তাঁর নদীপুরাণ

কবি শামীম রেজার জন্ম (৮ মার্চ, ১৯৭১) বিষখালিবিধৌত কাঠালিয়ায়। কাঠালিয়া যার কূলে অবস্থিত সেই নদীর নাম বিষখালী—এক মহাপ্রাণ। বাংলাদেশে নদীর ভিতর যেসকল নদী প্রধান ও আলোচিত, নিঃসন্দেহে বিষখালি সেসকল নদীসমূহের মধ্যে একটি। বিষখালি উপকূলবর্তী বহু ঘটন-অঘটনের সাক্ষী। এই মহাপ্রাণের ভিতর লুকিয়ে আছে হাজারো গল্প, কথা ও মিথ। আছে শত-সহস্র জলজ রঙিন প্রাণ। আর নদী থাকলে সেখানে থাকবে নদী সিকস্তী গ্রাম ও সেইসব গ্রামের মানুষ। তাদের উত্থান-পতনের কাহিনি। জীবনের বহুবিধ পর্যায়ে ভাঙা-গড়া, প্রেম ও প্রণয় আর সমূলে নিঃশেষ হওয়ার কথা। নদী তার মানুষদের জীবন-জীবিকা ও শিল্প-সংস্কৃতিজুড়ে প্রভাব বিস্তার করে বয়ে চলে, চলবেও চিরকাল। একসময় এই নদী হয়ে ওঠে মানুষের পরিচয়।
প্রত্যেক কবির একটি নিজস্ব নদী থাকে। সম্ভবত থাকতেও হয়। কবি শামীম রেজার নদী হলো এই বিষখালি। কীর্তনখোলাও তাঁর নিজস্ব নদীসমূহের তালিকাভুক্ত। ফলে তাঁর একেবারে শুরুর দিকের কাব্যগ্রন্থ পাথরচিত্রে নদীকথায় (২০০১) তাঁর সমস্ত কথাবার্তা হয়ে উঠেছে নদীগামী। নদীর পুরুষের এই কাব্যে পৌরাণিক বধূসরা থেকে উৎসারিত হয়ে নদী নেমে এসেছে এই বিষখালিতে। এই নদীই কবির চিরসুখের সারথি, চিরদুঃখের দীর্ঘশ্বাসের নদী। কবি এই নদীর কাছে নিজের জীবন-প্রাণ সঁপে ক্ষ্যান্ত হন, তাঁর এমন দশা হয় যে—বিলীন হওয়ার পর যেন হারাবার কিছু নেই আর। যা ছিল সবটুকু হারিয়ে বিপাকে কবি। তিনি লেখেন:
ও পরানী দেখেছো কি? মধুরার মাঠে বসে তুমি নির্জন
সাঁকোর শরীর এলিয়ে আমি
কলমি শাবক
কীভাবে ভেসে আছি নদীজলে, অবলা অমোঘ (পরানী ও মথুরার মাঠ)
নদী কবির একমাত্র ঠাঁই, শেষ আশ্রয়। যার প্রশ্রয়ে, যার ঘোলা জলে কবি বেড়ে ওঠেন। বেড়ে উঠতে উঠতে কবি উপলব্ধি করেন, তাঁর ‘নদীর দু’পার ভেঙে অথই পানি বাঁধহীন জল’ ঢুকে পড়েছে তাঁর সমস্ত ঘরে, উঠোনজুড়ে। পুরো কাব্যগ্রন্থজুড়ে নদী শতব্যঞ্জনায়, কলকল ধ্বনিতে উপলব্ধ হয় কবির দুয়ারে। সীমাহীন আলো নিয়ে হাজির নদী। কবিমাত্রই তো ভোরের পিয়াসী, অন্ধকারবিনাশী। কবি দেখছেন, ‘যেখানে নদী টানা ধনুক ধরনে বেঁকেছে সেখানে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই রাত ঘোমটা খুলেছে উদার শুভ্রতায়।’ কিছু পূর্বে একই কাব্যগ্রন্থে তিনি চালতাপাতা ভোরের কথা বলেছিলেন, দোলনচাঁপা চোখের সঙ্গিনী কবিতায় এসে তিনি সেই ভোরকে যেন খুঁজে পেলেন। যে নদীর কোলে ও কূলে কবির জন্ম সেই নদীই তার জীবনের প্রধানতম অনুষঙ্গ হয়ে রইলো। পৃথিবীর তাবৎ নদীতে তিনি নিজের চেনাজানা নদীকেই খুঁজে পেলেন, যেন এসকল নদীর নাম দিতে গিয়েও তিনি পরিচিত নামকেই প্রাধান্য দিলেন—‘কেউ বিষখালী, আবার কেউবা কীর্তনখোলা নদী।’
ঘুরেফিরে এই নদী কবি শামীম রেজার কাব্যগ্রন্থে সুর তুলেছে, কবি অনায়াসে বলে গেছেন তাঁর চেনা নদী, মানুষ ও পুরাণের চেনা ভূবনের একের পর এক নতুন গল্প। নদীর দীর্ঘশ্বাস কবির জীবনকে গভীরভাবে স্পর্শ করে গেছে আশৈশব। নয়তো যৌবনে পা রেখে কবি কেন অভিসার রাত্রি থেকে সরাসরি ভাঙনের সুর কণ্ঠে তুললেন, যন্ত্রণার কথা বলতে গেলেন—
ভাঙনের নদী আমি গিরিষি রাত্রিরে…প্রতীক্ষায় থাকি
নাইয়র তুমি কবে গয়না নাওয়ে যাবে অভিসার?
