Uncategorized

মোকাবিলায় ভবিষ্যতের ঘাত-প্রতিঘাত, কেমন হওয়া উচিত সরকারি খাত?

বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবস্থান সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে সামনে এমন এক সময় উপস্থিত— যখন দ্রুত নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, প্রযুক্তিগত রূপান্তর, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন এবং জটিল ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা রাষ্ট্রকে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। এসব মোকাবিলায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো, শাসনব্যবস্থা ও অভিযোজন ক্ষমতাকে নতুনভাবে কল্পনা করা এখন অপরিহার্য।

এখন দেখা যাক, বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে কী ধরনের পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য যে চ্যালেঞ্জগুলো সবচেয়ে জটিল আকার ধারণ করবে, সেগুলোর বড় অংশই সরাসরি সরকারি খাতের সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় অঞ্চল ও নগরাঞ্চলে বাস্তুচ্যুতি, খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য সংকট এবং অবকাঠামোগত চাপ দ্রুত বাড়বে। একইসঙ্গে তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর সামাল দেওয়া হবে বড় নীতিগত পরীক্ষা। দ্রুত নগরায়ণ থেকে সৃষ্ট আবাসন, পরিবহন ও সেবা বৈষম্য, ডিজিটাল বিভাজন ও সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি, এবং সামাজিক বৈষম্য ও আস্থাহীনতা মোকাবিলায় সরকারি প্রতিষ্ঠানকে হতে হবে আরও সমন্বিত, তথ্যনির্ভর ও নাগরিককেন্দ্রিক। এর পাশাপাশি আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক চাপ, বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু ও বাণিজ্য ব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার দায়িত্বও মূলত সরকারি খাতকেই বহন করতে হবে, যা ভবিষ্যতের শাসনব্যবস্থাকে আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি দক্ষ, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ও অভিযোজিত হওয়ার দাবি জানায়।

পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশকে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সবার আগে অভিযোজিত ও শিখনমুখী শাসন ব্যবস্থা প্রয়োজন। ভবিষ্যতের সরকারি খাতকে প্রচলিত প্রশাসনিক রুটিনের গণ্ডি ছাড়িয়ে অভিযোজিত ও শিখনমুখী শাসনব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হতে হবে। অতীতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় দক্ষ ছিল। কিন্তু আগামী কয়েক দশকে প্রয়োজন হবে আরও গতিশীল ব্যবস্থা, যেখানে সিদ্ধান্ত হবে তথ্যনির্ভর, প্রতিক্রিয়া হবে দ্রুত এবং নীতিনির্ধারণ হবে পরীক্ষা নিরীক্ষাভিত্তিক।

কৃষি, স্বাস্থ্য, পরিবহন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো খাতে রিয়েল-টাইম ডেটার ব্যবহার স্থির পরিকল্পনার বিকল্প হয়ে উঠবে। একইসঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জৈবপ্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো উদীয়মান ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর নীতিনির্ধারণের জন্য আধুনিক নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ভবিষ্যত নীতিনির্ধারণ ইউনিট  প্রতিষ্ঠা জরুরি, যারা দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি ও সম্ভাবনা বিশ্লেষণে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে। এর কেন্দ্রে থাকবে এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি, যেখানে ব্যর্থতাকে ভয় না পেয়ে নতুন চিন্তা ও উদ্যোগকে উৎসাহ দেওয়া হয়।

পাশাপাশি ভবিষ্যতের সিভিল সার্ভিস নিয়েও ভাবতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার মূল ভিত্তি হলো আধুনিক, দক্ষ ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন সিভিল সার্ভিস। ভবিষ্যতের সিভিল সার্ভিসকে হতে হবে প্রযুক্তিতে পারদর্শী, বহুমাত্রিক জ্ঞানসম্পন্ন এবং উদ্ভাবনমুখী। নিয়োগ ব্যবস্থায় দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন চালু করা প্রয়োজন, যেখানে বিশ্লেষণী ক্ষমতা, ডিজিটাল দক্ষতা এবং আচরণগত গুণাবলির ওপর জোর দেওয়া হবে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বেসরকারি খাতের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। সাধারণ ক্যাডার কাঠামোর ভেতরে বিশেষায়নের সুযোগ সৃষ্টি এবং কর্মসম্পাদন মূল্যায়নকে চাকরির মেয়াদের পরিবর্তে ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত করাও সময়ের দাবি।

