আমরা রাজনৈতিক তৎপরতার নীরব দর্শক : মোস্তাক আহমাদ দীন

উমামা জামান মিম: বইমেলায় নতুন কী বই প্রকাশিত হচ্ছে?
মোস্তাক আহমাদ দীন: মেলায় দুটি নতুন বই আর আমার পূর্বপ্রকাশিত মননচিন্তা বিবেচনা বইটির নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হওয়ার কথা, এখন তা চূড়ান্তকরণের কাজ চলছে। নতুন বই দুটির মধ্যে একটি ‘শের ও গজলের জগৎ’, অন্যটি লোকসংস্কৃতিবিষয়ক বই ‘জানাজানি কানাকানি’।
প্রশ্ন: বইগুলো নিয়ে পাঠকদের কিছু বলুন। বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা কি এই বইগুলোর বিষয়বস্তুকে প্রভাবিত করেছে?
উত্তর: প্রথম বইয়ে গজলের আদিকবি রুদাকি থেকে শুরু করে ক্যাইফি আজমি পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের শের ও গজলের প্রবণতা এবং শায়ের ও গজলকারদের বর্ণাঢ্য জীবন নিয়ে সবিস্তার আলোচনা রয়েছে। দ্বিতীয় বইয়ের নাম জানাজানি কানাকানি, তাতে রয়েছে ফকিরি তত্ত্ব ও বাউল-ফকিরদের জীবন-দর্শন ও গান নিয়ে আলোচনা। দুটি বইয়ের লেখাগুলি যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে লেখা হয়েছে, তাই বইয়ের ওপর বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রভাব সরাসরি পড়েনি। তবে, বইয়ের বিষয়বস্তুতে এইসময়ের নেতিবাচক প্রবণতাগুলির পরোক্ষ সমালোচনা আছে, কারণ এখন যা চলছে, বিশেষত সংগীত ও তার দর্শনের প্রতি যে-মনোভাব, কূপমণ্ডূকতা, তার একটি ধারাবাহিকতা আছে এবং এ বিষয়ে নানারকম ভালো-মন্দ পূর্বাভিজ্ঞতাও রয়েছে আমার।
প্রশ্ন: শুরু থেকেই মেলা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছিল, এমন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইভেন্টের প্রতি কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা আছে?
উত্তর: মেলা নিয়ে সবার মনেই একধরনের অনিশ্চয়তা ছিল, কারণ আপনি যাকে ‘জাতীয় ইভেন্ট’ বলছেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সামনে এখন এরচেয়েও বড়ো ইভেন্ট ছিল ‘নির্বাচন’। নির্বাচন নিঃসন্দেহে একটি বড়ো ঘটনা, বিশেষত এইসময়ে সেটি প্রত্যাশিতও ছিল, কিন্তু তা মাথায় রেখেও বলছি, জাতি হিসাবে আমাদের দুর্ভাগ্য হলো, কোনো জাতীয় সাংস্কৃতিক তৎপরতাকেই আমরা এখনো সবকিছুর ঊর্ধ্বে বিবেচনা করতে পারিনি। আসলে সেই রুচি আর দৃষ্টিভঙ্গিই এখনো আমাদের তৈরি হয়নি।
তবে, মেলাকে যে আমরা এখনো সমকালীন সংকট ও পরিস্থিতির মুখোমুখি হাজির করি, তা তো একধরনের অবহেলাই।
প্রশ্ন: সময় কমিয়ে আনা ও রমজানের কারণে মেলায় কেমন প্রভাব পড়বে?
উত্তর: রমজান মাসে মেলা হওয়ায় বইবিক্রিতে অবশ্যই প্রভাব পড়বে। কিন্তু আমাদের একথাও তো মনে রাখতে হবে যে, এখন যে-নির্ধারিত সময়ে মেলা হয়, তা একসময় রমজান মাসেও পড়বে। একদিকে নির্বাচন, অন্যদিকে জাতীয় চেতনা—এই দুই কারণেই এরকম সময়ে মেলা করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
প্রশ্ন: গত বছর মেলা নিয়ে প্রকাশকদের হতাশা দেখেছি, অনেকের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল—এ বছর এমন কিছু আশঙ্কা আছে?
