পেটানোর অপসংস্কৃতি বন্ধ হবে কবে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাকে তাকে পেটানোর এই অপসংস্কৃতি, এই বর্বরতা কবে বন্ধ হবে? রবিবার (৮ মার্চ) রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের এক ছাত্র রাহিদ খান পাভেলকে নির্মমভাবে পিটিয়ে আহত করে শাহবাগ থানায় রেখে আসা হয়। আহত ওই ছাত্র অভিযোগ করেছেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা তাকে মারধর করেছেন।
ঘটনার সূত্রপাত বুয়েটে। সেখানে সেহেরি খাচ্ছিলেন পাভেল। সেখানে গিয়ে ১৫-২০ জন প্রথম দফায় বুয়েটের নজরুল হলের ক্যাফেটেরিয়াতেই মারধর করে। এরপর তারা পাভেলকে বুয়েটের গেটে এনে পুনরায় মারধর করে। সেখান থেকে তুলে নিয়ে এসে এসএম হলের সামনে একবার ও ভিসি চত্বরে আরেকবার মারধর করা হয়। ভিসি থেকে রাজু ভাস্কর্যে নিয়ে আরও এক দফায় মারধর। পরে, শাহবাগ থানার সামনে আবারও ব্যাপক মারধর করা হয় পাভেলকে। পুলিশ গিয়ে তাকে রেসকিউ না করলে হয়তো মারাও যেতে পারতো সে। মারধরের পরে পাভেলের অবস্থা বেগতিক হওয়ায়, শাহবাগ থানার ভেতরে গাছের তলায় আধমরা অবস্থায় ফেলে রেখে সেখান থেকে সটকে পড়ে ওই ব্যক্তিরা।
রাহিদকে কিল ঘুষির পাশাপাশি, বাইকের শেকল ও তালা দিয়ে পেটানো হয়েছে, তার হাতের আঙুলগুলো থেতলে দেওয়া হয়েছে। পায়েও উপর্যুপরি আঘাতের ফলে সে ঠিকভাবে হাঁটতে পারছে না। বেশিরভাগ কিল ঘুষিই মারা হয়েছে চোখ বরাবর। মারধরের পর মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ ও বাইকের চাবি ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।
পাভেল আজ সোমবার ভোরে শাহবাগ থানায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওরা আমার মাথায়, হাতে, পুরো শরীরে ইট, বেল্ট, মোটরসাইকেলের লক দিয়ে মেরেছে। শুরুতে এসএম হলের সামনে, এরপর ভিসি চত্বরের সামনে রিকশা থেকে নামিয়ে মেরেছে। কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির সামনে এবং শাহবাগ থানার সামনে আমাকে ফেলে যাচ্ছেতাইভাবে মেরেছে। থানার ভেতর যখন ওরা আমাকে মেরেছে, তখন পুলিশ আমাকে সেভ করেছে।’
কিন্তু কী অভিযোগে তাকে মারা হলো? ঘটনার সময় উপস্থিত থাকা হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হল সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক ও জাতীয় ছাত্রশক্তির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সাইফুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘‘রাহিদ ছাত্রলীগ করতো। জুলাই আন্দোলনে হামলাকারী ছিল। ক্যাম্পাসে আর আসবে না, এ শর্তে রাহিদের মা-বাবা তাকে নিয়ে গিয়েছিল। এখন ক্যাম্পাসে এসে সাবেক ছাত্রলীগারদের নিয়ে ইফতার মাহফিল করে। আজকে ওকে ধরার পর ফোন চেক করতে গেলে, উল্টো সে রিঅ্যাক্ট করে। পরে আটক করে থানায় দেওয়া হয়েছে।’
আচ্ছা আপনারা বৈষম্যবিরোধী লোকজন না আরেকজন মোবাইল চেক করার বিরোধী ছিলেন। আজকে কেন নিজেরা সেই কাজগুলো করছেন? আর ছাত্রলীগ করলেই কাউকে পেটাতে হবে? আর যাকে পেটালেন সেই রাহিদ পাভেল ছাত্রলীগের কোনও কমিটিতে ছিলেন কিনা, সেটা কেন বলতে পারছেন না?
