ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণে কিছুটা স্বস্তি

ব্যাংকিং খাতে ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত মিলেছে। আগের প্রান্তিকের তুলনায় সবশেষ প্রান্তিকে শ্রেণিকৃত ও খেলাপি ঋণের হার উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। তবে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় চিত্রটি এখনও উদ্বেগজনক। কারণ, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় শ্রেণিকৃত ঋণের হার ১০ শতাংশ পয়েন্টের বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১ এর সিএল-১ বিবরণী বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মোট ঋণ ও অগ্রিম দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা। অর্থাৎ, মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ এখন শ্রেণিকৃত।
ত্রৈমাসিকে বড় হ্রাস
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ শেষে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। সে হিসেবে মাত্র তিন মাসে শ্রেণিকৃত ঋণ কমেছে ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা এবং হার কমেছে পাঁচ দশমিক ১৩ শতাংশ পয়েন্ট।
নিট শ্রেণিকৃত ঋণের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন এসেছে। প্রভিশন ও স্থগিত সুদ সমন্বয়ের পর ডিসেম্বর শেষে নিট শ্রেণিকৃত ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ, যা সেপ্টেম্বরে ছিল ২৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ, নিট হারে এক প্রান্তিকে কমেছে ১২ দশমিক ৪৭ শতাংশ পয়েন্ট।
খেলাপি ঋণেও স্বস্তির ইঙ্গিত
ডিসেম্বর শেষে মোট খেলাপি (ডিফল্টেড) ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ২৯ দশমিক ৯২ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ছয় লাখ ১২ হাজার ৮৭১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বা ৩২ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ, তিন মাসে খেলাপি ঋণ কমেছে ৬৮ হাজার ৩৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। হার কমেছে দুই দশমিক ৮২ শতাংশ পয়েন্ট।
তবে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে শ্রেণিকৃত ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক ২০ শতাংশ। সে তুলনায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে হার বেড়েছে ১০ দশমিক ৪০ শতাংশ পয়েন্ট, যা বার্ষিক ভিত্তিতে চাপের ইঙ্গিত দেয়।
প্রভিশন কভারেজে উন্নতি
ডিসেম্বর শেষে রক্ষিতব্য প্রভিশন ছিল চার লাখ ৪১ হাজার ৯০ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। বিপরীতে রক্ষিত প্রভিশন দুই লাখ ৪৯ হাজার ৬৪৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা। প্রভিশন কভারেজ অনুপাত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬ দশমিক ৬০ শতাংশে, যা সেপ্টেম্বরে ছিল ২৮ দশমিক ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ, কভারেজে উন্নতি হয়েছে ২৮ দশমিক ১৮ শতাংশ পয়েন্ট।
সেপ্টেম্বর শেষে প্রভিশন ঘাটতি ছিল তিন লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা ডিসেম্বর শেষে কমে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৯১ হাজার ৪৪১ কোটি ৩৫ লাখ টাকায়। অর্থাৎ, প্রভিশন ঘাটতি কমেছে প্রায় এক লাখ ৫২ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকা।
কোন খাতে কত চাপ
ব্যাংকভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকে শ্রেণিকৃত ঋণের হার ৪৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ, যা সেপ্টেম্বরে ছিল ৪৯ দশমিক। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে শ্রেণিকৃত ঋণের হার ২৮ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা গত সেপ্টেম্বরে ছিলো ৩৩ শতাংশ। বিদেশি ব্যাংকে চার দশমিক ৫১ শতাংশ, যা সেপ্টেম্বরে ছিলো ৪ দশমিক।
বিশেষায়িত ব্যাংকে শ্রেণিকৃত ঋণের হার ৩৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ, যা গত সেপ্টেম্বরে ছিলো ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ, সব শ্রেণির ব্যাংকেই শ্রেণিকৃত ঋণের হার কমেছে। সবচেয়ে বেশি হ্রাস পেয়েছে বেসরকারি ব্যাংকে পাঁচ দশমিক ৫১ শতাংশ পয়েন্ট। আর রাষ্ট্রীয় ব্যাংকে কমেছে পাঁচ দশমিক ২২ শতাংশ পয়েন্ট।
ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬.৪০ শতাংশ
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মোট ঋণের স্থিতি ছিল ১৭ লাখ ১১ হাজার ৪০১ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এক বছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকায়। অর্থাৎ, বছরের ব্যবধানে ঋণ বেড়েছে এক লাখ ৯ হাজার ৫১৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বা ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ।
খাতভিত্তিক প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক। এ খাতে ঋণ বেড়েছে প্রায় ৯৬ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা বা সাত দশমিক ৫৬ শতাংশ। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকে প্রবৃদ্ধি তিন দশমিক শূন্য আট শতাংশ। বিশেষায়িত ব্যাংকে চার দশমিক ২৩ শতাংশ এবং বিদেশি ব্যাংকে সর্বনিম্ন এক দশমিক ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
বিশ্লেষণ কী বলছে
ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে শ্রেণিকৃত ও খেলাপি ঋণের উল্লেখযোগ্য হ্রাস ব্যাংকিং খাতে পুনর্বিন্যাস, আদায় তৎপরতা বা পুনঃতফসিলায়নের প্রভাব নির্দেশ করতে পারে। একইসঙ্গে প্রভিশন কভারেজের উন্নতি ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় কিছুটা অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়।
তবে, বার্ষিক ভিত্তিতে শ্রেণিকৃত ঋণের হার দ্বিগুণের কাছাকাছি বেড়ে যাওয়া দেখায়, ব্যাংকিং খাত এখনও গভীর চাপের বাইরে নয়। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে উচ্চ খেলাপি হার কাঠামোগত দুর্বলতার দিকেই ইঙ্গিত করে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে কিছুটা স্থিতিশীলতার আভাস মিললেও ব্যাংকিং খাতের স্থায়ী স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনতে খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা, প্রভিশন শক্তিশালীকরণ এবং সুশাসন জোরদার—এই তিনটি ক্ষেত্রেই আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।



