Uncategorized

আমাদের পাবলিশিং ইকোসিস্টেম এখনো ভঙ্গুর : নকিব মুকশি

উমামা জামান মিম: মেলায় আপনার নতুন কী বই প্রকাশিত হচ্ছে?

নকিব মুকশি: এবার মেলায় আমার দুটো বই আসছে। একটি কবিতার, নাম ‘ঝিনুকধানী’; অন্যটি অনুবাদের, নাম ‘নোবেলজয়ী লাসলো ক্রাসনাহোরকাই : নির্বাচিত সাক্ষাৎকার সংগ্রহ’।

প্রশ্ন: কবিতার বইটি নিয়ে পাঠকদের কিছু বলুন। বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা কি এ বইয়ের বিষয়বস্তুকে প্রভাবিত করেছে?

উত্তর: বরাবরের মতোই আমার এবারের কবিতাবইটিও ব্যতিক্রম চরিত্র নিয়ে হাজির হয়েছে। এ ধরনের কবিতার নাম দিয়েছি ‘অ্যাফোরিস্টিক কবিতা’, বাংলায় যাকে বলি ‘ঝিনুককবিতা’। নিরীক্ষাধর্মী বই। এর কবিতাগুলো বেশ ছোট, দুই-চার-পাঁচ পঙ্‌ক্তির মধ্যে। এতে ঝিনুকের মতো নান্দনিক কারুকাজের পাশাপাশি থাকতে পারে মুক্তার আবাসও। বইটি ৬ ফর্মার। এতে সম্ভবত ৩৫০টিরও বেশি কবিতা রয়েছে। বইটির ফ্ল্যাপ লিখেছেন প্রথম দশকের স্বতন্ত্র স্বরের কবি ‘ফেরদৌস মাহমুদ’।

জীবন ও জগৎ নিয়ে আমার দর্শন, ভাবনা ও নান্দনিক চেতনার এক সমাবেশ এ বই। না, এ বই বর্তমান কেন্দ্রিক নয়, স্থান-কালকেন্দ্রিক নয়, বৃহৎ পরিসরে দেখার ফলে বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা নির্দিষ্টভাবে ফুটে ওঠেনি, বরং চিরকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিছাপ রয়েছে, কাউন্টার ন্যারেটিভ রয়েছে, সাবটেক্সচুয়াল পলিটিকস রয়েছে। তবে এ তো অবশ্যই নিজের পাঠ ও বর্তমান দুনিয়ার নানা মাত্রিক ইকোসিস্টেম দেখার প্রভাবিত ফল।

প্রশ্ন: অনুবাদ বই সম্পর্কে কী বলবেন? লাসলোও তো নিরীক্ষাধর্মী একজন লেখক ছিলেন…

উত্তর: একজন লেখকের সারদর্শন, জাইটগাইস্ট চেতনা, তার লিখনস্বরূপ এসব দারুণভাবে উঠে আসে তার সাক্ষাৎকারে৷ তার সামগ্রিক সাহিত্যস্মৃতি, জীবনবিরুতের বেড়ে ওঠা, অস্তিত্ব সংকট ইত্যাদি তার জীবনে কীভাবে প্রভাব ফেলে সেসব অনেকটা পরিষ্কার হয় তার সাক্ষাৎকারে। প্রকাশকের অনুরোধে তাই আমিও ‘দ্য মাস্টার অব অ্যাপোকেলিপস’ খ্যাত ইউরোপীয় সাহিত্যিক লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের সাক্ষাৎকার অনুবাদ করি, এর বাইরে তার নিরীক্ষাধর্মী ও সাহসী কাজও আমাকে তার গভীরে ডুবতে অনুপ্রাণিত করেছে৷ পাঠক এই বইয়ের মাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ের বিশ্বসাহিত্য ও সাহিত্যচিন্তার এক অনাবিষ্কৃত জগতের স্বাদ পাবে বলে মনে করি৷ তিনি কীভাবে তার বিরলতম লিখনশৈলী আবিষ্কার করলেন, ঢেউয়ের মতো দোলা দিয়ে দিয়ে এগিয়ে যায় অনন্ত পরিসরের দিকে, কীভাবে লাসলো একাই ইউরোপীয় এক সাহিত্য-ঐতিহ্য গড়ে তুলেছেন—এসব কথার প্রবাহে অবগাহন করতে করতে টের পাবেন৷ আর তাকেই-বা কেন নোবেল কমিটি সাহিত্য দিল, তার সাহিত্যজগৎ কতটা অন্ধকারাচ্ছন্ন, তার অনালোকিত ব্যক্তিগত জীবন, বিবাহ, বিচ্ছেদ, চীনবিদ স্ত্রী ও সন্তানদের জীবন ইত্যাদিও পাঠকের ক্ষুধা মেটাবে। আর আমি চেষ্টা করেছি, যাতে পাঠক পড়ার সময় ফিল করেন যে বইটির কথোপকথন ভাষান্তর নয়, যেন এর মূলটাই বাংলা, সহজেই অনুধাবন করতে পারেন৷

