Uncategorized

ব্যাহত জরুরি সেবা, উন্নয়নকাজের ধীরগতিতে ভোগান্তি

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আত্মগোপনে চলে যান খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র ও বেশিরভাগ কাউন্সিলর। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পান মোখতার আহমেদ। কিন্তু অধিকাংশ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর না থাকায় জন্মনিবন্ধন সনদ, মৃত্যু সনদ, সনদ সংশোধন, নাগরিকত্ব সনদ সরবরাহসহ নানা ধরনের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নাগরিকরা। পাশাপাশি মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে রয়েছে স্থবিরতা। দীর্ঘদিন জনপ্রতিনিধি না থাকায় নাগরিক সেবা বিঘ্নিত হচ্ছিল। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে কেসিসির নতুন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি নগরীকে ‘গ্রিন সিটি’ ও ‘ক্লিন সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী, ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয় থেকে জন্মনিবন্ধন সনদ, মৃত্যুসনদ, সনদ সংশোধন, নাগরিকত্ব সনদ, চারিত্রিক সনদ, উত্তরাধিকার (ওয়ারিশ) সনদ, ভূমিহীন সনদ, টিসিবি কার্ড, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভাতার সত্যায়িত সনদসহ বিভিন্ন সনদ দেওয়া হয়। এ ছাড়া ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয় থেকে বিভিন্ন প্রত্যয়নপত্র, অনাপত্তিপত্র (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে), জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার তালিকায় যাচাইকারী হিসেবে স্বাক্ষর দিতে হয় কাউন্সিলরকে। মামলা থাকাসহ নানা কারণে সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলররা আত্মগোপনে। মানুষ নানা ধরনের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এসব সনদ পেতে হলে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের সই প্রয়োজন। নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে মশক ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজের তদারকি এবং টিসিবির পণ্য বিতরণের কাজও পরিচালিত হয় কাউন্সিলরের কার্যালয় থেকে। কিন্তু কাউন্সিলররা আত্মগোপনে থাকায় তাদের কার্যালয়গুলো প্রায় বন্ধ আছে। ফলে ভোগান্তিতে পড়েছেন সেবাগ্রহীতারা।

তিন গুণ বেশি দামে মশা নিধনের ওষুধ কেনার চেষ্টা

নগরের একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত দেড় বছরে মশার উপদ্রব ছিল অন্যতম। দিনে ও রাতে মশার যন্ত্রণায় মানুষ ছিল অতিষ্ঠ। তেল কেনায় নিয়ম না মানা, ভেজাল তেল ব্যবহারসহ নানা কারণে মশা নিয়ন্ত্রণ করা ছিল কঠিন। এ ছাড়া উন্নয়নকাজের ভোগান্তিও ছিল প্রকট। গল্লামারীর সেতু নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় শহরের ব্যস্ততম এই প্রবেশ পথে যানজট লেগেই থাকে। ফলে জনদুর্ভোগ হয় সীমাহীন।

কেসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মশার ওষুধ কেনার পেছনে প্রতি বছর কেসিসির ব্যয় হয় প্রায় ৭৫ লাখ টাকা। ২০২৪ সালের নভেম্বরে মশার ওষুধ কেনা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ওই ওষুধের কার্যকারিতা কম থাকায় নগরীতে মশার উপদ্রব বাড়ে। এ কারণে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মশার ওষুধ কিনতে কড়াকড়ি আরোপ করে কেসিসি। করপোরেশনের বিদায়ী সচিব, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করে যাচাই-বাছাই করে ওষুধ কেনা হয়েছিল।

