‘ধর্ষণের শিকার’ ছাত্রীকে হয়রানির অভিযোগ গকসু ভিপির বিরুদ্ধে, সাংবাদিক সমিতিতে ভাঙচুর

আশুলিয়ায় গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করতে এসে অভিযুক্তদের হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন ‘ধর্ষণের শিকার’ এক ছাত্রী। তার অভিযোগ, ‘গণ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (গকসু) ভিপি ও তার সহযোগীরা তাকে হয়রানি করেছেন।’
রবিবার (১ মার্চ) সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত এসব ঘটনা ঘটে। বিশৃঙ্খলার একাধিক ভিডিও ফুটেজ এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
ক্যাম্পাস সূত্রে জানা যায়, রবিবার সকালে সংবাদ সম্মেলন করতে এলে গকসু ভিপির স্ত্রী পরিচয় দেওয়া এক শিক্ষার্থীসহ কয়েকজন এসে ওই ভুক্তভোগীকে বের করে নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে দফায় দফায় তারা সেখানে জড়ো হয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন। একপর্যায়ে সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়েও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিয়ে দিনভর ক্যাম্পাসে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। এসব ঘটনায় গবিসাস কার্যালয় পরিদর্শনে আসেন প্রশাসনের কর্মকর্তা ও গণ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (গকসু) ভিপিসহ নেতৃবৃন্দ।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সদস্যরা জানান, ২০২৫ সালের গত ৭ এপ্রিল গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে পিকনিকের কথা বলে ডেকে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় করা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ৩ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার করে আশুলিয়া থানা পুলিশ। এরপর থেকে তারা কারাগারে আছে।
এ মামলার ঘটনায় ওই ভুক্তভোগীকে অভিযুক্তের চাচাতো ভাই গণ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (গকসু) ভিপি ইয়াসিন আল মৃদুল দেওয়ান ও তার অনুসারীরা তাকে অনুসরণ করে হয়রানি ও হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছেন। সম্প্রতি ভুক্তভোগী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আশুলিয়া থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দেন। বিষয়টি নিয়ে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে যান রবিবার সকালে। সেখানে গকসু ভিপির স্ত্রী পরিচয় দেওয়া এক নারী ও তার সঙ্গে থাকা আরও তিন জন গিয়ে তাকে তুলে এনে হেনস্তার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে সাংবাদিকরা তাকে একটি নিরাপদ কক্ষে পাঠিয়ে দেন। তবু দফায় দফায় জড়ো হয়ে তাকে হয়রানির চেষ্টা করা হয়। এতে প্রায় সাত ঘণ্টা জিম্মি অবস্থায় থাকেন ভুক্তভোগী। খবর পেয়ে প্রশাসন তাকে উদ্ধার করে।
প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থী ও ভুক্তভোগী জানান, ওই দিন বেলা ১১টার দিকে ভুক্তভোগী গকসুর ক্যানটিন সম্পাদক মনোয়ার হোসেন অন্তর (ইইই), কৃষি অনুষদের জাহিদ হাসান (কৃষি) ও সাজুসহ (রসায়ন) মোট চার জন গবিসাস কার্যালয়ে আসেন। সেই সময় কার্যালয়ে গবিসাসের তিন জন উপস্থিত ছিলেন। ভুক্তভোগী এসে গবিসাসের একজন সদস্যের কাছে তার সঙ্গে ঘটা ঘটনার বিবরণ দেন ও এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করবেন বলে জানান। তবে সেখানে গবিসাসের সিনিয়র কেউ উপস্থিত না থাকায় তাকে অপেক্ষা করতে বললে তিনি প্রায় ১০ মিনিট পর ভিডিও বক্তব্য ধারণ করতে বলেন। একপর্যায়ে তার ভিডিও বক্তব্য ধারণ করা হয়। এর ২-৩ মিনিটের মধ্যেই গকসু ভিপি ইয়াসিন আল মৃদুল দেওয়ানের স্ত্রী পরিচয় দেওয়া শিক্ষার্থী ক্যামি (ইংরেজি বিভাগ) ও মীরা (মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ), দিদিন (ইংরেজি বিভাগ) নামে তিন জনসহ আরও কয়েকজন নারী শিক্ষার্থী গবিসাস কার্যালয়ে উপস্থিত হন।
তারা আক্রমণাত্মকভাবে চিৎকার করে গবিসাস সভাপতি ও এক সদস্যকে বলতে থাকেন, আপনারা এক পক্ষের কথা শুনছেন। কোনও প্রমাণ ছাড়া কাজ করছেন। এর মধ্যেই নিরাপত্তার জন্য ওই ভুক্তভোগীকে গবিসাস কার্যালয়ের বৈঠক করার চেম্বার কক্ষে নেওয়া হয়। তাদের আক্রমণাত্মক ভাষ্যের ভিডিও রেকর্ড করতে গেলে প্রথমে নিষেধ করে ও পরক্ষণেই সাংবাদিকদের ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে ও ভিডিও করা বন্ধ করে দেন। একপর্যায়ে তারা ওই চেম্বার কক্ষের কাচের দরজায় ধাক্কাধাক্কি করে ও সেটি ভেঙে ওই ভুক্তভোগীকে বের করে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ ছাড়া সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মানহানি মামলার হুমকি দেন। এ সময় সাংবাদিকরা তাদের কোনও বক্তব্য থাকলে সেটি তুলে ধরার আহ্বান জানান। তখন তারা বাইরে চলে যান।
