পড়াশোনায় এগিয়ে, তবু চাকরিতে পিছিয়ে কেন নারীরা?

বাংলাদেশে প্রতি বছর মাধ্যমিক (এসএসসি) ও উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষার ফল প্রকাশের সময় একটি বিষয় প্রায়ই দেখা যায়—“মেয়েরা ফলাফলে ছেলেদের ছাড়িয়ে” । কিন্তু এই সাফল্য সত্ত্বেও প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ ও কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকেরা।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, সরকারি চাকরির সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক পথ বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস)-এ নিয়োগে নারীদের অংশগ্রহণ ধীরে ধীরে কমছে।
বিসিএসে নারীদের অংশগ্রহণ কমছে
বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) ২০২৩ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৪৩তম বিসিএসে মোট ২,১৬৩ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র ৪২১ জন, আর পুরুষ ১,৭৪২ জন।
অর্থাৎ মোট নির্বাচিত প্রার্থীর মধ্যে নারীর অংশ ১৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ, যেখানে পুরুষের অংশ ৮০ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
এর আগের বিসিএসগুলোতেও নারীর অংশগ্রহণ প্রায় এক-চতুর্থাংশের মতো ছিল।
৪১তম বিসিএসে মোট ২,৫১৬ জনের মধ্যে নারী ৬৭২ জন (২৬ দশমিক ৭১ শতাংশ);
৩৮তম বিসিএসে ২,২০৪ জনের মধ্যে নারী ৫৯৩ জন (২৬ দশমিক ৯১ শতাংশ); ৪০তম বিসিএসে ১,৯৬৩ জনের মধ্যে নারী ৫১১ জন; ৩৬তম বিসিএসে ২,৩২৩ জনের মধ্যে নারী ৬০৯ জন (২৬ দশমিক ২২ শতাংশ); ৩৭তম বিসিএসে ১,৩১৪ জনের মধ্যে নারী ৩২৩ জন ২৪ দশমিক ৬০ শতাংশ।
এর প্রভাব কী হতে পারে জানতে চাইলে সাবেক পিএসসি সদস্য অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, “এখন হয়তো প্রভাব স্পষ্ট নয়। তবে আগামী ১০–১৫ বছরে প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে নারীর প্রতিনিধিত্বে বড় ফাঁক তৈরি হতে পারে।”
তার ভাষ্য, বাংলাদেশে নারীদের পড়াশোনা, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং পারিবারিক দায়িত্ব—সব একসঙ্গে সামলাতে হয়। ফলে বিসিএসের মতো তিন ধাপের (প্রিলিমিনারি, লিখিত ও ভাইভা) কঠিন পরীক্ষায় অনেকেই পিছিয়ে পড়েন।
পিএসসির তথ্য অনুযায়ী, ৩৬তম থেকে ৪৩তম বিসিএস পর্যন্ত নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে গড়ে প্রায় ২৫ শতাংশ নারী। অর্থাৎ প্রতি ১০০টি ক্যাডার পদের প্রায় ৭৫টিই পুরুষদের দখলে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেকই নারী
অন্যদিকে, উচ্চশিক্ষায় নারীদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ১৬৩টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৪৭ লাখ ৫৬ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে পুরুষ ২৫ লাখ ৪২ হাজার, নারী ২২ লাখ ১৪ হাজার। অর্থাৎ মোট শিক্ষার্থীর ৪৮ শতাংশ নারী।
দেশের বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে দেখা গেছে, অনেকক্ষেত্রেই ফলাফলে শীর্ষ অবস্থান দখল করে থাকেন নারী শিক্ষার্থীরা।
বৈশ্বিক সূচকে পিছিয়ে বাংলাদেশ
এই সাফল্যের পরও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূচকে নারীর অবস্থান তুলনামূলকভাবে নিচে। দ্য গ্লোবাল ইকোনমির তথ্যে উচ্চশিক্ষায় নারী-পুরুষ অনুপাতের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে ১১০তম অবস্থানে। আর নারীর ক্ষমতায়ন সূচকে দেশের অবস্থান ১৩৪তম।
তবে বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮(২) অনুচ্ছেদে নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
‘এসটিইএম’ শিক্ষায় বড় ব্যবধান
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (এসটিইম) শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ আরও কম।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) গবেষণায় দেখা গেছে, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে এমটিইএম শিক্ষায় নারীর অংশ মাত্র ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক গড় ২৯ দশমিক ৩ শতাংশ।
এমনকি যারা এই বিষয়ে পড়াশোনা করেন, তাদের অনেকেরই কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
স্কুল পরীক্ষাতেও এগিয়ে মেয়েরা
শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই মেয়েদের এগিয়ে থাকার প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছেলের সংখ্যা ৪ লাখ ৫৫ হাজার ৪৭৭, আর উত্তীর্ণ মেয়ে ৫ লাখ ৫১ হাজার ৭৭। ছেলেদের পাসের হার ৬৫ দশমিক ১১ শতাংশ। আর মেয়েদের পাসের হার ৭০ দশমিক ৬৭ শতাংশ। জিপিএ–৫ পাওয়া ১ লাখ ২৫ হাজার ১৮ শিক্ষার্থীর মধ্যে মেয়ে ৬৬ হাজার ৭৮০ আর ছেলে ৫৮ হাজার ২৩৮। মাদ্রাসা বোর্ডের দাখিল পরীক্ষাতেও একই চিত্র দেখা গেছে।
কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ কমছে
স্বাধীনতার পর থেকে নারীর কর্মসংস্থান বাড়লেও সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মোট শ্রমশক্তি ৭ কোটি ২২ লাখ ৮০ হাজার, যা আগের বছরের তুলনায় কম।
এর মধ্যে পুরুষ ৪ কোটি ৮০ লাখ ৪ হাজার, নারী ২ কোটি ৪২ লাখ ৪ হাজার।
শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার
শ্রমশক্তিখাতে পুরুষের হার ৮০ দশমিক ১৩ শতাংশ, নারী ৩৯ দশমিক ২০ শতাংশ। ২০২২ সালে এই খাতে নারীর অংশগ্রহণ ছিল ৪২ দশমিক ৭৭ শতাংশ—অর্থাৎ দুই বছরে কমেছে ৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
এছাড়া বর্তমানে শ্রমশক্তির বাইরে রয়েছে ৪ কোটি ৯৫ লাখ ১০ হাজার মানুষ। এর মধ্যে নারী ৩ কোটি ৭৬ লাখ, পুরুষ ১ কোটি ১৯ লাখ।
কর্মক্ষেত্রে নানা বাধা
ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান আলেয়া পারভীন লীনা বলেন, অনেক কর্মক্ষেত্র এখনও নারীবান্ধব নয়।
তার মতে, অনেক প্রতিষ্ঠানে নারীদের জন্য মৌলিক সুবিধাও থাকে না—যেমন উপযুক্ত টয়লেট।
তিনি জানান, তার অফিসে বোর্ড মিটিংয়ে অনেক সময় ১০–১২ জনের মধ্যে তিনি একমাত্র নারী থাকেন।
পরিবার ও সামাজিক চাপ
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা তাহমিনা আক্তার এমু জানান, বিয়ের পর পারিবারিক প্রত্যাশার কারণে তাকে চাকরি ছেড়ে দিতে হয়েছে।
তার ভাষ্য, “বিয়ের পর অনেক পরিবারই আশা করে পুত্রবধূ সংসার সামলাবে।”
অফিসের কাজ, সংসারের দায়িত্ব, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি ও অনিরাপদ গণপরিবহন—সব মিলিয়ে চাপ বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত তিনি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।