যানজটে ভোগান্তি নগরবাসীর

সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র ১৪ দিন আগে উন্মুক্ত দরপত্র বাদ দিয়ে বিমান বাহিনী কল্যাণ ট্রাস্ট নামে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে মশার ওষুধ কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল কেসিসি। গত ২৮ জানুয়ারি কেসিসির বিশেষ সভায় প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে প্রতি লিটার ৪৮০ টাকা দামে ২০ হাজার লিটার ‘অ্যাডাল্টিসাইট’ নামে মশার ওষুধ কেনার সিদ্ধান্ত হয়। যা বর্তমান ওষুধের দামের প্রায় তিন গুণ। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত দামে ওষুধ কেনা থেকে সরে এসেছে কেসিসির বিদায়ী প্রশাসক মোখতার আহমেদ। নতুন প্রশাসক নিয়োগ এবং অন্য কর্মকর্তাদের আপত্তিতে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি এই প্রক্রিয়া বাতিল হয়ে যায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত ২৬ জানুয়ারি কেসিসির প্রশাসক মোখতার আহমেদ কর্মকর্তাদের ডেকে জিটুজি পদ্ধতি বা সরাসরি ওষুধ কেনার প্রক্রিয়া শুরু করতে বলেন। একদিনের নোটিশ কেসিসির ১১তম বিশেষ সভার আলোচ্য সূচিতে বিমান বাহিনী কল্যাণ ট্রাস্টের কাছ থেকে ২০ হাজার লিটার ওষুধ কেনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একদিন পর ২৮ জানুয়ারি ওই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ওষুধ কেনার সিদ্ধান্ত হয়। যদিও সেটি পরে বাতিল হয়ে যায়।’

খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, বিমান বাহিনী কল্যাণ ট্রাস্ট সরাসরি মশার ওষুধ তৈরি করে না। তারা অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কিনে সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের দর অস্বাভাবিক। তবে কেসিসির অন্য কর্মকর্তাদের আপত্তিতে এ ধরনের ওষুধ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আগে দর সংগ্রহের সিদ্ধান্ত হয়। নির্ধারিত সময়ে প্রতিষ্ঠানগুলো ৪৫০ থেকে ৫২০ টাকা পর্যন্ত দর দেয়। প্রশাসকের পছন্দের প্রতিষ্ঠানের দর ৪৮০ টাকা। ব্যবহৃত কেসিসির মূল ওষুধ প্রতি লিটারের দাম ১ হাজার ১০০ টাকা। প্রতি লিটার ডিজেলের দাম পড়ে আরও ১০০ টাকা। মূল ওষুধ কিনে ব্যবহারোপযোগী করতে প্রতি লিটারে কেসিসির ব্যয় হয় ১৬২ টাকা। অথচ একই ওষুধ সরাসরি কিনতে খরচ হতো ৪৮০ টাকা, যা বর্তমান মূল্যের তিন গুণ।

কেসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কোহিনুর জাহান বলেন, ‘জিটুজি পদ্ধতিতে ওষুধ কেনার প্রস্তাব বাতিল করা হয়েছে। এখন নতুন প্রশাসকের নির্দেশনায় আগের মতো ওষুধ কিনতে দরপত্র আহ্বান করা হতে পারে।’

রাস্তাঘাট সংস্কার ও জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ

ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা সংস্কার এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার ধীরগতির কারণে নগরবাসী ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বর্ষা মৌসুমের আগেই শহরকে জলাবদ্ধতামুক্ত করতে ড্রেনেজ প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কেডিএ, সড়ক বিভাগের সঙ্গে কেসিসির সমন্বয় না হওয়ার কারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বারগুলোতে জনদুর্ভোগ নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী। প্রথমে খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) পরে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) নিয়ন্ত্রণে থাকা খানজাহান আলী সেতু থেকে রূপসা ট্রাফিক মোড় পর্যন্ত শিপইয়ার্ড, কেসিসি ও কেডিএর নিয়ন্ত্রণে থাকা সোনাডাঙ্গা বাইপাস সড়ক এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের দায়িত্বে গল্লামারী সেতু। সড়কগুলো দিয়ে ১৮ জেলার পরিবহন ও যাত্রী যাতায়াত করে। এই সড়কগুলোর বেহাল দশা থাকলেও কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা ভোগান্তি বাড়িয়েছে নগরবাসীর।