কিছুক্ষণ পর তারা ফের ৪-৫ জন পুরুষ শিক্ষার্থীসহ গবিসাস কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। গবিসাস সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করতে চান তারা। একপর্যায়ে ভুক্তভোগীর বিষয়ে জিজ্ঞেস করেন। সম্রাট নামে উপস্থিত শিক্ষার্থী প্রশ্ন করেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনও প্রমাণ রয়েছে কিনা। তিনিও মানহানির মামলার হুমকি দেন। একপর্যায়ে তারা প্রায় ১০-১৫ মিনিট পর বাইরে বেরিয়ে যান। এরপর আবার কিছুক্ষণ পর ৪০-৪৫ জনসহ ফের তৃতীয় দফায় গবিসাস কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। তাদের সঙ্গে গকসুর জিএস ও এজিএসও কার্যালয়ে আসেন। তারা আলোচনায় বসেন, কিছুক্ষণ পর গকসুর ভিপিও সেখানে এসে ঘটনার বিষয় জানতে চান। আলোচনার মধ্যেই অজ্ঞাত এক শিক্ষার্থী গবিসাস কার্যালয়ের জানালার কাচে পাথর নিক্ষেপ করেন।
এতে বাইরে থাকা শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন। গকসুর নেতারা বাইরে গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে গবিসাসের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ভিসিকে ফোন করেন। তিনি ক্যাম্পাসে ছিলেন না। তিনি আশ্বস্ত করেন প্রক্টরিয়াল বডি পাঠাবেন। এরপর গবিসাস থেকে প্রক্টরিয়াল বডির সঙ্গে যোগাযোগ করে গবিসাস কার্যালয়ের সামনে উত্তপ্ত পরিস্থিতি ও ভুক্তভোগী একজন শিক্ষার্থী গবিসাস কার্যালয়ে রয়েছেন বিষয়টি তাদের জানানো হয়।
এর পাঁচ মিনিট পর প্রক্টরিয়াল বডি, রেজিস্ট্রার, ছাত্র উপদেষ্টাসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা গবিসাস কার্যালয়ে আসেন। তারা গবিসাস সদস্যদের কাছ থেকে ও বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে বিবরণ নেন। পরে এ বিষয়ে কথা বলতে সবাইকে প্রক্টর অফিসে যেতে বলা হয়। এ ছাড়া তারা ওই ভুক্তভোগীকে বের করে তাদের হাতে দিতে বলেন। প্রায় ১০-১৫ মিনিট পর একজন শিক্ষার্থী গবিসাস কার্যালয়ের আরেকটি জানালার কাচ ভেঙে ফেলেন। ওই কাচ গবিসাস কার্যালয়ে উপস্থিত থাকা ডেপুটি রেজিস্ট্রারের গায়েও পড়ে। একপর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে প্রক্টর অফিসে বসতে রাজি হন ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।
প্রায় দুই ঘণ্টা চেম্বার কক্ষে আটকে থাকা ভুক্তভোগীকে পরে প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাদের জিম্মায় নিয়ে প্রশাসনিক ভবনে যান। এর মধ্যে ভুক্তভোগী জাতীয় জরুরি নম্বর ৯৯৯ এ ফোন করলে আশুলিয়া থানা পুলিশও ক্যাম্পাসে আসে। গবিসাস কার্যালয় থেকে প্রশাসনিক ভবনে নেওয়ার সময় তার বিরুদ্ধে ও গবিসাসের বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দেন ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। প্রশাসনিক ভবনে প্রক্টরিয়াল বডি, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, পুলিশ, ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের সদস্য, গকসুর সদস্যরাসহ কিছু শিক্ষার্থী বৈঠকে অংশ নেন। তবে সাংবাদিকদের সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। বেলা আড়াইটা থেকে বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত ওই বৈঠক চলতে থাকে। সেখানে উভয় পক্ষের কথা শোনা হয়। তবে কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। বৈঠকের পর রেজিস্ট্রার জানান, তদন্ত কমিটি করে তদন্তের পর বিস্তারিত জানানো হবে।
এ ঘটনার পর সোমবার সকালে গবিসাস কার্যালয় পরিদর্শনে এসে দুঃখপ্রকাশ করেন গকসু ভিপি ইয়াসিন আল মৃদুল দেওয়ান। এ সময় তার সঙ্গে অনুষদ প্রতিনিধি মেহেদী, সম্রাটসহ আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। এসব বিষয়ে জানতে চাইলেও ভিপি মৃদুল কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রুবেল হাওলাদার বলেন, ‘সম্প্রতি ওই শিক্ষার্থী নিরাপত্তা চেয়ে থানায় অভিযোগ করেছেন। আমরা তাকে নিরাপত্তা দেবো। গতকাল খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যাই। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ব্যবস্থা নিয়েছে। যেহেতু ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ বিষয়, সেটি তারাই দেখভাল করছেন।’
গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী মো. ওহিদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা অভিযোগ পেয়েছি, তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সমাধান করা হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কনক চন্দ্র রায় বলেন, ‘ইভটিজিংয়ের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল কাজ করছে। গতকালের ঘটনায়ও তদন্ত চলছে। পরবর্তীতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’