উত্তর: এ-বছর সেই আশঙ্কা কিছুটা কম। কারণ যাদের মাধ্যমে বিশৃঙ্খলাটা তৈরি হয়, তারা কখনো কখনো রাজনৈতিক স্বার্থে ক্ষমতা প্রদর্শনের জায়গা হিসাবে বইমেলাকে নির্ধারণ করে। এবার তা কম হওয়ার সম্ভাবনা। তবে, একবার যারা সুযোগ পেয়েছে, তারা বারবার তা করার চেষ্টা করবে, এটাই স্বাভাবিক। তাই মেলা-কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে সচেতন ও সাবধান হতে হবে।
প্রশ্ন: একটি সুন্দর বইমেলা আয়োজন করতে কী কী পদক্ষেপ নিলে ভালো হয়?
উত্তর: যাদেরকে মেলার দায়িত্ব দেওয়া হয় তাদেরকে যথা-অর্থে কাজ করার স্বাধীনতা দিতে হবে যাতে তারা প্রকাশকসহ সমস্ত অংশীদারদের সহযোগিতা ও পরামর্শ নিয়ে কাজ করতে পারে। সব সরকারই মেলাকে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করেছে, এখনো তা অব্যাহত।
প্রশ্ন: মেলায় এবং সারাবছর যত বই প্রকাশিত হয় তার ডিজিটাল ডেটাবেইস কি বাংলা একাডেমি বা কোনো কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করতে পারে?
উত্তর: অবশ্যই সংরক্ষণ করতে পারে, সেক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহের জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তার জন্য নীতিমালাও দরকার পড়বে। তা করতে পারলে সাধারণ পাঠক আর গবেষকরা উপকৃত হবে।
প্রশ্ন: বইমেলায় পাঠক-লেখক সম্পর্ক বা যোগাযোগের বর্তমান বাস্তবতা কী?
উত্তর: মেলা-কর্তৃপক্ষ এবং প্রকাশকেরা এর জন্য বইমেলায় নানারকম উদ্যোগ গ্রহণ করে, তাতে কিছুটা যোগাযোগও তৈরি হয়, কিন্তু আমার কাছে লেখক-পাঠকের সরাসরি যোগাযোগের ব্যাপারটি এতটা জরুরি বলে মনে হয় না। লেখকের সঙ্গে পাঠকের প্রকৃত যোগাযোগ তৈরি হয় বইয়ের মাধ্যমে, মেলার মাধ্যমে নয়। তারপরও কখনো কখনো সরাসরি যোগাযোগের দরকার পড়লে পাঠক নিজের চেষ্টায় সেই কাজটি করতে পারেন।
প্রশ্ন: প্রচুর বই ছাপা হচ্ছে কিন্তু বইয়ের মান ও সম্পাদনা নিয়ে প্রকাশকরা কতটা সচেতন বলে মনে করেন?
উত্তর: বইয়ের ছাপা ও মান নিয়ে হাতে-গোনা কয়েকজন প্রকাশক ভাবেন, বাকিরা আলু-পেঁয়াজের মতো বাইরের দিকটা দেখেই বই প্রকাশ করেন এবং এর পেছনেও আরও বহু কিছু আছে। উপযুক্ত সম্পাদকের অভাবে বা খরচের ভয়ে নামি প্রকাশকও যাচাই-বাছাই না করে এখন বইয়ের বিষয়বস্তু দেখেই বই প্রকাশ করে নিজের অজান্তে প্রতারিত হচ্ছেন।
উপরিউক্ত কথাগুলো এখানে বললাম বটে, কিন্তু বর্তমান পট-পরিস্থিতির কারণে এখন প্রকাশকেরা যে-আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে আছেন, সরকারি ও বেসরকারিভাবে তাদের প্রতি এগিয়ে না এলে আমাদের প্রকাশনাশিল্প ধসে পড়বে। আমার এই মত যাচাই করার জন্য যেকোনো পাঁচটি বড়ো প্রকাশনের ব্যবসায়িক তথ্য নেওয়াই যথেষ্ট। কিন্তু আমাদের কাছে এখন এগুলো তো বড়ো কোনো সমস্যা নয়, আমরা এখন রাজনৈতিক তৎপরতার নীরব দর্শক মাত্র।