খুলনা মহানগরীর অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার গল্লামারী ব্রিজের নির্মাণ কাজের দীর্ঘসূত্রতার ফলে জনভোগান্তি হচ্ছে। গল্লামারী ময়ূর নদের ওপর পূর্ব থেকেই একটি ব্রিজ থাকলেও জনসংখ্যা ও যানবাহন বৃদ্ধির ফলে সড়ক বিভাগ ২০১৬ সালে ৭ কোটি টাকা ব্যয় একটি ব্রিজ নির্মাণ করে। অপরিকল্পিত ব্রিজ নির্মাণের সময় ময়ূর নদ রক্ষা ও নৌযান চলাচল বিবেচনায় না থাকায় তা ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। ২০২৩ সালের ১২ অক্টোবর নতুন ব্রিজ উদ্বোধন করা হয়। আগের পুরোনো ব্রিজটি ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর ভাঙার কাজ শুরু করে। নতুন ব্রিজ নির্মাণ কাজ শুরুর পর ৩ দফায় সময় বর্ধিত করলে ও ব্রিজের নির্মাণ কাজ মাত্র ২০/২১ শতাংশ সম্পন্ন হয়। কর্তৃপক্ষ দফায় দফায় কাজ শুরুর প্রতিশ্রুতি দিলেও তা আটকে আছে কাগজে কলমে। সম্পূর্ণ স্টিল স্ট্রাকচারের তৈরি এ জাতীয় ব্রিজ দেশে এই প্রথম। খুবই দৃষ্টিনন্দন একটা ব্রিজ হবে। শুরুতে ব্রিজের ডিজাইনসহ বেশ কিছু জটিলতা ছিল। পরবর্তীতে দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। সব মিলিয়ে সময় ক্ষেপণ হয়েছে। সবকিছু ওভারকাম করে এখন একটা টাইম সিডিউলের মধ্যে চলে এসেছি। আশা করি খুব দ্রুতই ব্রিজের কাজটা সম্পন্ন হবে।

রাস্তাঘাট সংস্কার ও জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ

সোনাডাঙ্গা বাইপাসে ভোগান্তি

সোনাডাঙ্গা থানার সামনে থেকে জয়বাংলা মোড় পর্যন্ত সড়কটি খুলনা সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল দফতরের অধীনে রয়েছে। এর মধ্যে ময়ূরী সেতুর পূর্বপাশের মালিক কেসিসি। পশ্চিম অংশের দেখভালের দায়িত্ব এলজিইডির। সোনাডাঙ্গা মডেল থানার পাশ থেকে ময়ুর ব্রিজ পর্যন্ত ৭৮০ মিটার সড়কটি রাস্তা প্রশস্তকরণে জমি জটিলতায় আটকে আছে। এ নিয়ে ভোগান্তি পোহাতে হয় স্থানীয়দের।

কেসিসি সূত্রে জানা যায়, সোনাডাঙ্গা মডেল থানার পাশ থেকে ময়ুর ব্রিজ পর্যন্ত ৭৮০ মিটার সড়কটি জার্মান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অর্থায়নে ২১ কোটি টাকা ব্যয়ে চার লেনে উন্নীত করার জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। কিন্তু প্রস্তাবিত ৬০ ফিট চওড়া রাস্তাটি কিছু কিছু জায়গায় আছে ৩০-৩৫ ফিট। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে কেডিএ দুই দফায় অভিযান চালিয়েছে। জমি বুঝে পেলে কাজ শুরু করবে কেসিসি। 

অন্যদিকে ময়ুর ব্রিজের পর থেকে জয় বাংলার মোড় পর্যন্ত এলজিইডি অংশের রাস্তায় সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত। রাস্তার পাথর উঠে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ধুলার কারণে একপ্রকার চলাচল অযোগ্য হয়ে পড়েছে। সড়কটিতে পরিবহন চলাচল নেমে এসেছে অর্ধেকে। বরাদ্দ না পাওয়ায় আটকে আছে সংস্কারকাজ।

এ ব্যাপারে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী (প্রকল্প) মারতোজা আল মামুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কেডিএ ও কেসিসির সমন্বয়ে অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করে সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। টার্মিনালের কিছু দোকান আমরা নিজেরা উচ্ছেদ করেছি। সড়কের কাজ শুরুর বিষয়টি কেসিসির ওপর নির্ভর করছে।’

