জ্বালানি বাজারে যুদ্ধের ধাক্কা, ইউরোপে গ্যাসের দাম বেড়েছে ৪২ শতাংশ

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে টালমাটাল হয়ে পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা। রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়া এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ট্যাঙ্কার চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় হু হু করে বাড়ছে তেল ও গ্যাসের দাম। ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম এক লাফেই ৪২ শতাংশ বেড়ে গেছে। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি এ খবর জানিয়েছে।
সোমবার কাতার এনার্জি তাদের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর এই অস্থিরতা শুরু হয়। আইসিই কমোডিটি এক্সচেঞ্জে এপ্রিল মাসে সরবরাহের জন্য গ্যাসের ফিউচার কন্টাক্টের মূল্য দাঁড়িয়েছে ৪৫.৪৬ ইউরোতে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার পাইপলাইন গ্যাস হারানো ইউরোপ এখন পুরোপুরি কাতার ও অন্যান্য দেশের এলএনজি চালানের ওপর নির্ভরশীল। ফলে কাতারের এই সিদ্ধান্ত ইউরোপের জন্য বড় দুঃসংবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আকাশছোঁয়া তেলের বাজার
তেল সরবরাহের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালিতে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দামও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। মার্কিন তেলের দাম ৮.৪০ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৭২.৬৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৮.৫ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৭৯.১৩ ডলার।
বিশ্লেষকদের মতে, তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি কেবল চালকদের পকেটই কাটবে না, বরং বিশ্বজুড়ে চলমান মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির এই দাম বৃদ্ধি রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।
অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি ও ড্রোন হামলা
বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের ২০ শতাংশ পারমাণবিক ও পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। শিপ-ট্র্যাকিং সংস্থা কেপলার জানিয়েছে, স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থায় ত্রুটি এবং যুদ্ধের কারণে এই পথে জাহাজ চলাচল নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। ওমান সাগরে সোমবার একটি ড্রোনবাহী নৌকার হামলায় মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের পতাকাবাহী একটি তেল ট্যাঙ্কারের এক নাবিক নিহত হয়েছেন।
এদিকে সৌদি আরবের রাস তানুরায় অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম তেল শোধনাগারে ইরান ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন। সতর্কতা হিসেবে শোধনাগারটি আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদী সংকটের আশঙ্কা
জ্বালানি বিশ্লেষক হোলগার স্মিডিং বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এখন মূল প্রশ্ন হলো, হরমুজ প্রণালি কি কয়েক সপ্তাহের জন্য বন্ধ থাকবে? যদি তাই হয়, তবে তা বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দেবে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়াবে। তবে তিনি মনে করেন, মার্কিন নির্বাচনে নিজের জনপ্রিয়তা রক্ষায় ডোনাল্ড ট্রাম্প জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।
ঝুঁকি বিশ্লেষক সংস্থা ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফট-এর টরবজর্ন সোল্টভেডট বলেন, ইরান মূলত সৌদি আরব ও আমিরাতের মতো দেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে চাইছে, যাতে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে যুদ্ধ থামাতে বাধ্য করে। যদি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের জ্বালানি অবকাঠামোতে সরাসরি হামলা অব্যাহত থাকে, তবে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।



