Uncategorized

একমেরু রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্য সংকট

স্নায়ুযুদ্ধোত্তর বিশ্ব রাজনীতির একমেরু পরিস্থিতির কারণেই বিশ্বশান্তি আজ খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে আলোচনার আহ্বান সত্ত্বেও, ইরানে আক্রমণ এবং আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে আগ্রাসী রাষ্ট্র ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের বর্বর ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের আরও এক নতুন নজির স্থাপন করলো। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রশক্তি এই একক আধিপত্য বজায় রাখতে গিয়ে তথাকথিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় যে অগণতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ করেছে, তার ফলেই মধ্যপ্রাচ্য আজ এক অগ্নিগর্ভে পরিণত হয়েছে। ইরানের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কের যে টানাপোড়েন, তা মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ স্বার্থেরই মহড়া। অনেকেই মধ্যপ্রাচ্যের আজকের এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিকে ধর্মীয় সমীকরণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে চান; কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এ ধরনের মূল্যায়নের যৌক্তিক ভিত্তি বেশ দুর্বল। বরং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শাসনকাঠামোয় বিদ্যমান সাংঘর্ষিক অনৈক্যই বহিঃশক্তিকে (বা বহিঃরাষ্ট্রকে) অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করে দেয়।

১৯৫৮ সালের লেবানন সংকটের সময় প্রথমবারের মতো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল। কিন্তু সংকট উত্তরণের পরও যুক্তরাষ্ট্র সেখানে স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে। আর এভাবেই এই অঞ্চলে মার্কিন আধিপত্য বিস্তারের প্রাথমিক সূত্রপাত হয়। তখন খোদ জাতিসংঘ এবং তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (ইউএসএসআর) নিশ্চুপ ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব ঘাঁটির সংখ্যা বাড়তে থাকে, যা আজকের মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার জন্য দায়ী।

বর্তমানে বাহরাইন, মিসর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের ১২টি দেশে স্থায়ী-অস্থায়ী মিলিয়ে মোট ১৯টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এসব ঘাঁটি স্থাপনের প্রকাশ্য (পাবলিক) প্রচারণা হলো ইসরায়েলের নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কিন্তু এর অপ্রকাশ্য (হিডেন) উদ্দেশ্য হলো— মধ্যপ্রাচ্যের তেল উত্তোলন ও এর বাজার নিয়ন্ত্রণ করা। হরমোজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুট এবং ইরানের তেল সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাই পর্দার আড়ালে আসল লক্ষ্য। সংক্ষেপে এই আক্রমণের পেছনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণই মূলত প্রধান। পরাশক্তিগুলো অর্থনৈতিক স্বার্থকে সামনে না এনে সামনে আনে তথাকথিত একনায়কতন্ত্র-বিরোধী বক্তব্য, আর এভাবেই যুক্তরাষ্ট্র তার অর্থনৈতিক মজুদ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এক নব্য উপনিবেশবাদ অব্যাহত রাখছে।

বিষয়টি এমন নয়, যেসব রাষ্ট্রে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেখানে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ধারা যথেষ্ট সুসংহত। বরং শাসন ব্যবস্থার পাশাপাশি ধর্মীয় ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও এই রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের অন্যান্য রাজনৈতিক মিত্রশক্তির (যেমন- ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ন্যাটো) সখ্যতার কোনও ঘাটতি দেখা যায় না।

তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, এমনটা কেন হয়েছে? এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো— কোনও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি যদি ভঙ্গুর ও দ্বিধাগ্রস্ত থাকে, তবে সেই ফাটলের সুযোগ নেয় শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র কিংবা সুযোগসন্ধানী প্রতিদ্বন্দি শক্তিগুলো। ইরাক, তিউনিশিয়া, সিরিয়া কিংবা লিবিয়ার দিকে তাকালে দেখা যায়, এসব দেশের জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রক্ষমতার যে পরিবর্তনশীল সম্পর্ক, সেটিকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।

এটি গেল একটি দিক। অন্যভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ভঙ্গুরতা বা দ্বিধাগ্রস্ততা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কোনও সমস্যাই নয়— এটি তখনই সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়, যখন দেখা যায় কোনও একদলীয় কিংবা মতাদর্শকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা (যেমন: রাজতন্ত্র) যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সখ্যতা না রেখে পরিচালিত হচ্ছে। যদি তাদের মধ্যে সখ্যতা থাকে, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতি কখনোই নাখোশ হয় না।

তাহলে সম্পর্কের মূল ভিত্তিটা কোথায়? সম্পর্কটা মূলত তৈরি হয় রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কৌশলের ওপর। কোনও রাষ্ট্র যদি অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু রেখে তার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে নিজেদের স্বার্থের যোগসাজশ বজায় রাখে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের আর কোনো বৈরিতা থাকে না। সৌদি আরব কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে তাকালে এই চিত্রই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এক্ষেত্রে ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ন্যাক্কারজনক ঘটনাও আলোচনার সুযোগ তৈরি করে, যেখানে কোনও ধর্মীয় বিরোধ নেই, অথচ শুধু নিজেদের স্বাধীন শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারণে তারা যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রাকৃতিক সম্পদ। বাস্তবে দেখা যায়, কোনও রাষ্ট্রের যদি বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ থাকে, মূলত তখনই এই একক বৃহৎ শক্তি সেখানে হস্তক্ষেপের সুযোগ খোঁজে।

