মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাং ও চাঁদাবাজির রাজত্ব: আতঙ্কে দিন কাটে বাসিন্দাদের

রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকা এখন সাধারণ মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নাম। বছরের পর বছর ধরে ছিনতাই, চাঁদাবাজি আর কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যে এখানকার জনজীবন অতিষ্ঠ। সম্প্রতি আদাবরে চাঁদাবাজির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীদের দোকানপাট বন্ধ রাখা এবং থানা ঘেরাওয়ের ঘটনায় এলাকার নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আবারও সামনে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং পুলিশের নির্লিপ্ততাই এই অপরাধ প্রবণতা বাড়ার প্রধান কারণ।
মোহাম্মদপুরের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি, সবখানেই ওঁত পেতে থাকে ছিনতাইকারীরা। বিশেষ করে রিকশাযাত্রী, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীরা এদের প্রধান টার্গেট। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছুটির সময়ে মোবাইল, ব্যাগ ও ল্যাপটপ ছিনতাইয়ের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে। এমনকি রাইড শেয়ারিং চালকরাও এখন নিরাপত্তার অভাবে মোহাম্মদপুর এলাকায় যেতে অনীহা প্রকাশ করছেন। পুলিশের তথ্যমতে, সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টার মধ্যে ছিনতাইয়ের হার সবচেয়ে বেশি।
অপরদিকে চাঁদাবাজদের উৎপাতও এই এলাকায় অসহনীয়। স্থানীয় বাজার, ফুটপাতের দোকান, গ্যারেজ ও নির্মাণাধীন ভবনে নিয়মিত, সাপ্তাহিক, মাসিক কিংবা এককালীন চাঁদা দাবির অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীরা এ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতেও চান না। কারণ অভিযোগ ও প্রতিবাদ করলে ভয়ভীতি ও হামলার ঝুঁকি বাড়ে। জীবনের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ে।
ছিনতাই-চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হয় কিশোর গ্যাংকে। স্কুল-কলেজপড়ুয়া কিশোরদের বখে যাওয়া একাংশ ‘এলাকাভিত্তিক’ গ্যাং বানিয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালায়। ছিন্নমূল ও বস্তির বাসিন্দা অনেক কিশোর এসব গ্যাং ব্যবহার হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শক্তি প্রদর্শন, মোটরবাইক শোডাউন, মারামারি, এসব দিয়ে শুরু হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা ছিনতাই ও মাদক ব্যবসার দিকে গড়ায়। ঢাকা মহানগর পুলিশের খাতায়ও মোহাম্মদপুর অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। সন্ধ্যার পর থেকে রাত ১২টার মধ্যে ছিনতাইয়ের হার তুলনামূলক বেশি। যখন সাধারণ মানুষ ঘরে ফেরেন। কিশোর গ্যাং সম্পৃক্ত ঘটনায় গ্রেফতারকৃতদের বড় অংশের বয়স ১৪ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে।
মোহাম্মদপুর এলাকায় ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডব বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয়রা উদ্বেগ প্রকাশ করে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিকবার মিছিল সমাবেশ করেছেন। তারা বলছেন, এই এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একেবারেই ভেঙে পড়েছে। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ইশতিয়াক সজীবেরও একই ভাষ্য। তিনি বলেন, ‘‘এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই নাজুক। অলিতে-গলিতে ছিনতাই ও কিশোর গ্যাং সদস্যরা ধারালো ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা করছে। কিন্তু পুলিশের ভূমিকা খুবই নগণ্য।’’
আরেক বাসিন্দা ইসমাইল পাটোয়ারী বলেন, ‘‘অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশের কাছ থেকে কোনও ধরনের সহায়তা পাওয়া যায় না। কিশোর গ্যাং বা ছিনতাইকারীরা হামলা করলে পুলিশ কোনও প্রতিরোধ করে না। কোনও ঘটনা সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচিত হলেই কেবল কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা অ্যাকশনে যায়।’’
চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে সর্বশেষ গত ২১ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদপুর এলাকার আদাবর থানা ঘেরাও করেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও জনতা। বসিলা, চাঁদ উদ্যান ও আদাবর এলাকায় চাঁদাবাজি ও গণছিনতাই প্রতিরোধের দাবি তুলে তারা থানা ঘেরাওয়ের পাশাপাশি সড়ক অবরোধ করেন। চাঁদার দাবিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় একটি এমব্রয়ডারি কারখানায় চাঁদাবাজদের হামলা ও দুই শ্রমিককে কুপিয়ে আহত করার পর ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। ব্যবসায়ীদের দাবি, স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় কিশোর গ্যাং সদস্যরা দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক ভিত্তিতে চাঁদ উদ্যান, বসিলাসহ বিভিন্ন মার্কেটের দোকান ও কারখানা থেকে চাঁদা তুলছে।
স্থানীয় এমব্রয়ডারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রায়হান জহিরের ভাতিজা মারুফ হাসান সুমন বলেন, তার চাচার কারখানায় আকস্মিকভাবে কয়েকজন কিশোর গ্যাং সদস্য চাঁদা দাবি করে হামলা চালায়। তার দাবি, স্থানীয় কিশোর গ্যাং সদস্য কালা রাসেল ঈদ উপলক্ষে চাঁদা দাবি করে। তা দিতে অস্বীকৃতি জানানো হলে সন্ধ্যায় রাসেলের নেতৃত্বে ৮ থেকে ১০ জন কারখানায় হামলা চালায়। এ সময় দুই শ্রমিককে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়।
ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের থানা ঘেরাও, বিক্ষোভ ও রাস্তা অবরোধের একদিন পর ২২ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ ফারুক ওরফে কালা ফারুককে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে তাকে নিয়ে এলাকায় চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে মাইকিং করে পুলিশ। মোহাম্মদপুরের বসিলা সিটি হাউজিং ও বসিলা ৪০ ফিট এলাকায় একাধিক ব্যবসায়ীকে চাঁদার দাবিতে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন, ‘‘মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ। এ এলাকায় জেনেভা ক্যাম্প ছাড়াও বস্তি ও নিম্ন আয়ের বিপুল জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। দারিদ্র্য, পারিবারিক অস্থিতিশীলতাসহ নানা কারণে কিশোর-তরুণদের অপরাধে টেনে নেয়। তাছাড়া মাদক চক্রের প্রভাব রয়েছে। ইয়াবা ও গাঁজাভিত্তিক ছোট চক্রগুলো কিশোরদের বাহক হিসেবে ব্যবহার করে। মাদক ও অপরাধের এই যোগসূত্র ভাঙা না গেলে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তারা স্থানীয় প্রভাবশালীদের আশ্রয়ে থাকে। ফলে ভুক্তভোগীরা মামলা করতেও নিরুৎসাহিত হন। ফলে ছোট ছোট অপরাধ একপর্যায়ে বড় অপরাধী নেটওয়ার্কে রূপ নেয়।’’
এলাকার অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদপুর থানার ওসি মেজবাহ উদ্দিন বলেন, ‘‘বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ধারাবাহিক অভিযান জোরদার করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’’ আদাবর থানার ওসি জিয়াউর রহমান বলেন, ‘‘কিশোর গ্যাংসহ সব ধরনের অপরাধী গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অনেককেই এরই মধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। টহল ও অভিযান বাড়ানো হয়েছে। মাদক ও কিশোর গ্যাং দমনে বিশেষ তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।’’
রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকাকে দীর্ঘদিনের ‘অপরাধপ্রবণ’ অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) মো. আলী হোসেন ফকির বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ১৯৮৬ সালে তিনি নিজেও সেখানে ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছিলেন। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা সরেজমিন পরিদর্শনের সময় মোহাম্মদপুর এলাকায় গিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘‘মোহাম্মদপুর এলাকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নজরদারি ও অভিযান জোরদার করা হয়েছে। কিশোর গ্যাং, ছিনতাই ও মাদকবিরোধী টহল অব্যাহত রয়েছে। ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করা, মহাসড়ক নিরাপদ রাখা এবং হোয়াইট-কালার অপরাধীদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’ আইজিপি আশা প্রকাশ করেন, পুলিশি তৎপরতায় পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বুধবার (৪ মার্চ) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, চাঁদাবাজ ও অস্ত্রধারী আসামিদের বিরুদ্ধে সারা দেশে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হবে। এ অভিযান ঢাকা থেকে শুরু হবে। সারা দেশেই চাঁদাবাজ ও অস্ত্রধারী দাগী আসামিদের তালিকা করা হচ্ছে। সেই তালিকার ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।



