ইরানে সরকারের পরিবর্তন চান নোবেল বিজয়ীরা

ইরানের বিপক্ষে সংঘাতে নেমেছে ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দুইদিন ধরে চলছে এই সংঘাত। এর জেরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির নিহতের খবর পাওয়া গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের মার্কিন ঘাটিতে পাল্টা আক্রমণ চালাচ্ছে ইরান। ইরানের স্কুলে ইসরায়েলি হামলায় নিহত বেড়ে ১৮০-তে গিয়ে পৌঁছেছে। সংঘাত বন্ধে সোচ্চার বিভিন্ন রাষ্ট্র এবং জাতিসংঘ। তবে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ইরানিরা এবং অন্যান্য দেশের নোবেল বিজয়ীরা সেদেশে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের দাবিও জানিয়েছে। তার চান সেদেশে ক্ষমতার পালাবদল হোক। অর্থাৎ তারা চান ইরানে ইসলামতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অবসান হোক।
২০২৩ সালে শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন ইরানের খ্যাতিমান মানবাধিকারকর্মী নার্গিস মোহাম্মদি। দেশটিতে নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে তার লড়াইয়ের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এই সম্মানে ভূষিত করা হয়। নোবেল কমিটির প্রধান তাকে একজন ‘মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ২০১০ সাল থেকে কারাগারেই কাটছে নার্গিসের দিন। বন্দিদশা থেকেই তিনি নারীদের ওপর নিপীড়নের বিষয়টি সামনে আনার লড়াই চালিয়ে গেছেন।
তিনি ২০০৩ সালে শান্তিতে নোবেলজয়ী আরেক ইরানি নারী শিরিন এবাদির গড়া মানবাধিকার সংস্থা ডিফেন্ডারস অব হিউম্যান রাইটস সেন্টারের ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে রয়েছেন। ৫১ বছর বয়সী নার্গিস এখনও পর্যন্ত ১৩ বার গ্রেফতার হয়েছেন। পাঁচবার দোষী সাব্যস্ত হওয়া এই মানবাধিকারকর্মীকে ৩১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারের’ দায়ে কারাভোগ করছেন।
তেহরানের কুখ্যাত এভিন কারাগারে আছেন নার্গিস। গত বছর সেখান থেকে পাঠানো এক চিঠিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের ঘটনায় আটক নারীরা কীভাবে যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, তার বিস্তারিত তুলে ধরেছিলেন তিনি। ২০২৪ সালে চিকিৎসার জন্য মুক্তি পেলেও গত ডিসেম্বরে তাকে পুনরায় গ্রেফতার করা হয়েছে।
জাতীয় নিরাপত্তাবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর অভিযোগে নার্গিসের মোট ৩১ বছর সাজা হয়েছে। মানবাধিকারের বিষয়ে কারাগারে থেকেও উচ্চকণ্ঠ ছিলেন নার্গিস। মৃত্যদণ্ড বাদ করার পক্ষে প্রচারাভিযান চালানো একটি মানবাধিকার আন্দোলন পরিচালনা করার জন্য তাকে শাস্তি দেওয়া হয়।
বহু বছর ধরে, নার্গিস মোহাম্মদী ইরানে নারীর নিয়মতান্ত্রিক বৈষম্য এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। তিনি মানবাধিকার, স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের জন্য সাহসী লড়াইয়ে সামনের সারিতে রয়েছেন। নোবেল পিস কমিটির ভাষ্য, মোহাম্মদী কারাবন্দী কর্মী এবং তাদের পরিবারকে সহায়তা করেছেন। তিনি মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে এবং ইরানের কারাগারে সেদেশের প্রশাসনের নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রচারণায় সক্রিয় ছিলেন। নোবেল কমিটি তার মুক্তির দাবি জানিয়েছে।
শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ইরানের ওপর নারী হলেন শিরীন এবাদি। তিনি ২০০৩ সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। ইসলামি বিশ্বের প্রথম নারী শান্তি পুরস্কার বিজয়ী শিরীন এবাদি। আইনজীবী শিরিন এবাদি ছিলেন ইরানের প্রথম নারী বিচারকদের একজন। ১৯৭৯ সালে খোমেনির বিপ্লবের পরে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। এবাদি তখন এক ধরনের আইনি অনুশীলন শুরু করেছিলেন এবং সরকার দ্বারা নির্যাতিত লোকদের রক্ষা করতে শুরু করেছিলেন। ২০০০ সালে তিনি তার দেশের শ্রেণিবিন্যাসের সমালোচনা করার জন্য কারাবন্দি হয়েছিলেন।