গাঙে আমার আউলা স্রোত, শোকযাত্রায় কাটাবে (ভাঙনের নিত্য আয়োজন)
অভিসারের পরক্ষণে একই কাব্যগ্রন্থের এগারো সংখ্যক কবিতা কীর্তনিয়া নদী কীর্তনখোলায় তাঁর উচ্চারণ:
আমি কি কীর্তনিয়া নদী কীর্তনখোলা
যিনি প্রতিদিন পায় ভাঙনের হাজারটা সমন?
যে নদীর কারণে সর্বস্বান্ত মানুষ, সেই নদীর কথা বলতেও তিনি মানুষকে ভোলেননি। বলেছেন সর্বহারা মানুষের কথা, নদীর মানুষ হওয়া সত্ত্বেও জটিল বাস্তবতায় রোজ ঘূর্ণায়মান তাদের জীবন। যেখানে স্রোতজলে কোনো খেলা জমে উঠে না। কবির ভাষ্যে:
এখানে নদীর বুকে কুয়াশা কুণ্ডলী নৃত্যে হাসে
জটলার জলসায়
নিরন্ন সময় জাবর কেটে কেটে ক্লান্ত সর্বস্বান্ত মানুষ। (চন্দ্রদ্বীপের পান্থ পুরাণ)
নদী কবির সামগ্রিক কাব্যিক চেতনায় আস্তরণ ফেলে যায় ক্রমাগত। জোয়ার তাকে ভাসিয়ে নেয়, ভাটির টান তাঁর ভিতরে নানা আশঙ্কার জন্ম দেয়। আগমনী ঝড়ের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন কবি হৃদয়। এ যেন অগ্রজ কবিকুলের অনুসরণ। বিশেষত তিনি যখন বলেন, ‘জলশঙ্খিনী সাপ নিঃশ্বাস ভয়েই কুঁকড়ে থাকো।’ উজান গাঙে জলের ভাঙনের আওয়াজ শুনতে পান কবি।
থানকুনি শরীর ছুঁয়ে ভোরেরচোখ জ্বলে না এখন
জ্বলে কি প্রতীতি পুরাণ?
মনু চাষার ডুবে যাওয়া একটুকরো আবাদি জমি
গেয়ে চলে ভাঙনের গান
[…] চারদিকে উড়ে ঢোলকলমি বিবর্ণফুল
শেষপর্যন্ত কবি যেন সিদ্ধান্তে পৌঁছান, কবি মনে করেন, ‘দীর্ঘশ্বাস স্থায়ী হলে বিলোড়িত অন্ধকার গাঢ় হয়ে নামে।’ এটি ভবিষ্যতের প্রতি কবির প্রফেসিও। সতর্কবার্তা তো বটেই। অন্ধকার আর ভাঙনের কবল থেকে মুক্তি ছাড়া যে মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা আসে না তা কবিমাত্রই জ্ঞাত। অন্ধকার থেকে মুক্তি তাই কবির পরম আরাধ্য। দুর্দিন বিলোপের আশায় কবির সতর্ক পদক্ষেপ এই কবিতা, এই কাব্য।
বাংলাদেশের বহুবিস্তৃত নদীর রূপরেখার মতই তার কবিতার বিস্তার। তাঁর পাথরচিত্রে নদীকথা। কাব্যগ্রন্থটি ২০০১ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত। কবির প্রথম যৌবনের রচনা। কবিতার খাতায় তিনি যা লেখেন, আদতে যেন তিনি তার চারিপাশে তাই দেখেন। বিষখালি আর কীর্তনখোলা তাঁর মনন আচ্ছন্ন করে সকাল-সন্ধ্যায়। পাথরচিত্রে নদীর সংলাপ না লিখে উপায়হীন কবি আর কি করতে পারেন তবে? ভাষা প্রয়োগ, উপমা ও রূপকের ব্যবহারে তিনি সদা সজাগ, সচেতন, উদ্যমী আর উপকূলসংলগ্ন। দক্ষিণবঙ্গে প্রচলিত ভাষাকে তিনি কাব্যরূপ দিয়েছেন বিপুল উৎসাহে। পাথরচিত্রে নদীকথার পরে প্রকাশিত নালন্দা দূর বিশ্বের মেয়ে (২০০৪), যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে (২০০৬), ব্রক্ষ্মাণ্ডের ইসকুল (২০০৯), হৃদয়লিপি (২০১৪) এবং দেশহীন মানুষের দেশ (২০১৮) কাব্যগ্রন্থেও তাঁর বহুবিধ বিষয়ে বিপুল উৎসাহ ও বাসনার সন্ধান লভ্য।



