Uncategorized

প্রয়োজন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম : স্বপন নাথ 

উমামা জামান মিম : মেলায় আপনার নতুন কী বই প্রকাশিত হচ্ছে?

স্বপন নাথ: ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত একটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। বইটির নাম : মুখোশ ও নির্মুখ; প্রকাশক অর্ক পাবলিকেশন্স, ঢাকা। মেলা শেষ হলেও ২/১টি প্রকাশ পেতে পারে। এক্ষেত্রে আমার দৃষ্টি মেলাকেন্দ্রিক নয়।

প্রশ্ন: বইগুলো নিয়ে পাঠকদের কিছু বলুন? বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা কি এই বইগুলোর বিষয়বস্তুকে প্রভাবিত করেছে?

উত্তর: মূলত বই সংগ্রহ ও পাঠ পাঠকের ওপর নির্ভর করে। এক্ষেত্রে পাঠক স্বাধীন। আমি নিজেও একজন পাঠক। প্রকাশিত বইটি বেশি বড়ো নয়; মাত্র ৪ ফর্মার। বইটির নামের সঙ্গে বিষয়বস্তু উচ্চারণের চেষ্টা করেছি। বিষয় থেকে মূলত নামকরণে আসা। সাম্প্রতিক সময়ের কবিতার যে ধরন, এর প্রতিফলন রয়েছে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা যে কোনো লেখায় থাকবেই; না হলে লেখক কী বার্তা দেবেন পাঠককে। পোস্টহিউম্যানিজম ও পোস্টট্রুথ এর কিছু ব্যাখ্যা আমার নিজেকেও প্রভাবিত করেছে। খেয়াল করবেন—নেটওয়ার্কিং সুবিধা, বিশ্বায়ন, উদার পুঁজিতন্ত্র বিশ্বরাজনীতি, ইত্যাদির পরিণামে মানুষের মধ্যে চরম অস্থিরতা এবং শূন্যতা বিরাজমান। যা থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন নই। পরিণামে আমরা সকালে যা বলছি, বিকালে তা বলছি না। আমরা যৌথভাবে প্রতারণার সংস্কৃতি গড়ে তুলেছি। আবার আমাদের বাহ্যিক আদলে এক রূপ ভেতরে আরেক রূপ। অন্তঃসলিলে আরেক মানুষ। ফলে সমাজ ও ব্যক্তি অস্তিত্বে বিশাল এক শূন্যতা। এর প্রভাবে যারা বঞ্চনায় নির্যাতিত; তাদের ভাষা নেই, কথা নেই। যা থেকে নাম দিয়েছি— মুখোশ ও নির্মুখ।

প্রশ্ন: শুরু থেকেই মেলা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছিল, এমন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইভেন্টের প্রতি কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা আছে?

উত্তর: অবশেষে বইমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে; এটাই ভালো খবর। এজন্য বাংলা একাডেমিকে ধন্যবাদ। আমি ভেতরের খবর জানি না। তবে গণমাধ্যমের কল্যাণে যেসব জানি, এসব থেকে যা বলি—আয়োজক, প্রকাশক সকলেই জানে ফেব্রুয়ারি মাসে সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের গুরুত্ব সকলেই জানেন। সংবাদে বোঝা গেল—সংশ্লিষ্ট সকলেই ছিলেন দোদুল্যমান। তবে এ বিষয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত অনেক আগেই নেওয়া দরকার ছিল। আপনি যে প্রশ্ন রেখেছেন—‘জাতীয় ইভেন্টের প্রতি কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা আছে?’ অবহেলা বলব না।

আমার মনে হয়, সকলেরই সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষমতার অভাব রয়েছে। মেলা শেষে আমরা ভুলে যাই যে, এখানে একদিন বইমেলা হয়েছিল। যে কোনো বিষয়ে ভুল থাকা স্বাভাবিক। তবে দুর্বলতা সারাতে আরো বেশি নিবিড় আলোচনা, পর্যালোচনা, অপরের কথা শোনা প্রয়োজন। তা হলে পরের মেলাগুলো সুন্দরভাবে আয়োজন করা যেতে পারে।

প্রশ্ন: সময় কমিয়ে আনা ও রমজানের কারণে মেলায় কেমন প্রভাব পড়বে?

উত্তর: শুধু রমজানের কারণে নয়। এমনিতেই প্রতিবছরের মেলার সময় কমিয়ে আনা দরকার, এটা আমার ব্যক্তি-অভিমত। এর মানে মাসব্যাপী করার প্রয়োজন নেই। জীবন যাপনের ধরন বদলে যাবার কারণে অন্যভাবে ব্যস্ত থাকতে হয় সকলকেই। সময় কমিয়ে কীভাবে বইমেলাকে দক্ষতার সঙ্গে আয়োজন ও পরিচালনা করা যায়, তা নিয়ে ভাবা দরকার। এ নিয়ে কর্তৃপক্ষ ভাবতে পারেন।