শিরিন এবাদী মৌলিক মানবাধিকার এবং বিশেষ করে নারী ও শিশুদের অধিকারের জন্য সংগ্রাম করেন। তিনি ইরানের উত্তরাধিকার এবং বিবাহবিচ্ছেদ আইনের সংশোধনী প্রস্তাব করে বই লিখেছিলেন। তিনি যাজকদের কাছ থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রত্যাহার করতে চেয়েছিলেন এবং ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণের পক্ষে ছিলেন।
এবাদির আগ্রহে নোবেল কমিটি ২০০১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পরে ইসলামিক এবং পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে উত্তেজনা হ্রাস করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। একই সময়ে, কমিটি ইরানের সংস্কার আন্দোলনকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। শিরীন এবাদি ইরানের সরকার ব্যবস্থার সংস্কারের পক্ষে ছিলেন। এমনকি তিনি বরাবরই কারবান্দি নার্গিস মোহাম্মাদীকে সমর্থন দিয়ে আসছেন।
ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো ইরানের খামেনি সরকারকে স্বৈরশাসক বলে অবহিত করেছেন। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইরানের শাসকদের ক্ষমতায় থাকার জন্য গণতান্ত্রিক সরকারগুলোকে অবশ্যই ব্যয় বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, ইরানি জনগণ, ভেনেজুয়েলার জনগণ, আমরা একই লড়াই করছি। এই দুই দেশের সরকারগুলো বহু বছর ধরে একে অপরকে সহযোগিতা করে আসছে, সম্পদ, তথ্য, প্রযুক্তি, এজেন্ট ও অস্ত্র বিনিময়ের মাধ্যমে। কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো একে অপরকে চাপ এড়িয়ে যেতে এবং নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সহায়তা করে, যখন গণতন্ত্র প্রায়শই বিবৃতিতে থেমে যায়।
মাচাদো বলেন, স্বৈরশাসকরা একে অপরকে সাহায্য করে, তারা প্রযুক্তি ও সম্পদ বিনিময় করে, তারা একে অপরকে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে একে অপরকে সমর্থন করে।
মাচাদো আরও বলেন, ইরানের মানুষ একটি ব্রেকিং পয়েন্টে পৌঁছেছে এবং তারা বিশ্বকে প্রতিক্রিয়া জানানোর আহ্বান জানাচ্ছে।
১১৩ নোবেল পুরষ্কার বিজয়ীদের একটি গ্রুপ ইরানে বিক্ষোভকারীদের হত্যা এবং মৃত্যুদণ্ড বৃদ্ধিসহ ‘মর্মান্তিক’ মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিন্দা জানিয়ে গত ৬ ফেব্রুয়ারি একটি বিবৃতি জারি করেছে এবং বিশ্ব নেতাদের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আহ্বানকে সমর্থন করার জন্য ‘ব্যবহারিক পদক্ষেপ’ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তারা তেহরানের আন্তঃসীমান্ত কর্মকাণ্ডকে বিদেশে সহিংসতা উস্কে দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীরা জানিয়েছেন যে, বিক্ষোভকারীরা স্বাধীনতার দাবি করছেন এবং ‘রাজতান্ত্রিক বা ধর্মীয়’ একনায়কতন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান করছেন, পরিবর্তে দুর্নীতিমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক, বহুত্ববাদী প্রজাতন্ত্রের আহ্বান জানিয়েছেন।
দলটি জাতিসংঘ মহাসচিব এবং অন্যান্য ব্যক্তিত্বদের নিন্দাকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং অভ্যুত্থানের জন্য চাপ ও সমর্থন আহ্বান জানিয়েছেন। তালিকায় স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট হোসে রামোস-হোর্তা, সাবেক পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট লেচ ওয়ালেসা এবং অর্থনীতিবিদ ড্যারন আসেমোগলু।



