রমজানই জীবনকে বদলানোর শ্রেষ্ঠ সময়

পবিত্র রমজানুল মোবারক শুধুমাত্র রোজা ও তারাবির নাম নয়; বরং এটি আকিদা, ইবাদত, লেনদেন, জীবিকা এবং সামগ্রিক জীবনধারা সংশোধনের মাস। এই বরকতময় মাস থেকে পরিপূর্ণভাবে উপকৃত হওয়ার জন্য আমাদের আমলগত প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত, যাতে রমজানের বরকতময় দিনগুলো ও এর অমূল্য মুহূর্তগুলো আমাদের জীবনে প্রকৃত পরিবর্তনের বার্তাবাহক হয়ে ওঠে।
রমজানে আমাদের পবিত্র কোরআনের আসরে (তিলাওয়াত-অর্থ শেখা-তাফসির) অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আল্লাহর কালামের সঙ্গে সম্পর্ক শুধু তিলাওয়াতেই সীমাবদ্ধ না থেকে; বরং তা বোঝার, তাদাব্বুরের (গভীরভাবে চিন্তা) এবং আমলের পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
এভাবে নিয়মিতভাবে দোয়ার একটি রুটিনও প্রস্তুত করতে হবে আমাদের, যেখানে নিজের জন্য, নিজের সন্তানের জন্য, উম্মতে মুসলিমাহর জন্য, দেশ ও জাতির জন্য এবং সমগ্র মানবতার কল্যাণের দোয়াগুলো লিখে রাখা হবে, যেগুলো গোটা রমজানজুড়ে প্রার্থনা করা হবে।
বর্তমান যুগ ফিতনার যুগ। অশুভ শক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবুও এই পরিস্থিতি এ কথার ইঙ্গিতও দেয় যে, ইসলামের পুনর্জাগরণ নিকটবর্তী। এজন্য নিজের, নিজের সন্তানের এবং সংশ্লিষ্টদের চিন্তাগত, ঈমানি ও নৈতিক দিক থেকে প্রস্তুত করার সময় এখনই। ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য মাসনূন দোয়া (কোরআন-হাদিসে বর্ণিত দোয়া), নববী পদ্ধতি ও দ্বীনী দিকনির্দেশনা গ্রহণ করে সেগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে।
রমজানে জীবনের প্রতিটি দিক পর্যালোচনা করা, আত্মসমালোচনা (মুহাসাবা) করা এবং গভীরভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন। সর্বদা অজু অবস্থায় থাকার চেষ্টা করবো এবং নিজেকে নিয়মিত জিকির-আজকারের অভ্যাসে আবদ্ধ করবো।
আর বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতা অন্তরের পবিত্রতার পথ সুগম করে। মানবসেবা ও সামাজিক দায়িত্ববোধকে জীবনের অংশ করে নিতে হবে- সদকা, দান-খয়রাত ও পারস্পরিক সহযোগিতাকে নিয়মে পরিণত করব। গরিব, অসহায় ও প্রয়োজনগ্রস্ত মানুষের কথা ভাবতে হবে আমাদের। আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা চেয়ে নেবো এবং যা কিছু ত্রুটি হয়েছে তা সংশোধনের চেষ্টা করবো।
ঘরের ভেতরে একটি নির্দিষ্ট ও প্রশান্ত স্থান নির্ধারণ করা যেতে পারে, যেখানে রমজানে সহজে তিলাওয়াত, নামাজ ও জিকির করা যায়, যাতে ঘরের পরিবেশও ইবাদতে সহায়ক হয়ে ওঠে। ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিভিশনের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার থেকে বিরত থাকব এবং সময়কে মূল্যবান মনে করব। হক্কুল ইবাদ (মানুষের অধিকার) রক্ষা করব, কর্মচারী ও গৃহকর্মীদের কাজের চাপ হালকা করব, এবং অযথা সাক্ষাৎ ও আড্ডা এড়িয়ে চলব।
আত্মিক দৃঢ়তার জন্য জামাতে নামাজ আদায়, তাকবিরে উলা (নামাজের প্রথম তাকবির) পাওয়ার চেষ্টা, কম ঘুম, কাইলুলাহ (দুপুরের স্বল্প বিশ্রাম), ছোট সুরাগুলো মুখস্থ করা এবং শিশুদের দ্বীনী শিক্ষার ব্যবস্থা করার উত্তম সময় এই রমজান।
স্বাস্থ্য ও আত্মসংযমের জন্য ক্ষতিকর অভ্যাসগুলো ত্যাগ করা বা কমানোর আন্তরিক চেষ্টা এবং সহজ ও পরিমিত খাদ্যাভ্যাস গ্রহণ করতে হবে। নিজেকে বারবার স্মরণ করিয়ে দিতে হবে যে, রমজানকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাটাতে হবে, যাতে আমার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষ এবং আমার নিজের চেতনা এই শিক্ষাকে গভীরভাবে ধারণ করে নেয়।
তাই আমরা এখনই সংকল্প করি যে, এই রমজানই হোক আমাদের জীবন পরিবর্তনের উপলক্ষ। এজন্য স্পষ্ট ও ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করি, যা এই রমজানকে পূর্বের রমজানগুলো থেকে আলাদা ও বিশেষ করে তুলবে এবং যা আমার আমলনামায় স্থায়ী নেকি হিসেবে যুক্ত হবে। জাকাত, ঋণ এবং অন্যান্য আর্থিক অধিকারের যথাসময়ে পরিশোধের ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিই। সর্বোপরি এসব প্রচেষ্টার পাশাপাশি আল্লাহ তায়ালার কাছে ইখলাস (নিষ্কলুষতা), পবিত্রতা, কবুলিয়্যাত (আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্যতা) এবং অবিচলতার জন্য দোয়া করব। কারণ, তিনিই আমাদের একমাত্র সহায়।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও মাদ্রাসাশিক্ষক



