চার দিনে ১৩১ ফ্লাইট বাতিল, উৎকণ্ঠায় বিদেশগামী যাত্রীরা

ইসরায়েল–ইরান যুদ্ধ শুরুর পর ঢাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী ১৩১টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। গত শনিবার থেকে চার দিনে এসব ফ্লাইট মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার কথা ছিল। বাতিল হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো মানুষ।
সোমবার (২ মার্চ) শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। ফলে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত মোট ১৩১টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের হিসাবে, শনিবার ২৩টি ফ্লাইট প্রথমে স্থগিত ও পরে বাতিল করা হয়। এরপর রবিবার বাতিল হয় ৪০টি ফ্লাইট। তৃতীয় দিন সোমবার বাতিল হয় ৪৬টি ফ্লাইট। আর সবশেষ মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত বাতিলের তালিকায় যোগ হয়েছে আরও ২২টি ফ্লাইট।
বাতিল ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স, এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ, গালফ এয়ার, ফ্লাইদুবাই, এয়ার অ্যারাবিয়া, সালাম এয়ার, কুয়েত এয়ারওয়েজ ও জাজিরা এয়ারওয়েজের ফ্লাইট রয়েছে।
এদিকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উদ্বেগ–হতাশায় অপেক্ষা করছেন যাত্রীরা। সবার চোখে–মুখে হতাশা, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা। কেউ দ্বিতীয় দিনের মতো বিমানবন্দরে এসেছেন, কেউ অপেক্ষা করছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তাঁদের সঙ্গে আছেন বিদায় জানাতে আসা স্বজনেরাও। সবাই মধ্যপ্রাচ্যগামী যাত্রী।
কর্মস্থলে ফিরতে না পেরে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগে পড়েছেন প্রবাসী কর্মীরা। অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফ্লাইটের তথ্য জানতে এদিক–ওদিক ছুটছেন তারা। থাকা–খাওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় ভোগান্তিও বাড়ছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জরুরি সেবা নম্বরে ফোন করেও তথ্য না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন অনেকে।
বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ স্বাভাবিক হলে ধাপে ধাপে ফ্লাইট সূচি পুনর্বিন্যাস করা হবে। সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলো যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে রিশিডিউল বা বিকল্প ফ্লাইটের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছে।
প্রবাসী যাত্রীদের অভিযোগ, ফ্লাইট বাতিলের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে আগাম জানানো হয়নি। থাকা–খাওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়নি। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে খাবারের ব্যবস্থা করার কথা বলা হলেও বেশির ভাগ যাত্রী তা জানেন না। প্রবাসী হেল্প ডেস্ক থেকে শুধু হটলাইন নম্বর দেওয়া হচ্ছে, তবে সেখান থেকেও কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা মিলছে না।
সৌদি আরবগামী হৃদয় হোসেনের বাড়ি লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায়। তিনি সৌদিতে একটি রেস্টুরেন্টে চাকরি করেন। গতকাল সন্ধ্যায় তার ফ্লাইট ছিল। তিনি বলেন, ‘আমি ৪০ দিনের ছুটিতে দেশে এসেছিলাম। বিমানবন্দরে আসার পথেও অনলাইনে ফ্লাইট শিডিউল দেখেছি। কিন্তু এসে দেখি ফ্লাইট বাতিল। বিমানবন্দরে বিশ্রাম বা খাওয়া তো দূরের কথা, কোনো তথ্যও পাচ্ছি না। ভিসার মেয়াদ কম, তাই ঝুঁকি থাকলেও যেতেই হবে। না হলে চাকরি থাকবে না।’
হৃদয়ের মা খাদিজা আক্তার বলেন, “এমন পরিস্থিতিতে ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে ভয় লাগছে। আবার না গেলে তার চাকরি থাকবে না।”
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিগামী প্রবাসী শাজাহান মিয়ার বাড়ি লক্ষ্মীপুরের ভবানীগঞ্জে। তিনি বলেন, রবিবার সন্ধ্যায় তার ফ্লাইট ছিল। বিমানবন্দরে এসে বাতিলের খবর জানতে পারেন। গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করে আত্মীয়ের বাসায় যান। পরদিন আবার বিমানবন্দরে আসেন। তিনি বলেন, “হটলাইন নম্বর দিয়েছে, কিন্তু সেখানে ফোন করে কোনো তথ্য পাইনি। কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে, জানি না।”
নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার রহিমপুরের মিজানুর রহমান প্রথমবারের মতো সৌদি আরব যাওয়ার কথা ছিল। রাত ৯টা ২০ মিনিটে তার ফ্লাইট ছিল। বাড়ি থেকে রওনা দেওয়ার আগেও এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্লাইট নিশ্চিত হন। কিন্তু বিমানবন্দরে এসে বাতিলের খবর পান। তিনি বলেন, “হটলাইন নম্বরে বহুবার কল দিয়েছি। শুধু অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। কিন্তু কেউ কোনো তথ্য দেয়নি।”
বিমানবন্দরের বহুতল পার্কিং ভবনের যাত্রী অপেক্ষাগারে হৃদয়, শাজাহান ও মিজানের মতো শত শত প্রবাসী যাত্রী অপেক্ষা করছেন।
এদিকে, যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে শনিবার রাতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, ফ্লাইট বাতিল হওয়া যাত্রীদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে বিমানবন্দরে অপেক্ষমাণ বেশিরভাগ যাত্রীই এ বিষয়ে জানেন না বলে অভিযোগ করেছেন।



