ঋণ খারাপ হওয়ার আগেই প্রভিশন রাখার নীতি নিয়ে বিএবি’র উদ্বেগ

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন করে চালু হতে যাওয়া আগাম প্রভিশনিং নীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালকরা। একইসঙ্গে মূলধন বা প্রভিশন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তাদের বোনাস দেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান কড়াকড়ি শিথিল করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে আলোচনা করতে বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যানদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)–এর একটি প্রতিনিধি দল সোমবার (৯ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক করে। বৈঠকে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, তদারকি জোরদার এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করেন গভর্নর।
বৈঠকে উপস্থিত একজন কর্মকর্তা জানান, ব্যাংকগুলোর মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতির প্রেক্ষাপটে কর্মকর্তাদের বোনাস প্রদানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিদ্যমান বিধিনিষেধ শিথিল করার অনুরোধ জানায় বিএবি। তাদের যুক্তি, সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে কর্মকর্তাদের উৎসাহ ও মনোবল ধরে রাখা জরুরি। বোনাস ও অন্যান্য সুবিধা বন্ধ থাকলে ব্যাংক পরিচালনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
আগাম প্রভিশনিং নীতি নিয়ে উদ্বেগ
দেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক প্রতিবেদনের মান আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘প্রত্যাশিত ঋণ ক্ষতি’ বা ইসিএল পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এ ব্যবস্থা চালু হবে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান আইএফআরএস-৯ অনুযায়ী।
এই নীতির আওতায় কোনও ঋণ খারাপ হওয়ার আগেই সম্ভাব্য ক্ষতির কথা বিবেচনা করে ব্যাংকগুলোকে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, নতুন এ পদ্ধতি ২০২৮ সাল থেকে কার্যকর হবে।
তবে বিএবির পক্ষ থেকে বলা হয়, বর্তমানে অনেক ব্যাংকই মূলধন ও প্রভিশন সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে আবার আগাম প্রভিশনিং বাধ্যতামূলক হলে ব্যাংকগুলোর ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব ঋণ দীর্ঘমেয়াদে পুনঃতফসিল করা হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রেও নতুন করে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হলে তা বাস্তবায়ন অনেক ব্যাংকের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করেন উদ্যোক্তা পরিচালকরা।
বৈঠকে উপস্থিত এক চেয়ারম্যান বলেন, ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে একটি লিখিত প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক উদাহরণ তুলে ধরে নীতিটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেশের বাস্তবতা বিবেচনার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ নিয়েও আলোচনা
বৈঠকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ব্যাংক কোম্পানি আইনে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ সংক্রান্ত সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিএবি নেতারা। তাদের মতে, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর কার্যকর পরিচালনায় উদ্যোক্তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। তাই স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনা কাঠামোর ভারসাম্য রক্ষা করা প্রয়োজন।
নিয়মিত সংলাপের ওপর গুরুত্ব
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিএবির চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা ও সমন্বয় থাকলে নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো আরও বাস্তবসম্মতভাবে নেওয়া সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে রক্ষা করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। গভর্নর বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অবস্থান সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন।
আইএফআরএস-৯ অনুযায়ী আগাম প্রভিশনিং নীতি সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত একটি ব্যবস্থা এবং নতুন কিছু নয়। তবে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের কাঠামো ও সক্ষমতা বিবেচনায় এটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়টি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং আর্থিক প্রতিবেদনের মান উন্নত করার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে নতুন নীতি গ্রহণ করছে, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়ার ওপরই এখন গুরুত্ব দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো।