অপরদিকে রাহিদ বলেন, ‘‘আমি কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত না। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থী। নিয়মিত ক্লাস করি। চাইলে দর্শন বিভাগের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে দেখতে পারেন।’’
আহত রাহিদ পাভেলকে পুলিশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছে। শাহবাগ থানার পরিদর্শক (অপারেশনস) খোকন মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘‘তাকে অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যালে আমরা ভর্তি করেছি, চিকিৎসা চলছে।’’ রাহিদের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ দেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে খোকন মিয়া বলেন, ‘‘এখনও পর্যন্ত কেউ অভিযোগ দেয়নি। ‘আইনি প্রক্রিয়া’ চলছে।’’
এই মবের সংস্কৃতি বন্ধ হবে কবে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, এখানকার শিক্ষক, সব শিক্ষার্থী এবং সরকারের সব নীতি নির্ধারকদের কাছে আমার প্রশ্ন— বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র যিনি ছাত্রলীগের কোনও পদে ছিল কিনা, কেউ বলতে পারেন না, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র তাকে এমন নির্মমভাবে পেটাতে হবে কেন? কোন আইনে তাকে পেটানো হয়? যারা পেটায় তাদের বিরুদ্ধে কেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ব্যাবস্থা নেয় না? এগুলো বন্ধ হবে কবে?
এই কথাগুলো আমি অতীতেও লিখেছি। জুলাই আন্দোলন চলাকালে যখন সাধারণ ছাত্ররা মার খায় আমি লিখেছি— নেতাদের খুশি করতে, ছোটখাটো পদ-পদবী পেতে কিংবা আরেও ছোটকিছু যেমন- মধুর কেন্টিনে এককাপ চা কিংবা হলে একবেলা খাবার কিংবা অন্য যেকোনও প্রত্যাশায় সাধারণ ছেলেমেয়েদের যারা পেটান, রক্তাক্ত করেন— এমনকি হাসপাতালে গিয়েও পেটাতে দ্বিধা করেন না তারা। একটু নিজেদের বোধকে জাগ্রত করুন। ছেলে-মেয়েদের রক্তাক্ত মুখ হয়তো আপনাদের বোধ জাগ্রত করে না, কিন্তু আপনাদের আগে যারা এসব কাজ করেছেন, তাদের পরিণতি একটু খোঁজ নিন।
গত দুই যুগ ধরে দেখছি, অন্যকে পেটানো এই ছেলেগুলোর জীবনের পরিণতি ভয়াবহ! কাজেই নিজেদের বাবা-মায়ের কথা ভাবুন। স্বজনদের কথা ভাবুন। মনে রাখবেন, যে যত ধান্দা বা আদর্শের কথা বলুক, লাঠিসোটা হাতে সাধারণ ছেলেমেয়েদের পিটিয়ে রক্তাক্ত করতে যদি আপনার হাত না কাঁপে, আপনার বোধ জাগ্রত না হয়, অন্যের প্রতি যদি শ্রদ্ধা আর সহমর্মিতা দেখাতে না পারেন— দিন শেষে আপনি এবং আপনারা সবাই নিক্ষিপ্ত হবেন আস্তাকুঁড়ে।
এখনও এই কথাগুলোই বলছি। অতীতেও আমার চোখের সামনে কেউ মার খেলে আমি প্রতিবাদ করেছি। বাংলাদেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে ঘুরে সাধারণ ছাত্র হত্যা আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে লিখেছি। শুধু সাংবাদিকতা নয় বাস্তব জীবনে কেউ আহত হয়ে পড়ে থাকলে, হোক সে শিবির কিংবা ছাত্রদল তাকেও হাসপাতালে নিয়েছি। কারণ আমার কাছে সবার ওপরে মানুষ। আর দেশের সবচেয়ে প্রাচীন আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেখান থেকে মূল্যবোধস্পন্ন মানুষ তৈরি হওয়ার কথা, তারা যদি এই কাজগুলো করেন, সেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মানুষ তৈরি হবে কী করে?
এর আগে গতকাল দেখেছি মার্চের ভাষণ বাজানোর ঘটনায় ছাত্রলীগের দুই নেতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল সংসদের সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমির ওপর হামলা নিপীড়ন হয়েছে। এরপর সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় তাদের গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আচ্ছা সন্ত্রাস করছে কারা আর জেলে যাচ্ছে কারা?
মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী! এইসব মব বন্ধ করার উদ্যোগ নিন! কারণ এগুলো ফ্যাসিজমের চর্চা। মব, হামলার এই নোংরা চর্চা যদি বন্ধ না হয়, এই বিশ্ববিদ্যালয় এগোবে না, এই দেশ আগাবে না। কাজেই আপনারা যারা অন্যকে পিটিয়ে আহত বা রক্তাক্ত করেন, তাও রোজার সময় এবং এমন কাজে যদি আপনার হাত না কাঁপে, বোধ জাগ্রত না হয়— তাহলে মনে রাখবেন, আপনার জন্য কল্যাণকর কিছু অপেক্ষা করছে না। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রশাসন এবং সরকারকেও এই ঘটনাগুলোর দায় নিতে হবে। যেকোনও মূল্যে মবের এই সংষ্কৃতি বন্ধ করতে হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে বিবেকবোধ দিন! মানবিক বোধ দিন! এই বোধ ছাড়া সব অর্থহীন!
লেখক: কলামিস্ট