শিপইয়ার্ড সড়ক গলার কাঁটা

শিপইয়ার্ড সড়ক নগরবাসীর গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। এক যুগের বেশি সময় পরও নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। কাজ শেষ না করে ঠিকাদার বিল তুলে লাপাত্তা। সড়কটির এমন বেহাল দশার প্রতিবাদে সামাজিক সংগঠনগুলো নানা কর্মসূচি পালন করছে। জমে থাকা পানিকাদায় ধান রোপণ করে প্রতিবাদ জানিয়েছে তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ২০২২ সালের ২২ জানুয়ারি। যৌথভাবে কাজটি পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আতাউর রহমান লিমিটেড ও মাহাবুব ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেড। প্রকল্পের আওতায় সড়ক সংস্কার, লবণচরা সেতু ও মতিয়াখালী সুইসগেট নির্মাণ করা হবে। তবে সাড়ে তিন বছরেরও অধিক সময়ে কাজ বাস্তবায়ন হয়েছে ৭০ শতাংশ। এরই মধ্যে বিল উত্তোলন করে লাপত্তা সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সড়ক সংস্কারকাজ দীর্ঘদিন ধরে ফেলে রাখায় ৭ আগস্ট চুক্তিও বাতিল হয়েছে। আবার কবে কাজ শুরু হবে তা নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সড়কটির কারণে প্রায় এক যুগ ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন পথচারী ও এলাকাবাসী। এটি ২০১৩ সাল পর্যন্ত খুলনা সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ২০১৩ সালের ৭ মে সড়কটি চার লেনে উন্নীতকরণের জন্য একনেকে প্রকল্প অনুমোদন করায় কেডিএর অধীনে চলে যায়। প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় ৯৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। নানা জটিলতায় নির্ধারিত সময়ের নয় বছর পর কাজ শুরু করে কেডিএ।

ভোগান্তির কথা জানিয়ে খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি আশরাফ-উজ-জামান বলেন, ‘মহানগরীর প্রবেশদ্বারগুলোর এমন দুরবস্থার মূল কারণ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়হীনতা। শিপইয়ার্ড সড়কটিতে শুরু থেকেই কাজ করা হয়েছে অত্যন্ত ধীরগতিতে। বর্তমানে আগের ঠিকাদার বাদ দিয়ে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আগের ঠিকাদার কোর্টে মামলা করেছেন। এর সমাধান না হলে কাজ আরও পিছিয়ে পড়বে। পরিকল্পিতভাবে কাজ করে দ্রুত নাগরিক দুর্ভোগ লাঘবের দাবি জানাই।’

অবৈধ যানবাহনের দৌরাত্ম্য

অবৈধ যানবাহনের দৌরাত্ম্যে নাকাল নগরবাসী। তিন চাকার যানবহনের কারণে প্রতিদিনই নগরীর প্রধান সড়কগুলোতে দেখা দেয় ভয়াবহ যানজট। এ অবস্থায় কেসিসি ও কেএমপি যৌথভাবে অভিযানে নেমেছিল গত বছর। অভিযানকালে অনিবন্ধিত ও বহিরাগত ৩২টি ইজিবাইক আটক করা হয়। পরে যাচাই-বাছাই শেষে ৫০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে জরিমানা করে কিছু ইজিবাইক ছেড়ে দেওয়া হয়।

২০১০ সালের শেষের দিকে নগরীতে চালু হয় ইজিবাইক। পরিবেশবান্ধব আর শব্দহীনতার কারণে স্বল্প সময়ের মধ্যে অল্প খরচে অধিক দূরত্বে পৌঁছানোর জন্য বাহনটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে নগরীতে ক্রমশই বাড়ছে বাহনটির সংখ্যা। বাহনটি চালনার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক রুট পারমিট, ট্যাক্স কোটেন, ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যাধতামূলক না হওয়ায় ভ্যান-রিকশাচালক, শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ টাকা ধার, সুদে বা অন্য কোনও পন্থায় শহরের যেকোনও শোরুম থেকে বাহনটি ক্রয় করেই নেমে পড়ে রাস্তায়। লাগে না বিআরটিসি কোনও প্রশিক্ষণ। তাই দক্ষ না হলেও অদক্ষতায় থেমে থাকেনি নগরজুড়ে ইজিবাইক দৌরাত্ম্য। অপরিমিত ইজিবাইকের কারণে ট্রাফিক ব্যবস্থা রীতিমতো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। পরিবেশবান্ধব ইজিবাইক নগর জীবনে বিড়ম্বনার বাহন হিসেবে পরিণত হয়। পাশাপাশি অহরহ দুর্ঘটনা তো ঘটছেই।

