শ্রীলঙ্কায় বাংলাভাষা ভালোই ব্যবহার করছেন পাকির আলী

৭৩ বছর বয়সেও তারুণ্যের ছাপ স্পষ্ট। সকালে পালসার মোটরবাইক চালিয়ে কলম্বোর মেরিন ড্রাইভ রোডের হোটেল লবিতে এসে হাজির পাকির আলী। আগের দিনই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন—নতুন কিছু জানাতে চান। ফোনালাপেই খানিকটা রোমাঞ্চ টের পাওয়া গিয়েছিল। নিচে দেখা হতেই পরিষ্কার হলো সেই উত্তেজনার কারণ।
১৯৮১ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব আবাহনী লিমিটেডে স্টপার ব্যাক হিসেবে খেলেছেন ঝাঁকড়া চুলের পাকির আলী। খেলতে খেলতেই রপ্ত করেছেন বাংলা ভাষা। এখনও অনর্গল বাংলায় কথা বলে সবাইকে চমকে দেন। সেই সময়েই বাংলাদেশকে আপন করে নিয়েছিলেন তিনি।
খেলোয়াড়ি জীবন শেষে কোচ হিসেবেও কাজ করেছেন আবাহনী, মোহামেডান, শেখ জামাল, পিডাব্লিউডি ও পুলিশ দলে। কোচিংয়ের সময়ও বাংলা ভাষাই ছিল তার প্রধান ভরসা। খেলোয়াড়দের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে যা তাকে আলাদা সুবিধা দিয়েছে।
বাংলা ভাষা পিছু ছাড়েনি
বাংলাদেশের ফুটবলের সঙ্গে তার সক্রিয় সম্পর্ক শেষ হয়েছে অনেক দিন। কিন্তু বাংলা ভাষা এখনও তার সঙ্গী। কলম্বোর একটি অভিজাত হাসপাতালে বাংলা জানার কারণে তাকে এক প্রকার ‘দূত’ বানানো হয়েছে বাংলাদেশি রোগীদের জন্য।
হাসপাতালটিতে বাংলাদেশি রোগীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে তারা এসে নির্বিঘ্নে উন্নত চিকিৎসা পেতে পারেন। পাকির আলীর জন্য এটি এক নতুন অভিজ্ঞতা। বাংলা ভাষাভাষী রোগীদের নিয়ে কাজ করার সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বসিত সাবেক এই তারকা ডিফেন্ডার।
বললেন, ‘এই হাসপাতালে আমার মেয়ের টিউমার অপারেশন করিয়েছি। এখানকার সুবিধাও আলাদা। কোনোভাবে কর্তৃপক্ষ জানতে পারে আমি বাংলা জানি, বাংলাদেশে খেলেছি ও কোচিং করিয়েছি। এরপর তারা আমাকে বাংলাদেশি রোগীদের জন্য কাজ করার আমন্ত্রণ জানায়। পুরোটাই অবৈতনিক। শুধু বাংলা জানি বলেই রাজি হয়েছি। আপনাদের মাধ্যমে জানাতে চাই—এই হাসপাতালে সব ধরনের চিকিৎসা হয়, ভাষা নিয়ে কোনও সমস্যা নেই। আমি আছি।’
হামজা চৌধুরী প্রসঙ্গ
বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার ফুটবল নিয়েও দীর্ঘ আলোচনা হলো তার সঙ্গে। বিদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের অন্তর্ভুক্তিতে দুই দেশই উপকৃত হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তার কথায়, ‘বিদেশি খেলোয়াড় আসার পর আমাদের শ্রীলঙ্কা জাতীয় দল শক্তিশালী হয়েছে। আমরা কয়েকটি ম্যাচ জিতেছি, ফিফা র্যাঙ্কিংও উন্নত হয়েছে। বাংলাদেশেও হামজা চৌধুরীর মতো খেলোয়াড় খেলেছে। সে একাই ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে, অন্যরাও আছে। দল ভালো করছে। তবে পাশাপাশি তৃণমূলেও জোর দেওয়া উচিত।’
আবাহনীতে ট্রফি চুরি