ইরানের ক্ষেত্রে আমরা দেখি, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে কেবল আয়াতুল্লাহ খোমেনি এককভাবে শাহ পাহলভিকে ক্ষমতাচ্যুত ও দেশান্তর করেননি। যেকোনও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সময় সফল হওয়া শক্তিগুলোর কোন একটির মধ্যে যদি ‘একক ক্রেডিট’ নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয় এবং একমুখী শাসনতন্ত্র বজায় রাখতে চেষ্টা করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্ররা এই এক মেরু নির্ভর পৃথিবীর সুযোগ নেয়। স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় কেন্দ্রিক সেই রাষ্ট্রের ওপর আধিপত্য বিস্তার নিশ্চিত করে। ইরানে যদি নিয়মিত গণতান্ত্রিক ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া থাকতো, তবে আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হতে পারতো। তখন হয়তো নানামুখি বিশ্বশক্তিগুলোও ইরানের জাতিগত ঐক্যের জায়গাকে সম্মান দেখানোর তাগিদ থেকে তাদের সহযোগিতা করার কথা ভাবতো।

এখন স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন উঠতে পারে— উত্তর কোরিয়া কিংবা রাশিয়ার মতো দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র বা তাদের মিত্ররা কেন এমন সরাসরি হামলা চালাতে পারছে না? আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় এর সবচেয়ে বড় উত্তরটি লুকিয়ে আছে ‘নিউক্লিয়ার ডিটারেন্স মডেল’ বা পারমাণবিক প্রতিরোধ তত্ত্বের মধ্যে। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো— ‘মিউচুয়ালি অ্যাসিউর্ড ডেস্ট্রাকশন’ বা নিশ্চিত ধ্বংসের ভয়। যখন কোনও দেশের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকে, তখন বিপক্ষ শক্তি সেখানে হামলা করতে সাহস পায় না। কারণ তারা জানে, আক্রমণ করলে পাল্টা পারমাণবিক হামলা ধেয়ে আসবে, যা আক্রমণকারীকেও পুরোপুরি ধ্বংস করে দেবে। এই ডিটারেন্স মডেলের কারণেই মূলত সেখানে সামান্যতম হলেও ‘ব্যালেন্স অব পাওয়ার’ বা শক্তির ভারসাম্য এবং শক্তিশালী সামরিক জোট বা অ্যালায়েন্সের উপস্থিতি টিকে আছে। পারমাণবিক অস্ত্র থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক সমরশক্তির কারণে তাদের অবস্থানে একরকম অলিখিত ভারসাম্য বজায় থাকে। দ্বিতীয়ত, ভূ-রাজনীতির আরেকটি নিষ্ঠুর সত্য হলো অর্থনৈতিক স্বার্থ। মধ্যপ্রাচ্যের মতো এই দেশগুলোতে এমন কোনো সহজলভ্য প্রাকৃতিক সম্পদ নেই, যা দখল করলে যুক্তরাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক ও বিশাল কোনও অর্থনৈতিক মুনাফা নিশ্চিত হবে। তাই নিজেদের নিশ্চিত ধ্বংসের ঝুঁকি নিয়ে সেখানে যুদ্ধে জড়ানোটা তাদের কাছে কখনোই লাভজনক সমীকরণ নয়।

বিশ্ব এখন এক বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড়িয়ে। জ্বালানি রাজনীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের এই লড়াইয়ে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি বলি হচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য পারমাণবিক ও অর্থনৈতিক শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে চীন ও রাশিয়ার তেল সংগ্রহের ক্ষেত্রে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক ও নির্ভরশীলতা রয়েছে। এমনকি কাস্পিয়ান সাগরকে কেন্দ্র করে যদি ইরানে আমেরিকার নতুন সামরিক ঘাঁটি নিশ্চিত হয়, তবে বলা যায়— যুক্তরাষ্ট্র একেবারে রাশিয়ার নাকের ডগায় নিজের অবস্থান নিশ্চিত করবে। 

এই পরিস্থিতিতে আপাতত মনে হচ্ছে যে, এই যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বিশ্ব অর্থনৈতিক বাজারেও চরম অস্থিরতা দেখা দেবে। এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের সাময়িক লক্ষ্য অর্জনে অনেকটা সফল হলেও, বস্তুত বিশ্বশান্তি ক্রমশ ক্ষীণ করে দিচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো— যুক্তরাষ্ট্রের যে একক পরাশক্তির চর্চা দীর্ঘসময় ধরে চলছিল, অনেকেই ভাবছিলেন হয়তো ‘ব্যালেন্স অব পাওয়ার’-এর মাধ্যমে তার সমাপ্তি ঘটবে এবং বিশ্বের অন্যান্য ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক আক্রমণ থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সম্ভাবনাটুকুও শেষ হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ, আরও এক দীর্ঘ সময়ের জন্য এই একমেরু বিশ্বব্যবস্থা জারি থাকবে বলে মনে হচ্ছে, যা বিশ্বশান্তির জন্য একটি চরম অশনিসংকেত।

লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যাল




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button