Uncategorized

জঙ্গল সলিমপুরে হেলিকপ্টার নিয়ে সাঁড়াশি অভিযান: অস্ত্র-বিস্ফোরকসহ আটক ১২

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের ধরতে তিনটি হেলিকপ্টার নিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এ অভিযানে অংশ নেন তিন হাজার ১৮৩ জন যৌথ বাহিনীর সদস্য। অভিযানে অস্ত্র-বিস্ফোরকসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার এবং ১২ জনকে আটক করা হয়েছে। একইসঙ্গে ওই এলাকায় দুটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি সেখানে স্থাপন করা হবে র‌্যাবের একটি ক্যাম্পও।

সোমবার (০৯ মার্চ) সন্ধ্যা ৭টার দিকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এসব তথ্য জানিয়েছেন চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি ও শিল্পাঞ্চল) মো. রাসেল। এর আগে ভোর ৬টা থেকে সীতাকুণ্ড মডেল থানাধীন জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।

অভিযানে গিয়ে শুরুতে প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ে যৌথ বাহিনী। কোথাও রাস্তার ওপর রাখা হয়েছে বড় ট্রাক। কোথাও আবার ভেঙে ফেলা হয়েছে কালভার্ট। নালার স্ল্যাবও তুলে ফেলা হয়েছে একটি স্থানে। এতে নানা স্থানে বাধার মুখে পড়ে যৌথ বাহিনী। সেগুলোর মধ্য দিয়ে অভিযান চালানো হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের ধারণা, অভিযানের খবর আগেই পেয়েছে জঙ্গল সলিমপুরের সন্ত্রাসীদের একটি অংশ। তাই গতকাল রাতেই প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে সন্ত্রাসীরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ি যাতে ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য কালভার্ট ভেঙে ফেলা হয়। রাস্তার ওপর ট্রাক রেখে সড়কে যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। একটি নালার স্ল্যাবও তুলে ফেলা হয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, অবৈধ অস্ত্র মজুত, পাহাড় কেটে প্লট বিক্রি, অপরাধীদের আশ্রয়স্থল তৈরি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে যৌথ বাহিনীর এই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়।

অভিযানে অংশ নেয় তিন হাজার ১৮৩ সদস্য

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ জানায়, অভিযানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৪৮৭ জন সদস্য, জেলা পুলিশের ১৪৬ জন সদস্য, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ৮০০ জন সদস্য, আরআরএফ চট্টগ্রামের ৪০০ জন সদস্য, ফেনী জেলা পুলিশের ১০০ জন সদস্য, পার্বত্য জেলার ৩০০ জন সদস্য, এপিবিএনের ৩৩০ জন সদস্য, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ১২২ জন সদস্য এবং র‌্যাবের ৩৭১ জন সদস্যসহ ৩ হাজার ১৮৩ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য অংশ নেন। এ ছাড়া সাত জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অভিযান কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করেন।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (শিল্পাঞ্চল ও ডিবি) মো. রাসেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুর এলাকার বিভিন্ন পাহাড়ি ও দুর্গম স্থানে চিরুনি তল্লাশি চালানো হয়েছে। অস্ত্রসহ ১২ জনকে আটক করা হয়।’

আকাশে ছিল ৩ হেলিকপ্টার ও ১২ ড্রোন

অভিযানকে কার্যকর করতে তিনটি হেলিকপ্টার, ১৫টি এপিসি (আর্মড পার্সোনেল ক্যারিয়ার), র‌্যাব ও সিএমপির তিনটি ডগ স্কোয়াড এবং ১২টি ড্রোন ব্যবহার করা হয়। চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আহসান হাবীব পলাশের নেতৃত্বে অভিযানটি পরিচালিত হয়। এ সময় অতিরিক্ত ডিআইজি মো. নাজিমুল হক এবং চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খান সরেজমিনে উপস্থিত থেকে অভিযান তদারকি করেন।

