বিজয়ের রক্ষা কবচ-১

বাংলাদেশের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবেই সংগ্রামী মানুষ। তাদের দীর্ঘ আন্দোলন এবং সংগ্রামের মাধ্যমেই ১৯৭১ সালে পরিবেশ স্বাধীন হয়েছিল। স্বাধীনতার প্রত্যাশা উসুল না হওয়ায় তারা বারবার আন্দোলনে নেমেছে। সংগ্রামী মানুষের দীর্ঘ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আসে ২০২৪ সালের জুলাই গণআন্দোলন। সেই গণআন্দোলনের বিজয়ের মধ্য দিয়ে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হলো— এ দেশের ইতিহাসের অন্যতম সর্বাধিক অংশগ্রহণমূলক ও নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সেই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে নতুন সরকার গঠন করেছে বিএনপি। সদ্য বিজয়ী একটি সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিজয় অর্জন নয়, বরং সেই বিজয়কে ধরে রাখা এবং কল্যাণমুখী রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তিতে রূপান্তর করা। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই ‘বিজয়ের রক্ষা কবচ’ শিরোনামের এই ধারাবাহিক রচনা। এই ধারাবাহিক কেবল একটি রাজনৈতিক দল বা নির্দিষ্ট সরকারের জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতের যেকোনও সরকারের জন্য একটি নীতি-নির্দেশনামূলক কাঠামো হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এখানে আলোচনা করা হয়েছে— নতুন সরকারের প্রথম একশ দিনের নৈতিক পরীক্ষা, দলীয় আত্মশুদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা সংস্কার, চাঁদাবাজি অর্থনীতি ভাঙা, তৃণমূল পুনর্গঠন, তরুণ রাজনীতির নকশা, প্রশাসনিক জবাবদিহি, বাজার কাঠামো সংস্কার, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন এবং শেষ পর্যন্ত বিজয়কে স্থায়ী আস্থায় রূপান্তরের কৌশল। ইতিহাস বলে, প্রতিটি বিজয়ের ভেতরেই পরাজয়ের বীজ লুকিয়ে থাকে। আবার আত্মসংযম ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে অনেক বিজয় স্থায়ী আস্থায় রূপ নেয়। বিজয় কখনও শেষ কথা নয়— এটি পরীক্ষার শুরু।
প্রথম পর্ব
ক্ষমতার প্রথম পরীক্ষা: প্রথম একশ দিন
সদ্য বিজয়ী একটি সরকারের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— এই বিজয় কি স্থায়ী আস্থায় রূপ নেবে, নাকি আরেকটি হতাশার চক্রে প্রবেশ করবে? জনগণ কেবল সরকার পরিবর্তন চায়নি; তারা রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন প্রত্যাশা করেছে। সেই পরিবর্তনের প্রথম মঞ্চ হলো ক্ষমতার প্রথম একশ দিন।
বিশ্ব রাজনীতিতে ‘প্রথম ১০০ দিন’ একটি প্রতীকী ও কার্যকর মানদণ্ড। ১৯৩৩ সালে মহামন্দার সময় ক্ষমতায় এসে ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট দ্রুত সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেন, যা ইতিহাসে ‘নিউজ ডিল’ নামে পরিচিত। শুরুতেই তিনি দেখিয়েছিলেন— রাষ্ট্র সিদ্ধান্তহীন থাকবে না। দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলা প্রতিশোধ নয়, পুনর্মিলনের রাজনীতি বেছে নিয়ে জাতিকে স্থিতিশীলতার পথে নিয়ে যান। শুরুতেই সঠিক সুর নির্ধারণ ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণ করে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় মানুষ বড় তত্ত্বের চেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন চায়। তারা চায় চাঁদাবাজি বন্ধ হোক, থানায় মামলা নিতে হয়রানি না হোক, বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হোক, ক্যাম্পাস অস্ত্রমুক্ত থাকুক এবং দলীয় পরিচয়ে অপরাধীরা রেহাই না পাক। এই কয়েকটি বাস্তব পরিবর্তনই সরকারের নৈতিক বৈধতা নির্ধারণ করবে।
প্রথম একশ দিনে কিছু দৃশ্যমান সিদ্ধান্ত জরুরি। যেমন- দলীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা; বাসস্ট্যান্ড, বাজার ও টেন্ডারে চাঁদাবাজি বন্ধে অভিযান; অবৈধ দখল উচ্ছেদ; ডিজিটাল লাইসেন্সিং ও ব্যাংক লেনদেন বাধ্যতামূলক করা; থানাভিত্তিক দলীয় তালিকার সংস্কৃতি বন্ধ; রাজনৈতিক ফোনে মামলা নেওয়া বা না নেওয়ার প্রভাব নিষিদ্ধ; ওসি- এসপি পর্যায়ে আচরণবিধি কার্যকর; দলীয় পরিচয়ে অপরাধ করলে দ্রুত শাস্তির নজির প্রতিষ্ঠা এবং একশ দিনের মধ্যেই দৃশ্যমান উদাহরণ সৃষ্টি।
চাঁদাবাজি কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি একটি অঘোষিত অর্থনৈতিক কাঠামো। বাসপ্রতি টাকা, দোকানপ্রতি মাসিক চাঁদা কিংবা নির্মাণকাজে শতাংশ— এসব মিলিয়ে অস্বচ্ছ অর্থপ্রবাহ তৈরি হয়। এই প্রবাহ ভাঙা না গেলে রাজনৈতিক সংস্কার অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। সিঙ্গাপুর সংগঠিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে দ্রুত স্থিতিশীলতা অর্জন করেছে। জর্জিয়া ২০০৪ সালের পর পুলিশ সংস্কারের মাধ্যমে ঘুষের সংস্কৃতি নাটকীয়ভাবে কমাতে সক্ষম হয়। শুরুতেই দৃঢ় অবস্থান কাঠামোগত পরিবর্তনের পথ তৈরি করে।
রাজনীতিতে আত্মসমালোচনা বিরল হলেও অপরিহার্য। অতীতের ভুল স্বীকার না করলে নতুন সূচনা বিশ্বাসযোগ্য হয় না। ঘোষণা স্পষ্ট হওয়া উচিত— ক্ষমতার ছায়ায় কোনও অন্যায় প্রশ্রয় পাবে না। আত্মসমালোচনা দুর্বলতা নয়; এটি শক্তির প্রকাশ।
বিজয় অর্জিত হয়েছে। এখন তাকে রক্ষা করতে হবে। প্রথম একশ দিনই হবে সেই রক্ষা কবচ।
পরবর্তী পর্বে আলোচনা করা হবে— দল ভেতর থেকে সুস্থ না হলে রাষ্ট্রের সংস্কার কেন টেকসই হয় না এবং দলীয় আত্মশুদ্ধি কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা কী হতে পারে।



