ঋণ মওকুফ ও ‘স্মার্ট কৃষক কার্ড’ কীভাবে কাজ করবে

সারাদেশের আনুমানিক ১২ লাখ কৃষককে উপকৃত করতে সুদসহ সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠক শেষে মন্ত্রিসভার সচিব নাসিমুল ঘনি বলেন, ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনি ইশতেহারে বিষয়টি ছিলো। ঋণ মওকুফ সুবিধা ফসল, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের কৃষকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
তিনি বলেন, “দরিদ্র কৃষকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত ও কৃষি খাতকে শক্তিশালী করাই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কৃষি খাতে রাষ্ট্রায়ত্ত, বিশেষায়িত ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক মিলিয়ে সুদসহ বকেয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় এক হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ১২ লাখ ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতা সরাসরি উপকৃত হবেন।
ব্যাংকভিত্তিক ঋণের পরিমাণ
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সবেচেয় বেশি কৃষি ঋণ রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে। অলাভজনক ব্যাংকটিতে ছয় লাখ ৬১ হাজার ৭৬৩ জন গ্রাহকের সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ রয়েছে, যার মোট পরিমাণ ৬২৫ দশমিক ৪০ কোটি টাকা।
কৃষি ঋণে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সোনালী ব্যাংক। সরকারি এ ব্যাংকের দুই লাখ ১৫ হাজার ৯৩২ গ্রাহকের কৃষি ঋণ ৪১৩ কোটি টাকা। তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে থাকা রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের এক লাখ ৪৯ হাজার ৫৬৪ গ্রাহকের কাছে কৃষি ঋণ রয়েছে ১৪৮ দশমিক ৭৯ কোটি টাকা।
জনতা, অগ্রণী, রুপালি, বেসিকসহ অন্যান্য ব্যাংকেও মওকুফ সুবিধার আওতায় যোগ্য গ্রাহক রয়েছেন।
কর্তৃপক্ষ বলছেন, ঋণ মওফুকের এ সহায়তা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ওপর তাত্ক্ষণিক আর্থিক চাপ হ্রাস করবে, যা তাদেরকে গুণগত মানসম্পন্ন বীজ, সেচ ও কৃষি যন্ত্রপাতিসহ প্রয়োজনীয় খাতে তহবিল পুর্ননির্দেশ করতে সক্ষম করবে।
পাইপলাইনে স্মার্ট কৃষি কার্ড
ঋণ মওকুফের পাশাপাশি সরকার স্মার্ট কৃষক কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। কৃষকদের ডিজিটালভাবে নিবন্ধন ও সহায়তা দেওয়ার জন্য টিসিবির ফ্যামিলি কার্ডের মডেলে এ কার্ড তৈরি।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, “এ উদ্যোগটি প্রথমে নির্বাচিত অঞ্চলে পাইলট প্রকল্প হিসেবে চালু করা হবে। পরে সারাদেশে সম্প্রসারণ করা হবে।”
কার্ডটির লক্ষ্য হলো, কৃষকদের একটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল ডেটাবেস তৈরি করা, যেখানে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর এবং মোবাইল ফোন সংযুক্ত থাকবে। এ কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের সরাসরি সুবিধা নিশ্চিত ও মধ্যস্বত্বভোগীদের হস্তক্ষেপ কমানো যাবে।
তথ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, “এ স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা সরাসরি ভর্তুকি, কৃষি ঋণ ও নগদ প্রণোদনা পাবেন। প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে এ প্রকল্পের কাজ দ্রুত করার নির্দেশ দিয়েছেন।”
কীভাবে কার্ডটি কাজ করবে
পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কার্ডটিতে জমির আয়তন, ফসলের ধরণ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্যসহ একটি ডিজিটাল প্রোফাইল অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
কার্ডটিতে যেসব বৈশিষ্ট্যগুলো অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশা করা হচ্ছে:
১. ভর্তুকি ও প্রণোদনা সরাসরি ব্যাংক বা মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর।
২.ভর্তুকিপ্রাপ্ত সার, বীজ ও কীটনাশক সহজলভ্য করা।
৩.কৃষি ঋণ সহজ ও সুসংগঠিত করা।
৪. আবহাওয়া, উৎপাদন এবং বাজারের প্রবণতা সম্পর্কিত এসএমএসভিত্তিক আপডেট।
কৃষি স্মার্ট কার্ডের নিবন্ধন ইউনিয়ন পর্যায়ে সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের (এসএএও) মাধ্যমে অথবা চালুর পর নির্ধারিত অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হবে।
নিবন্ধনে কি কি তথ্য লাগবে
স্মার্ট কৃষি কার্ড পেতে কৃষকদের বেশ কয়েকটি তথ্য প্রয়োজন হবে। সেগুলো হলো,
১. এনআইডির একটি কপি।
২. পাসপোর্ট সাইজের ছবি।
৩. রেজিস্ট্রেশন মোবাইল নাম্বার।
৪. জমির দলিল কিংবা ভাগে চাষিদের জন্য প্রমাণপত্র।
৫. ব্যাংক বা মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্ট নম্বর।
কৃষি স্মার্ট কার্ড নিয়ে ইতোমধ্যে সতর্কতা জারি করেছে সরকার। কর্তৃপক্ষ বলছে, কার্ডটি বিনামূল্যে পাওয়া যাবে। কার্ডের জন্য কারো সঙ্গে কোনও প্রকার অর্থ লেনদেন করবেন না।
পলিসি কনটেক্সট
নিজেদের নির্বাচনি ইশতেহারে কৃষকদের কৃষি ঋণ মওফুকের কথা জানিয়েছিল বিএনপি। সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণকে লক্ষ্য করে নীতিনির্ধারকরা বলছেন, এ পদক্ষেপ ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের ওপর কেন্দ্রীভূত।
এ পদক্ষেপে উৎপাদনে নতুন গতি পাবে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা। তাদের মতে, এর ফলে ঋণগ্রস্ত কৃষকেরা স্বল্পমেয়াদী সুরক্ষা পাবে। আর অর্থনীতিবিদদের মতে, স্থায়ী লাভ নির্ভর করবে সহায়ক সংস্কারগুলোর ওপর। যেমন, ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ, ফসল বীমা এবং কম সুদে ঋণ।
ঋণ মওকুফ ও স্মার্ট কৃষক কার্ড যৌথভাবে কৃষি খাতকে শক্তিশালী করে তুলবে। এতে লাভবান হবে নতুন সরকার।



