Uncategorized

সামাজিক অগ্রগতি সত্ত্বেও সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব কম

শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং ব্যবসায় অংশগ্রহণ বাড়লেও বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে নারীর উপস্থিতি কম। সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব এখনও সমতা থেকে অনেক দূরে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে সেটাই দেখা গেছে।

৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে সর্বশেষ নির্বাচনে মাত্র সাতজন নারী সরাসরি নির্বাচিত হন। তাদের মধ্যে ছয় জন বিএনপির প্রার্থী, একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন। নারীদের জন্য সংরক্ষিত ৫০টি আসন যোগ হলে সংসদে মোট নারী সদস্যের সংখ্যা হবে ৫৭; যা আইনসভার প্রায় ১৬ শতাংশ।

প্রার্থীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা কম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ২ হাজার ১৭ প্রার্থী। তাদের মধ্যে নারী ৮৪ জন; যা মোট আসনের ৪ শতাংশ। এর মধ্যে ৬৬ জন নারী দলীয় মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ১৯ জন। ৮৪ নারী প্রার্থীর মধ্যে সাত জন জয় পান।

নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন– মানিকগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী আফরোজা খানম, ঝালকাঠি-২ আসনের ইসরাত সুলতানা এলেন ভুট্টো, সিলেট-২ আসনের তাহসিনা রুশদীর লুনা, নাটোর-১ আসনের ফারজানা শারমিন, ফরিদপুর-২ আসনের শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং ফরিদপুর-৩ আসনের নায়েব ইউসুফ আহমেদ। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা ‘হাঁস’ প্রতীক নিয়ে উল্লেখযোগ্য ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন।

সিলেট-২ আসনে ২০১২ সালে নিখোঁজ বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর ৭৯ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন, জেলার ছয়টি আসনের ৩৩ জন প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে তিনিই একমাত্র নারী প্রার্থী।

বরিশাল-৫ (সদর) আসনের একমাত্র নারী প্রার্থী মনীষা চক্রবর্তী বলেছেন, প্রচারণার সময় বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার চালানো হয়েছিল; যা নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে।

তিনি বলেন, গ্রামাঞ্চলের কিছু লোক প্রচার করেন, মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর মানুষকে একজন পর্দাহীন নারীর মুখ দেখতে হয়। এর কিছুটা প্রভাব নির্বাচনে পড়তে পারে।

তিনি আরও বলেন, সাম্প্রদায়িক অনুভূতিও এতে ভূমিকা পালন করেছে। একটি টক শোতে একজন অংশগ্রহণকারী বলেছিলেন, তারা কোনও নারীর সঙ্গে আলোচনায় যোগ দেবেন না।

দলীয় মনোনয়ন এখনও সীমিত

যদিও বাংলাদেশে জনজীবনে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে, তবুও রাজনৈতিক দলগুলো তুলনামূলকভাবে কম সংখ্যক নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দিচ্ছে।

সর্বশেষ নির্বাচনের তথ্য অনুযায়ী বৃহত্তম দল বিএনপি ১০ জন নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে; যা সংখ্যার দিক থেকে দলগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে আনুপাতিকভাবে দলটি এখনও নারীদের একটি ছোট অংশ প্রার্থী করেছে।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ-মার্কসবাদী) দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। তারা ৯ জন নারীকে মনোনয়ন দেয়; যা তাদের মোট প্রার্থীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

অন্য দলগুলো মাত্র হাতেগোনা কয়েকজন নারীকে মনোনয়ন দেয়। জাতীয় পার্টি (জিএম কাদের গ্রুপ) পাঁচটি, গণসংহতি আন্দোলন চারটি, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি তিনটি এবং গণ অধিকার পরিষদ তিনটি নারী প্রার্থী দেয়।

তবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টি একজনও নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়নি।

আইনি লক্ষ্য পূরণ হয়নি

বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশের অধীন রাজনৈতিক দলগুলোকে দলীয় কাঠামোতে কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা। তবে কোনও দলই এই শর্ত পূরণ করেনি।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কর্তৃক প্রস্তুত জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোকে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে কমপক্ষে ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ছিল, এই সংখ্যা ৩৩ শতাংশে উন্নীত করা।

প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও বেশিরভাগ দল ৫ শতাংশ লক্ষ্যও পূরণ করতে ব্যর্থ হয়।

নারী প্রার্থী এবং অধিকার কর্মীরা আরও অভিযোগ করেছেন, প্রচারণার সময় নারী-বিদ্বেষী প্রচারণা এবং বৈষম্যমূলক মনোভাব নারীদের নির্বাচনি সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করেছে।

গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-১২ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তসলিমা আক্তার বলেন, নির্বাচনি প্রচারণা শুরু হওয়ার আগেই নারী-বিরোধী বক্তব্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিনিধিত্ব

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশের সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওঠা-নামা করেছে।

প্রথম সংসদে (১৯৭৩-৭৫), নারী প্রতিনিধিত্ব ছিল শুধু ১৫টি সংরক্ষিত আসনে। দ্বিতীয় সংসদে (১৯৭৯-৮২), সরাসরি নির্বাচিত দুইজন এবং সংরক্ষিত আসন থেকে ৩০ জন নারী।

পঞ্চম সংসদে (১৯৯১-৯৫) সরাসরি নির্বাচিত পাঁচজন নারী, সপ্তম সংসদে আটজন নারী নির্বাচিত হন।

২০০১ সালে অষ্টম সংসদেও সরাসরি নির্বাচিত সাতজন নারী আইনপ্রণেতা ছিলেন; যা ২০২৬ সালের নির্বাচনেও দেখা গেছে।

২০০৮ সালের নির্বাচনের পর নবম সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্বের সর্বোচ্চ স্তর এসেছিল, সেবার ২১ জন নারী সরাসরি নির্বাচিত হন এবং সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা ৫০-এ উন্নীত করা হয়েছিল, যার ফলে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৭০।

আওয়ামী লীগ সরকারের অধীন পরবর্তী নির্বাচনে ২০১৪ সালে ১৮ জন, ২০১৮ সালে ২৩ জন এবং ২০২৪ সালে ১৯ জন নারী সরাসরি নির্বাচিত হন।

নারী শিক্ষা এবং কর্মশক্তির অংশগ্রহণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য সত্ত্বেও নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বব্যাপী ১৩৪তম।

ত্রয়োদশ নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীর প্রধান শফিকুর রহমান বলেন, তার দল এই নির্বাচনে কোনও নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়নি, যদিও ভবিষ্যতে এটি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

একজন নারী দলকে নেতৃত্ব দিতে পারবেন কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, পুরুষ ও নারীদের মধ্যে ধর্মীয় এবং জৈবিক পার্থক্যের কথা উল্লেখ করে এটি সম্ভব নয়। আল জাজিরার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে এই মন্তব্য করা হয়।

নারী অধিকার সমর্থকরা বলছেন, মনোনয়ন বৃদ্ধি, সহায়ক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি এবং দলগুলোর মধ্যে অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা ভবিষ্যতের নির্বাচনে নারীর প্রতিনিধিত্ব উন্নত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button