১২ জন আটক

যৌথ বাহিনীর সদস্যরা জঙ্গল সলিমপুর এলাকার বিভিন্ন পাহাড়ি ও দুর্গম স্থানে একযোগে অবস্থান নিয়ে অভিযান চালান। সন্দেহভাজন আস্তানা, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি, পাহাড়ি পথ, গোপন স্থাপনা এবং অপরাধীদের সম্ভাব্য অবস্থানসমূহে তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ১২ জনকে আটক করেন।

অস্ত্র উদ্ধার 

অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র দুটি (পিস্তল একটি ও এলজি একটি), কার্তুজ চারটি, ককটেল (বিস্ফোরক) ১১টি, দেশীয় অস্ত্র ১৭টি, সিসি ক্যামেরা ১৯টি, ডিভিআর দুটি, পাওয়ার বক্স একটি ও বাইনোকুলার দুটি উদ্ধার করা হয়।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, উদ্ধার হওয়া এসব সরঞ্জাম সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা, এলাকায় নজরদারি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের কাজে ব্যবহার করা হতো। অভিযান চলাকালে কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি এবং পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আছে। অভিযান শেষে জঙ্গল সলিমপুর ছিন্নমূল ও আলীনগর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং অপরাধীদের পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতিক্রমে দুটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।

জঙ্গল সলিমপুর প্রশাসনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে: ডিআইজি

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আহসান হাবীব পলাশ বলেন, ‘আমাদের অভিযান চলমান। অভিযানে র‍্যাব, পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও এপিবিএনের তিন হাজার ১৮৩ জন সদস্য অংশ নিয়েছেন। আমাদের মূল ফোকাস ছিল এই বিশাল অংশে আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং আমরা সেটি করতে পেরেছি। আজ থেকে পুলিশ ও র‍্যাবের দুটি ক্যাম্প এখানে কাজ করবে। ক্যাম্পের নিরাপত্তা বিধানে যদি এখানে কামান দেওয়া লাগে, আমরা কামান দেবো। দীর্ঘদিনের আলোচিত জঙ্গল সলিমপুরে অবশেষে প্রশাসনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলো। অভিযান সফল হয়েছে। কয়েকজনকে আটকের পাশাপাশি কিছু অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।’

চট্টগ্রাম নগরের প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর পাহাড়ি এলাকাজুড়ে জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান। বায়েজিদ বোস্তামী থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটি। এর বিপরীতে লিংক রোডের উত্তর পাশে ৩ হাজার ১০০ একর জায়গায় জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান। সীতাকুণ্ড উপজেলায় হলেও নগরের কাছেই এই এলাকা। এলাকাটির পূর্ব দিকে রয়েছে হাটহাজারী উপজেলা এবং দক্ষিণে বায়েজিদ বোস্তামী থানা। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এলাকাটি অপরাধীদের কাছে ‘নিরাপদ রাজ্য’ হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে এখানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার বাড়িতে অন্তত দেড় লাখ মানুষের বসবাস, যাদের অধিকাংশই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে বসতি গড়েছেন। জঙ্গল সলিমপুরে এখনও পাহাড় কেটে চলছে প্লট-বাণিজ্য। এই বাণিজ্য ও দখল টিকিয়ে রাখতে এলাকাটিতে গড়ে তোলা হয়েছে সন্ত্রাসী বাহিনী। সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পাহারায় থাকে এসব সন্ত্রাসী। নগরীর সঙ্গে অবস্থান এই জঙ্গল সলিমপুরকে বলা হতো দেশের ভেতর আরেক রাজ্য। কারণ দেশের আইন ও নিয়মনীতিতে নয়, সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোর নির্দেশেই চলছে সলিমপুর।

জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের দুটি পক্ষ রয়েছে। একটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং অপর পক্ষে রোকন উদ্দিন। ইয়াসিন গত জানুয়ারিতে ওই এলাকায় অভিযানে যাওয়া এক র‍্যাব কর্মকর্তাকে হত্যার মামলায় প্রধান আসামি। জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় রয়েছে তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ।




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button