কেসিসির তথ্যমতে, নগরীতে চলাচলের জন্য কেসিসির পক্ষ থেকে ৭ হাজার ৮৯৬ জনকে ইজিবাইকের লাইসেন্স দেওয়া হয়। বর্তমানে নবায়ন যোগ্য লাইসেন্স সংখ্যা ৭ হাজার ৬৮২টি। দুই হাজার টাকার বিনিময়ে লাইসেন্স নবায়ন করা হয়। তবে প্রদত্ত লাইসেন্স ছাড়াও নগরীতে অবৈধ ইজিবাইকের সংখ্যা দ্বিগুণ।

এ বিষয়ে কেসিসির সিনিয়র লাইসেন্স অফিসার মনিরুজ্জামান রহিম বলেন, ‘অনিবন্ধিত ও অবৈধ ইজিবাইক নিয়ে নগরবাসীর অভিযোগ আমরা অনেক দিন ধরেই পাচ্ছিলাম। তাই কেএমপির সহযোগিতায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। নগরীর স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান অব্যাহত আছে।’

অবৈধ যানবাহনের দৌরাত্ম্যে নাকাল নগরবাসী

ভোগান্তির আরেক কারণ যানজট

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজনের) খুলনা শাখার সাধারণ সম্পাদক কুদরত-ই খুদা বলেন, ‘খুলনাবাসীর চরম ভোগান্তির কারণ যানজট। এর অন্যতম কারণ অনুমোদনহীন যানবহনের অবাধ চলাচল। যার মধ্যে ইজিবাইক অন্যতম। কেসিসির অনুমোদন অনুসারে যে সংখ্যক ইজিবাইক সড়কে চলাচল করার কথা, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অনুমোদনহীন রাস্তায় চলছে। ফলে সড়কের মোড়ে মোড়ে যানজটে ভোগান্তি পোহাতে হয়।’

সমাজসেবক কামাল উদ্দিন বাচ্চু বলেন, ‘সম্প্রতি নগরীতে ইজিবাইকের চলাচল বেড়েছে কয়েকগুণ। নগরী এখন ইজিবাইকের দখলে। বিশেষ গল্লামারী, নিরালা, বয়রা, ডাকবাংলা, রুপসা দিয়ে চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। অনুমোদনহীন এসব ইজিবাইকের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।’

যানজট নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ

কেএমপির ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যানজট নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ। অন্যান্য যানবহনের মতো ইজিবাইকের ইঞ্জিন নম্বর বা চেসিস নম্বর নেই। নেই ডিজিটালাইজেশনও। কেসিসি ইজিবাইকের যে একটি লাইসেন্স দিয়েছে, সেটি দিয়ে একাধিক ইজিবাইক চলছে। ইজিবাইকের এই লাইসেন্সটি বৈধ কিনা, তা আইডেন্টিফাই করতে পারি না আমরা। এ ব্যাপারে কেসিসি আমাদের সঙ্গে লাইসেন্স সংক্রান্ত বিষয়ে যদি কাজ করে তবে ইজিবাইক আটক বা চলাচলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হবে। যানজট নিরসনে বহিরাগত ইজিবাইকের শহরে ঢোকার সব প্রবেশপথে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। এসবের মধ্যে যানজট নিরসনে কাজ করে যাচ্ছে ট্রাফিক বিভাগ।’

যা বলছেন কেসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা

কেসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাজিব আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‌‘মশার তেল কেনার বিষয়ে দাম নিয়ে সমস্যা চিহ্নিত হওয়ায় আগের প্রক্রিয়া বন্ধ করা হয়েছে। এখন নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করা হবে। ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কেসিসি অন্য সংস্থাগুলোর সহযোগিতা পাচ্ছে না। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কেসিসি সব সময় জনদুর্ভোগ নিয়ে সর্তকতা বজায় রাখে।’




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button