছাড়াই, একেবারে নীরবে।
নাদিয়া বললেন, ‘আমি এখনও জানি না কেন আমাকে বাদ দেওয়া হলো। কোনও কারণ জানায়নি বিবিসি।’ সম্প্রতি এক পডকাস্টে তিনি অভিযোগ করলেন, তার ধর্ম মুসলিম হওয়াটাই কি এর পেছনের কারণ? কিন্তু বিবিসির লোকেরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, ধর্ম নয়, অন্য কিছু কারণ আছে।
সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানিয়েছে, ‘দেখুন, নাদিয়ার বিবিসিতে একটা দীর্ঘ ও ফলপ্রসূ সময় কেটেছে। এক দশক ধরে তিনি অনুষ্ঠান করেছেন। কিন্তু বিবিসি সব সময় নতুন মুখ আনে, খাবারের অনুষ্ঠানের জন্যও সময় হয়েছে নতুন প্রজন্মকে দেখার।’
আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, নাদিয়ার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছিল। ওই সূত্রের মতে, ‘বেক অব জেতার পর তিনি অনেক সুযোগ পেয়েছেন; টেলিভিশন শো, বই এবং বিজ্ঞাপনে তাকে নিয়মিত দেখা গেছে। কিন্তু ক্যারিয়ারকে তিনি পরবর্তী ধাপে নিয়ে যেতে পারেননি। দীর্ঘ ১০ বছর পর এখন নতুনরা আসছেন, যাদের রান্নার কৌশল অনেক বেশি আকর্ষণীয়। অন্যদিকে, নাদিয়ার রেসিপিগুলো এখন বৈচিত্র্যহীন মনে হচ্ছে।’
সংশ্লিষ্ট অপর একটি সূত্র আরও গুরুতর অভিযোগ তুলেছে। তাদের অভিযোগ, নাদিয়ার সঙ্গে কাজ করা কঠিন হয়ে উঠছিল। ওই সূত্রের ভাষ্যমতে, শুরুর দিকের তুলনায় তার আচরণে অনেক পরিবর্তন এসেছে। তারকাখ্যাতি পাওয়ার পর তিনি আগের মতো সহযোগিতামূলক ছিলেন না। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিবিসির এই সিদ্ধান্তটি যৌক্তিক বলেই মনে হয়।
বিবিসি থেকে বিদায় নেওয়ার পর নাদিয়ার জীবন এক নাটকীয় মোড় নেয়। এক সময়ের জনপ্রিয় এই টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পেশায় নিয়োজিত। বর্তমানে তিনি একটি স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করছেন। যেখানে লক্ষাধিক দর্শক তার রান্নার অনুরাগী ছিলেন, সেখানে এখন তিনি মাত্র ২০ হাজার পাউন্ড বেতনে শিশুদের পাঠদানে সময় অতিবাহিত করছেন।
তবে সেখানেও তার সময়টি সুখকর ছিল না। অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে এক ভিডিও বার্তায় তিনি কাঁদতে কাঁদতে জানান, ‘আমি এই পেশাটিকে গভীরভাবে ভালোবেসেছিলাম। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতা ও দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে আমার পক্ষে এই কাজ চালিয়ে যাওয়া আর সম্ভব হচ্ছে না।’
তার ব্যবসা অবশ্য ভালোই চলছে। বই বিক্রি করে তার সম্পদ এখন প্রায় ২ মিলিয়ন পাউন্ড। কিন্তু টিভির পর্দায় কি আর দেখা যাবে তাকে? বিবিসির এক মুখপাত্র বলেছেন, ‘নাদিয়া আমাদের পরিবারের একজন মূল্যবান সদস্য। কিন্তু তাকে নিয়ে নতুন কোনও অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা আপাতত নেই।’
টানা এক দশকের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের পর নাদিয়া হোসেন আজ জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছেন। টেলিভিশনের জমকালো পর্দা থেকে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ পর্যন্ত এই যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। তবে যে নারী একদা বিনম্র মুখে বলেছিলেন, ‘আমি বিশেষ কেউ নই’, আজ তিনি নিজের কর্মের মাধ্যমেই নিজেকে প্রমাণ করেছেন। তবু প্রশ্ন থাকছে, জনপ্রিয় এই মুখ কি আবারও টেলিভিশনের পর্দায় ফিরে আসবেন?
সূত্র: ডেইলি মেইল