প্রশ্ন: শুরু থেকেই মেলা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছিল, এমন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইভেন্টের প্রতি কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা আছে?

উত্তর: এ দেশের সব কাজে দেখা যায়, অনিশ্চয়তাই যেন নিশ্চয়তা। পলিটিক্যাল পলিউশন যেন এ দেশের সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে, কলুষিত করে, বইমেলার এই দ্বিধান্বিত বিষয়টিও যেন তেমনই৷ ব্যক্তি ও ক্ষমতাতোষণ, ব্যুরোক্রেসির গাফিলতি, ব্যক্তিস্বার্থ ইত্যাদি কারণে আমাদের পাবলিশিং ইকোসিস্টেম এখনো ভঙ্গুর। অথচ বইমেলা আমাদের কালচারাল ইনফ্রাস্ট্রাকশনেরই অংশ। সমন্বিত ও পাঠক-লেখকবান্ধব বইমেলা উপহার দেওয়ার কথা ছিল বাংলা একাডেমির, কিন্তু সেটা আমরা বিগত দিনগুলোতে দেখতে পাইনি৷ সারা দেশে এই মেলাটা সেইভাবে করা সম্ভব হয়নি, কিংবা পাঠকের দোরগোড়ায় বইগুলো পৌঁছানোর কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি৷

সুতরাং আমি এটাকে অবহেলা ও কাঠামোগত দুর্বলতার মিশ্রণ বলব। বইমেলা কেবল সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়, এটি একটি জাতীয় জ্ঞান-ইভেন্ট। সেই গুরুত্বের প্রতিফলন পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্তে সব সময় দেখা যায় না। আর একটা স্ট্যান্ডার্ড বইমেলা করতে সুচিন্তিত পরিকল্পনার পাশাপাশি তো কোয়ালিটি কন্ট্রোল মেকানিজমও থাকা চাই, যাতে আগাছা বইয়ের স্তূপে বইমেলা গার্বেজে পরিণত না হয়।

প্রশ্ন: সময় কমিয়ে আনা ও রমজানের কারণে মেলায় কেমন প্রভাব পড়বে?

উত্তর: শোনেন, এ দেশের মানুষ ধর্মীয় চর্চার মধ্য দিয়ে তার সামাজিক ও পারিবারিক সহাবস্থান সুদৃঢ় করতে চায়৷ ফলে রমজানকে এ দেশের মানুষ এমন এক আধ্যাত্মিক ও আত্মশুদ্ধির ইভেন্ট হিসেবে দেখে, যা অন্যান্য কাজকে ঐচ্ছিক করে তোলে। এ অবস্থায় আমার মতে, সময় কমানো ও রমজান—দুটোই মেলায় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গতি কমাবে। পাঠকসমাগমের ধরন বদলাবে, সন্ধ্যাকেন্দ্রিকতা বাড়বে, বিক্রি ও আলোচনার সময় সংকুচিত হবে। বিশেষ করে ছোট প্রকাশকেরা এতে বেশি চাপে পড়বেন।

প্রশ্ন: গত বছর মেলা নিয়ে প্রকাশকদের হতাশা দেখেছি, অনেকের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল—এ বছর এমন কিছু আশঙ্কা আছে?

