নানা সংকটে ধুঁকছে জবির ডে-কেয়ার সেন্টার

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ডে-কেয়ার সেন্টার দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকটে রয়েছে। নিয়োগপত্র অনুযায়ী ১১ জন কর্মচারী থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র তিন জন। এছাড়া বেতন-বোনাসে অনিয়ম, প্রশাসনিক উদাসীনতা এবং শিশুদের নানা সুযোগ-সুবিধার অভাবে ডে-কেয়ার সেন্টারে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
ডে-কেয়ার কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, অতিরিক্ত কাজের চাপ থাকা সত্ত্বেও কর্মীরা নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন না। ঈদ-পূজায় সময়মতো বোনাস দেওয়া হয় না। এমনকি ২০২৪ সালের কুরবানির ঈদেও কর্মীরা কোনও বোনাস পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
ডে-কেয়ার সেন্টার নীতিমালা ২০২৪ অনুযায়ী, পরিচালনায় ১১ জন জনবল থাকার কথা। এর মধ্যে একজন পরিচালক, একজন নারী সুপারভাইজার, একজন অফিস সেক্রেটারি কাম কম্পিউটার অপারেটর, একজন প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষক, একজন সহকারী নার্স, তিনজন আয়া, একজন অফিস সহায়ক, একজন পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও একজন নিরাপত্তা কর্মী থাকবেন। কিন্তু বর্তমানে কর্মরত আছেন নারী সুপারভাইজার ও আয়াসহ মোট তিনজন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ডে-কেয়ার সেন্টারে আগে প্রায় জন শিশু থাকত। তবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর থেকে শিশুদের আসা কমে গেছে। বর্তমানে সেন্টারে ২ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরা রয়েছে। ২ বছরের কম বয়সী শিশু রাখায় নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ার পর থেকেই শিশু সংখ্যা কমতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ডে-কেয়ারের কর্মচারীদের অভিযোগ, একাধিকবার প্রশাসনের কাছে সমস্যা তুলে ধরতে গেলে সরাসরি অভিযোগ গ্রহণ না করে পরিচালনা কমিটির সদস্যদের মাধ্যমে আসতে বলা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, কমিটির সদস্যরা কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন না, তাদের মতামত নেন না এবং কোনও সহযোগিতাও করেন না। ফলে কর্মীদের অভিযোগ মাঝপথেই আটকে যাচ্ছে বলে তারা জানান।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ৩ মে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডে-কেয়ার সেন্টার যাত্রা শুরু করে। উন্নয়নের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) চিঠি দেওয়া হলেও দৃশ্যমান কোনও উন্নয়ন হয়নি। পাশাপাশি ২০২৪ সালের কুরবানির ঈদে বোনাস না পাওয়ায় কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
এদিকে ডে-কেয়ার পরিচালনা কমিটির প্রধান পরিচালক অধ্যাপক ড. হোসনে আরা বেগমের দুই বছরের মেয়াদ শেষ হলেও এখনো নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ দেখা যায়নি। এতে প্রশাসনিক তদারকির অভাব তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর আগে রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক আবদুস সামাদ কমিটির প্রধান থাকাকালে তুলনামূলকভাবে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সবার মতামত নেওয়া হতো বলে জানান কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
ডে-কেয়ারের মহিলা সুপারভাইজার শাকিলা জামান সুবর্ণা বলেন, ২০২৪ সালে অধ্যাপক সাদেকা হালিম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। তবে এখনো তা কাঠামোগত বা স্থায়ী রূপ পায়নি।
এছাড়া ডে-কেয়ারে শিশুদের বাড়ি থেকে পাঠানো খাবার খাওয়ানো হলেও পর্যাপ্ত সুবিধার অভাবে ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট থেকে শিশুদের গোসলের ব্যবস্থা বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে।
ডে-কেয়ার কর্তৃপক্ষ জানান, দীর্ঘদিন অতিরিক্ত কাজ করলেও কর্মচারীরা যথাযথ সম্মান ও স্বীকৃতি পাচ্ছেন না। প্রচারণার অভাবে শিক্ষার্থীরাও সন্তানদের এখানে রাখতে আগ্রহী হচ্ছেন না। ডে-কেয়ারের সার্বিক সংকট নিরসনে দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ, নতুন কমিটি গঠন এবং জনবল নিয়োগসহ কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে ডে-কেয়ারের পরিচালক অধ্যাপক ড. হোসনে আরা বেগম বলেন, ডে-কেয়ারের মূল সংকট অর্থাভাব। প্রশাসন থেকে প্রয়োজনীয় বাজেট না পাওয়ায় জনবল বৃদ্ধি বা অবকাঠামো উন্নয়ন সম্ভব হচ্ছে না। কমিটিতে কোনও সম্মানী না থাকায় অনেকেই দায়িত্ব নিতে আগ্রহ দেখান না। ফলে কার্যক্রম পরিচালনায় সংকট তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও সমাধান হচ্ছে না। তবে পানির ফিল্টার নষ্টের বিষয়টি তিনি জানেন না। পর্যাপ্ত বাজেট পেলে ডে-কেয়ারে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হবে।
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম জানান, বিষয়টি তার নজরে এসেছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। জনবল সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে ডে-কেয়ার সেন্টারে কতজন জনবল নিয়োগ হবে, সে সংক্রান্ত নির্দিষ্ট নীতিমালা বা কাগজপত্র আমার হাতে নেই। খোঁজ নিয়ে জেনে ব্যবস্থা নেবো।
বেতনসহ অন্যান্য সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। শিশুদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সমস্যার বিষয়েও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