বর্তমানে কলম্বোতে অ্যাকাডেমি নিয়ে ব্যস্ত শ্রীলঙ্কার জাতীয় দলের সাবেক এই কোচ। আবাহনীর হয়ে বহু শিরোপা জিতেছেন। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ক্লাব থেকে অধিকাংশ ট্রফি চুরি হয়ে যাওয়ার খবর তাকে ভীষণ হতাশ করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন সম্পর্কে অবগত পাকির আলী বলেছেন, ‘রাজনীতি কখনও খেলাধুলার ভেতরে আসা উচিত নয়। আবাহনী ক্লাব যেভাবে ভাঙচুর করা হয়েছে এবং ট্রফি লুট হয়েছে, তা ঠিক হয়নি। আমরা যখন খেলতাম, সমর্থকদের আনন্দ দিতাম। বিনিময়ে বেতন পেতাম, সেটা ছিল আমাদের সার্ভিসের মূল্য। কিন্তু স্মৃতি হিসেবে আমাদের কাছে কী থাকে? শুধু একটি ট্রফি।’
হতাশ কণ্ঠে তারপর যোগ করলেন, ‘‘একদিন যদি বাংলাদেশে গিয়ে ট্রফি রুমে দেখি—‘আরে, এটা তো সেই কাপ যা আমি জিতেছিলাম’, কিন্তু সেটি যদি সেখানে না থাকে, কেমন লাগবে? মনে হবে—‘হায়, আমার কাপটা কোথায়? আমি তো এখানেই রেখেছিলাম।’ এর সঙ্গে আমাদের রক্ত মিশে আছে। শুধু আমি নই, দেশি-বিদেশি সব খেলোয়াড়ই মাঠে ঘাম ঝরিয়েছে, রক্ত ঝরিয়েছে দর্শকদের আনন্দ দিতে। বিনিময়ে যে ছোট ট্রফি বা মেডেল পাই, সেটাই আমাদের স্মৃতি।’
বাংলাদেশে অনেক দিন পর লঙ্কান খেলোয়াড়
বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলে দীর্ঘদিন পর আবার শ্রীলঙ্কার খেলোয়াড় দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি আনন্দ দিচ্ছে পাকির আলীকে। বর্তমানে গোলকিপার সুজন পেরেরা ফর্টিস এফসিতে খেলছেন। এর আগে আশির দশকে হাশিম দীন ও লায়নেল পিরিজও খেলেছেন।
পাকির বললেন, ‘এটা খুব ভালো দিক। আগে আমাদের এখান থেকে আমি-সহ অনেকেই খেলেছি। এবার অনেক দিন পর সুজন খেলছে। আশা করি সামনে আরও অনেকে খেলবে।’
আমিনুল ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হওয়ায় খুশি
বাংলাদেশের সাবেক তারকা গোলকিপার আমিনুল হক ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হওয়ায় আনন্দিত পাকির আলী। স্মৃতিচারণ করে বললেন, ‘‘একটা গল্প বলি। শেখ জামালে আসার আগে আমার মিয়ানমারে একটি পেশাদার দলে যাওয়ার কথা ছিল। ভিসা হয়ে গিয়েছিল, টিকিটের অপেক্ষায় ছিলাম। হঠাৎ আমিনুল ফোন করলো—‘ওস্তাদ, কই আপনি?’ বললাম, বাসায়। মিয়ানমারে যাওয়ার টিকিটের অপেক্ষায়।’ সে বললো, ‘না না, আপনি তো যেতে পারবেন না।’ বাংলাদেশের কথা উঠতেই মনে হলো, ওখানে না যাওয়াই ভালো। শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারের ক্লাবের টেকনিক্যাল ডিরেক্টরকে—যিনি আমার ভালো বন্ধু—বলতে বাধ্য হলাম যে ফেডারেশন ছাড়পত্র দিচ্ছে না। এভাবেই বাংলাদেশে চলে আসি। বাংলাদেশের জন্য আমার মনে আলাদা জায়গা আছে।”
তিনি আরও বলেন, ‘ক্রিকেট এখন খুব ভালো করছে। আমার অনুরোধ থাকবে, আমিনুল যেন ফুটবলকেও সেই উচ্চতায় নিয়ে যায়।’
ভবিষ্যতে বাংলাদেশে কাজ করার আগ্রহ
ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকে ডাক এলে আবারও কোচিং করাতে আগ্রহী শ্রীলঙ্কান এই লিজেন্ড। হাসতে হাসতেই বললেন, ‘এটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশ থেকে ডাকলে আসবোই। আপনারা তো জানেন, এটা নতুন করে বলার কিছু নেই।’