উত্তর: আশঙ্কা তো আছেই৷ নানামাত্রিক আশঙ্কাই আছে৷ দেখুন, এ দেশে তিন ধরনের ফ্যাসিবাদ লক্ষণীয়—পলিটিক্যাল ফ্যাসিবাদ, কালচারাল ফ্যাসিবাদ ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ। এদের একটা প্রচ্ছন্ন হলে অন্যটা বা অন্যগুলো প্রকট হয়ে ওঠে; কখনো কখনো সবগুলোই অ্যাকটিভ থাকে৷ আর এসবের প্রভাব আমাদের জাতীয় ইভেন্টগুলোতেও পড়ে৷ তাই বলা যায়, আশঙ্কা পুরোপুরি দূর হয়নি৷ লেখক, পাঠক ও প্রকাশক—তিন পক্ষের নিরাপত্তাবোধ নিশ্চিত না হলে মেলা তার স্বাভাবিক প্রাণ ফিরে পায় না।

প্রশ্ন: একটি সুন্দর বইমেলা আয়োজন করতে কী কী পদক্ষেপ নিলে ভালো হয়?

উত্তর: দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রকাশক-লেখক-পাঠকের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ, স্বচ্ছ স্টল বরাদ্দ, সম্পাদনা ও বইয়ের মান নিয়ে ন্যূনতম নীতিমালা এবং তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা—এসব ছাড়া বইমেলা শুধু উৎসব হয়ে থাকে, প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে না।

প্রশ্ন: মেলায় এবং সারা বছর যত বই প্রকাশিত হয় তার ডিজিটাল ডেটাবেইজ কি বাংলা একডেমি বা কোনো কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করতে পারে?

উত্তর: এটি করা অত্যন্ত জরুরি। একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল আর্কাইভ থাকলে বাংলা বইয়ের প্রকাশ-ইতিহাস, প্রবণতা ও মান—সবকিছুরই দীর্ঘমেয়াদি নথি তৈরি হবে। এটি গবেষক ও পাঠক—উভয়ের জন্যই প্রয়োজন।

প্রশ্ন: বইমেলায় পাঠক-লেখক সম্পর্ক বা যোগাযোগের বর্তমান বাস্তবতা কী?

উত্তর: এই সম্পর্ক এখন অনেকটাই ইভেন্টনির্ভর। গভীর পাঠ ও দীর্ঘ আলাপের জায়গা কমে গিয়ে তা অনেক সময় সেলফি, অটোগ্রাফ ও উপস্থিতির প্রতীকে রূপ নিচ্ছে। তবে এটাকেও পুরোপুরি নেতিবাচক বলা যায় না—এটি সময়ের চরিত্র।

প্রশ্ন: প্রচুর বই ছাপা হচ্ছে কিন্তু বইয়ের মান ও সম্পাদনা নিয়ে প্রকাশকেরা কতটা সচেতন বলে মনে করেন?

উত্তর: চিত্রটি অসম। কিছু প্রকাশক যত্নশীল, তবে অধিকাংশ প্রকাশনীই দ্রুত প্রকাশ ও বাজার ধরার চাপে সম্পাদনা ও ভাষার মানের সঙ্গে আপোশ করছেন। এতে দীর্ঘ মেয়াদে পাঠকের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আর যেহেতু প্রতিবছর প্রচুর বই হয়, যেগুলোর ম্যাক্সিমাম নিম্নমানের। তো এত খারাপ বইয়ের মাঝে ভালো ও ইউনিক টেক্সটের বই খুঁজে পাওয়া মুশকিল। প্রকাশকেরা যদি এ ব্যাপারে সচেতন হতো, তাহলে বোধ হয় প্রতিবছর এত কাগজের অপচয় হতো না। নতুন পাঠকরুচি তৈরি হতো, ধ্রুপদী রুচি ব্যাপকহারে বাড়ত। তা ছাড়া এখনই প্রকাশনীগুলোর স্ট্রাকচারাল ডেফিসিট দূর করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত৷ ইভেন্টনির্ভর পাঠসংস্কৃতির চক্রটাকেও ভাঙা দরকার, যাতে পাঠ হয়ে পড়বে সারা বছরের সংস্কৃতি। রিডার এনজেগমেন্ট বাড়ানোর জন্যও আসলে মানসম্মত বইও প্রয়োজন সমাজের সর্বত্র।




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button