সেইসঙ্গে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের বিশ্বাস অর্জন কার্যকর শাসনের মূলভিত্তি। তাই ভবিষ্যতের সরকারি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নাগরিক অংশগ্রহণের ওপর। বাজেট, ক্রয়প্রক্রিয়া ও প্রকল্পের অগ্রগতি সংক্রান্ত তথ্য জনসাধারণের জন্য রিয়েল-টাইমে উন্মুক্ত করা প্রয়োজন। নীতিমালা প্রণয়ন ও সেবার প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের সরাসরি যুক্ত করতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও আলোচনাভিত্তিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। একইসঙ্গে স্বাধীন নিরীক্ষা ও তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে জবাবদিহি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়।

ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে অর্থনৈতিক রূপান্তর ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত বৈচিত্র্যময় হচ্ছে। তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে শিল্পের বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তি খাতের সম্প্রসারণ, উচ্চমূল্যের কৃষি উৎপাদন এবং সুনীল অর্থনীতির বিকাশ নতুন ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা দাবি করে। এ ক্ষেত্রে বিশেষায়িত শিল্পনীতি ইউনিট, রেগুলেটরি স্যান্ডবক্স এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সহযোগিতা ভবিষ্যৎ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। 

একইসঙ্গে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল রাষ্ট্রব্যবস্থার কোনও বিকল্প নাই। প্রযুক্তি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে প্রতিস্থাপন করবে না, বরং তাদের সক্ষমতা বহুগুণে বাড়াবে। সমন্বিত ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থা নাগরিকদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর ও সামাজিক সুরক্ষা সেবায় সহজ প্রবেশ নিশ্চিত করতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিচারব্যবস্থা, কৃষি সম্প্রসারণ, পরিবহন ব্যবস্থাপনা ও জনস্বাস্থ্যে কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। এর পাশাপাশি শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো এবং বন্দর, শিল্পকারখানা ও সরকারি সেবায় রোবটিকস ও অটোমেশনের সৃজনশীল ব্যবহার অপরিহার্য।

সেইসঙ্গে দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যা কথা মাথায় রেখে বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার জোরদার করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা দরকার। দ্রুত নগরায়ণ ও আঞ্চলিক বৈষম্য কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। এ প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সরকারকে আর্থিক ও প্রশাসনিকভাবে আরও ক্ষমতাবান করা জরুরি। পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নিজস্ব সম্পদ সংগ্রহ ও ব্যয়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়, স্থানীয় শিল্প ও সরকারি সংস্থার সমন্বয়ে আঞ্চলিক উদ্ভাবন অঞ্চল গড়ে তোলা যেতে পারে— যা নতুন প্রযুক্তি ও সেবার পরীক্ষাগার হিসেবে কাজ করবে।

এসব কার্যক্রমের পাশাপাশি পররাষ্ট্রনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক প্রস্তুতি নেয়াও প্রয়োজন। জটিল ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে আরও কৌশলগত, জ্ঞানভিত্তিক ও আগাম প্রস্তুতিমূলক হতে হবে। বাণিজ্য, প্রযুক্তি, জলবায়ু কূটনীতি ও নিরাপত্তা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সংযোগ, নদী ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও অভিবাসনে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে।

সেইসঙ্গে জলবায়ু ঝুঁকি বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান জলবায়ু ঝুঁকির মুখোমুখি  – সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, চরম আবহাওয়া ও বাস্তুচ্যুতি এর প্রধান উদাহরণ। এসব মোকাবিলায় পরিবেশ, পানি, কৃষি, নগর পরিকল্পনা ও অভিবাসন নীতিকে একত্র করে সমন্বিত জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রয়োজন। কোথায় উন্নয়ন সম্প্রসারিত হবে এবং কোথায় সীমিত বা স্থানান্তর প্রয়োজন— তা নির্ধারণে গতিশীল ভূমি ব্যবস্থাপনা জরুরি। পাশাপাশি মন্ত্রণালয় পর্যায়ে দক্ষ জলবায়ু অর্থায়ন ইউনিট গড়ে তুলতে হবে, যারা আন্তর্জাতিক তহবিল আহরণ ও বাস্তবায়নে সক্ষম হবে।

সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সাফল্য নির্ভর করবে এমন সরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর, যারা হবে নমনীয়, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, সহযোগিতাপূর্ণ, তথ্যনির্ভর এবং নাগরিক-কেন্দ্রিক। এই রূপান্তর কোনও এককালীন সংস্কারের ফল নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পেশাদারত্ব, জনসম্পৃক্ততা এবং প্রচলিত কাঠামো নতুন করে ভাবার সাহস— এই চারটি ভিত্তির ওপরই দাঁড়িয়ে আছে ভবিষ্যৎ রূপান্তরমুখী বাংলাদেশ।

ড. মোহাম্মদ কামরুল হাসান, জনপ্রশাসন এবং জননীতি বিশ্লেষক

 




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button