Uncategorized

ভারতে পালানো আসামি দেশে ফেরানোর আইনি পথ কী

বাংলাদেশে অপরাধ করে অনেক অপরাধী সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। একই ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী, দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যোগাযোগ এবং বিস্তৃত সীমান্তের অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ চলাচলের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অনেকেই অপরাধ করে প্রতিবেশী দেশটিতে আশ্রয় নেয়। ফলে তাদেরকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার নিশ্চিত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পর্যায়েও যোগাযোগ হয়ে থাকে। পলাতক অপরাধীদের ফিরিয়ে আনা বা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে মাঝেমধ্যে আলোচনা হয়। কখনও এর সুফল আসে, আবার কখনও আসে না।

সর্বশেষ ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর হোসেন কলকাতায় গ্রেফতার হলে—তাদের কীভাবে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে, এ প্রশ্নটি আবারও আলোচনায় এসেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অপরাধী ফেরত আনার ক্ষেত্রে মূলত দুটি আইনি কাঠামো কার্যকর রয়েছে। একটি হলো অপরাধী প্রত্যর্পণ, অন্যটি দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি স্থানান্তর বা বন্দিবিনিময় চুক্তি। তবে এই দুই ব্যবস্থার লক্ষ্য, প্রক্রিয়া এবং আইনি শর্ত ভিন্ন। ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ীই ফেরত আনা হতে পারে।

প্রত্যর্পণ চুক্তি

পলাতক আসামিকে ফেরত আনার প্রধান আইনি মাধ্যম হলো প্রত্যর্পণ। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে `ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ এক্সট্রাডিশন ট্রিটি’ ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে সই হয় এবং পরে ২০১৬ সালে এতে সংশোধনী যুক্ত করা হয়। এই চুক্তির আওতায় দুই দেশ একে অপরের কাছে পলাতক অপরাধী প্রত্যর্পণের জন্য আইনি সহযোগিতা দিতে সম্মত হয়েছে।

প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপ হলো, আসামির অবস্থান শনাক্ত করা। এরপর বাংলাদেশের আদালত থেকে জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানা অথবা ইন্টারপোলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নোটিশ জারি করা হয়। তৃতীয় ধাপে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠানো হয়। সাধারণত স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার ভারতের কাছে প্রত্যর্পণের আবেদন জানায়।

এরপর ভারতের আদালতে এ বিষয়ে শুনানি হয়। আদালত যাচাই করে দেখেন—সংশ্লিষ্ট অপরাধ দুই দেশেই শাস্তিযোগ্য কিনা, অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিনা এবং পর্যাপ্ত প্রমাণ আছে কিনা। সব কিছু সন্তোষজনক হলে আদালতের অনুমোদনের পর আসামিকে হস্তান্তর করা হয়।

চুক্তি অনুযায়ী কিছু ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যানও করা হতে পারে। যেমন- অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হলে, পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকলে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা থাকলে এবং একই অপরাধে সংশ্লিষ্ট দেশে বিচার চলমান থাকলে—এ ধরনের পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট দেশ প্রত্যর্পণের অনুরোধ নাকচ করতে পারে।

বন্দিবিনিময় চুক্তি

প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার বাইরে আরেকটি ব্যবস্থা হলো দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি স্থানান্তর বা বন্দি বিনিময় চুক্তি। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এ বিষয়ে রয়েছে ‘ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ অ্যাগ্রিমেন্ট অন ট্রান্সফার অব সেন্টেন্সড পারসনস।’

এই চুক্তির আওতায় কোনও বাংলাদেশি নাগরিক ভারতে অপরাধ করে সাজাপ্রাপ্ত হলে, কিংবা কোনও ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশে সাজা পেলে, তাকে নিজ দেশে পাঠানো যেতে পারে। তবে এর জন্য কয়েকটি শর্ত রয়েছে—বন্দিকে অবশ্যই দণ্ডপ্রাপ্ত হতে হবে, দুই দেশের সরকারকে সম্মত হতে হবে এবং বন্দির নিজস্ব সম্মতি থাকতে হবে। সাধারণত সাজা ভোগের নির্দিষ্ট সময় বাকি থাকতে হয়। এই ব্যবস্থায় বন্দি মুক্তি পায় না, শুধু নিজ দেশের কারাগারে থেকে বাকি সাজা ভোগ করে।

আলোচিত প্রত্যর্পণ

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর দুটি আলোচিত প্রত্যর্পণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে—আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতার অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর বাংলাদেশ থেকে ভারতের কাছে প্রত্যর্পণ করা হয় উলফা নেতা অনুপ চেটিয়াকে। অপরদিকে, একদিন পর ১২ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

আইনি কাঠামো থাকলেও বাস্তবে পলাতক আসামি ফেরত আনা অনেক সময় জটিল হয়ে পড়ে। এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি কারণ—দীর্ঘ আদালত প্রক্রিয়া, পর্যাপ্ত প্রমাণ সংগ্রহের সমস্যা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ধীরগতি এবং সীমান্ত এলাকায় অনিয়ন্ত্রিত পারাপার। বিশেষ করে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত অপরাধীদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে।

বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত অপরাধ ও আন্তদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় প্রত্যর্পণ চুক্তি ও বন্দি স্থানান্তর চুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে অপরাধীরা অন্য দেশে আশ্রয় নিয়ে বিচার এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কমে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার হলে পলাতক আসামিদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা সহজ হবে বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

পুলিশের মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির জানিয়েছেন, শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর হোসেনকে দেশে ফেরাতে কূটনৈতিকভাবে কাজ চলছে। সোমবার (৯ মার্চ) পুলিশ সদর দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, হত্যার অভিযোগে ভারতে আটক দুই বাংলাদেশিকে বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় ফেরত চাওয়া হতে পারে। ভারতের কাছে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে এবং কলকাতায় কনস্যুলার এক্সেসের জন্য আবেদন করা হয়েছে।

অপরদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, দুই আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ইতোমধ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাদের ফেরানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button