মোজতবা খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা বানিয়ে কী বার্তা দিলো ইরান?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যেই নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির নাম ঘোষণা করেছে ইরান। নিহত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির স্থলাভিষিক্ত হলেন তার ৫৬ বছর বয়সী এই সন্তান। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মোজতবার এই উত্থান তেহরানের পক্ষ থেকে একটি কঠোর বার্তা। আর তা হলো, তারা পিছু হটবে না এবং শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ খবর জানিয়েছে।
মোজতবা খামেনির এই নিয়োগ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ট্রাম্প গত সপ্তাহে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে বলেছিলেন, খামেনির ছেলে আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু ইরান সেই দাবি উপেক্ষা করে দেশটির শীর্ষ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পদে মোজতবাকেই বসালো।
মোজতবা খামেনি দীর্ঘকাল ধরে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। তার এই নিয়োগ প্রমাণ করে যে, ইরানকে নতিস্বীকার করতে বাধ্য করার যে চেষ্টা ট্রাম্প চালিয়েছিলেন, তা এখন পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। এর মাধ্যমে ইরানের শাসনব্যবস্থায় কট্টরপন্থিদের নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত হলো এবং সংস্কার বা মধ্যপন্থিরা কোণঠাসা হয়ে পড়লেন।
চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ওয়াকিল বলেন, মোজতবার উত্থান একই পুরোনো কৌশলের ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত দেয়: দেশে দমন-পীড়ন আর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিরোধ।
নিয়োগের পরপরই রেভল্যুশনারি গার্ড ও ইরানি সেনাবাহিনী নতুন নেতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, নিয়োগের পর পরই ইসরায়েলে একঝাঁক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান। এদিকে ইসরায়েল রবিবার ঘোষণা করেছে যে, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে যে-ই দায়িত্ব নিন না কেন, তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
মোজতবা খামেনি এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিলেন যখন তার ব্যক্তিগত জীবনও যুদ্ধের ক্ষতবিক্ষত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অভিযানে বাবা আলী খামেনির পাশাপাশি তিনি মা, স্ত্রী ও এক সন্তানকেও হারিয়েছেন।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এটিই প্রথম বংশগত ক্ষমতার হস্তান্তর। বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতা রুহুল্লাহ খোমেনি এবং পরবর্তী নেতা আলী খামেনি, উভয়ই বংশপরম্পরায় ক্ষমতা হস্তান্তরের বিরোধী ছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান বিশ্বের কাছে বার্তা দিতে চাইছে যে, শত প্রতিকূলতার মাঝেও তাদের শাসনব্যবস্থা সচল।
ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী লারিজানি বলেন, মোজতবা খামেনি ‘নেতৃত্বের পাঠশালা’য় বড় হয়েছেন। বাবার শিক্ষাই তাকে দেশ পরিচালনায় সহায়তা করবে।
মোজতবা খামেনি এতদিন জনসম্মুখের আড়ালে থাকতেই পছন্দ করতেন। ১৯৬৯ সালে মাশহাদে জন্ম নেওয়া মোজতবা ১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে তার তৈরি হওয়া সম্পর্কগুলোই পরবর্তীতে তাকে নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ কর্তাদের ঘনিষ্ঠ করে তোলে। ২০০৯ সালের গ্রিন মুভমেন্ট দমনেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে জানা যায়। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
৯ কোটি মানুষের দেশ ইরান বর্তমানে গভীর অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত। এর ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্রমাগত হামলা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক মোজতবার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে বিমানবন্দরের মতো অবকাঠামোয় হামলার কারণে প্রতিবেশীরাও ক্ষুব্ধ।
চ্যাটানুগার টেনিসি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরান নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ সাঈদ গোলকার বলেন, বিপুল অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চাপ সত্ত্বেও এই ব্যবস্থা নিজেকে সংস্কার করতে পারছে না। শেষ পর্যন্ত তারা আরও একজন খামেনিকেই খুঁজে বের করলো।