 রমজানের কারণে কিছু প্রভাব পড়বেই। সেটা রোজা পালনের জন্য নয়। এর সঙ্গে আনুষঙ্গিক কিছু বিষয় থাকে, সেসব কারণে। যেমন: সময়মতো ইফতার ও নামাজ আদায়ের বিষয় রয়েছে। ফলে অনেকেই মেলায় যেতে পারেন না। তবে এর আগেও রমজান মাসে বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তখন এটাও দেখেছি, লেখক-পাঠক-প্রকাশক মিলে পবিত্রতা ও আনন্দের সঙ্গে ইফতার করেছেন মেলার মাঠে। সাধারণ মানুষের ইফতারের আগে বাড়ি ফেরার তাগিদ থাকে। ফলে আবার মেলায় ফিরে আসতে আসতে মেলা শেষ হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবে পাঠকসহ সাধারণ মানুষের চলাচল সীমিত থাকে। আরেকটি হলো, ব্যক্তি ও পারিবারিক বাজেটের বিষয়। সামনে ঈদ-উৎসব রেখে সীমিত আয়ের মানুষেরা বই কিনতে কিছুটা চিন্তায় পড়বেন অবশ্যই। ফলে প্রভাব পড়াই স্বাভাবিক।

প্রশ্ন: গত বছর মেলা নিয়ে প্রকাশকদের হতাশা দেখেছি, অনেকের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল—এ বছর এমন কিছু আশঙ্কা আছে?

উত্তর: যে বয়স থেকে মেলায় আসা-যাওয়া, তখন থেকে শুনে আসছি প্রকাশকদের হতাশার কথা। কোন সেক্টরে হতাশা নেই? লেখক-পাঠকরাও তো হতাশ—যেসব কারণ প্রকাশকরাও জানেন। সামগ্রিকভাবে আমাদের এখানে প্রকাশনা এখনও শিল্প হিসেবে কাঠামোবদ্ধ হয়নি। বই লেখা হচ্ছে, প্রকাশ পাচ্ছে, মেলাও হচ্ছে। মেলার পর সারাবছর আর খোঁজ নেই কারো। মেলার সঙ্গে বিপণন-বিক্রির বিষয় জড়িত, আর প্রকাশনার সঙ্গে অনেককিছুই জড়িত। অনেক বিষয়ে লেখক-প্রকাশক-পাঠক অংশত উদাসীন অথবা জানেনই না—প্রকাশনায় কী থাকা প্রয়োজন।

যে কোনো ইভেন্টে নিরাপত্তার প্রসঙ্গ আসে সংগত কারণে। স্থানিক ও আন্তর্জাতিক অসুস্থতায় অনেক আগে থেকেই আশঙ্কার অসুখ শুরু হয়েছে। এর প্রভাব মনে হয় নিকট ভবিষ্যতে দূর হবে না। তা নিয়েই জীবন চালাতে হবে।

কিন্তু বইমেলাসহ বিভিন্ন উৎসবে নিরাপত্তার প্রশ্ন এলে, আমার ভেতরে কেমন যেন লাগে। বিষণ্ন হই। মানুষ কেন এখনও সুন্দরের বিপক্ষে যায়? জানতে ইচ্ছে করে—এসব বিষয়, স্থানে নিরাপত্তা কেন লাগবে?

প্রশ্ন: একটি সুন্দর বইমেলা আয়োজন করতে কী কী পদক্ষেপ নিলে ভালো হয়?

উত্তর: অনেক বছর থেকে শুনে চলছি বইমেলা সুন্দর হচ্ছে না। তা হলে যেসব কারণে মেলা অসুন্দর হচ্ছে, সেগুলো দূর করা গেলেই তো সুন্দর হয়ে যায়; যা নিয়ে প্রতিবছর বলা হয়ে থাকে। মেলা আয়োজনে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের দৃঢ়তা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ইভেন্ট ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন সামনে আসে। এক্ষেত্রে প্রয়োজন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম। মূলে রয়েছে বাংলা একাডেমির ইভেন্ট শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা।

প্রশ্ন: বইমেলায় পাঠক-লেখক সম্পর্ক বা যোগাযোগের বর্তমান বাস্তবতা কী?

উত্তর: মেলা হচ্ছে। লেখক-পাঠক সম্পর্ক আশানুরূপ তৈরি হচ্ছে কিনা আমার জানা নেই। তবে পাঠের জন্য লেখকের সঙ্গে ব্যক্তি সম্পর্কের প্রয়োজন নেই। জরুরিও নয়। মূলত টেক্সটের মাধ্যমে সে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। শুধু মেলা কেন, সকলক্ষেত্রে নার্সিসাস মনোবাসনার কারুকাজ লক্ষ্য করছি। সমকালীন বাস্তবতা লেখক-পাঠক সম্পর্ক বদলে দিয়েছে। এখন লেখক বা পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য বই পাঠ বা সংগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ নয়, এ নিয়ে নিজেকে উপস্থাপনের প্রবণতা দেখা যায়। আত্মঅহং, আত্ম প্রচারণাই মুখ্য। পাঠ বা পাঠোত্তর জিজ্ঞাসার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

প্রশ্ন: প্রচুর বই ছাপা হচ্ছে কিন্তু বইয়ের মান ও সম্পাদনা নিয়ে প্রকাশকরা কতটা সচেতন বলে মনে করেন?

উত্তর: মান ও সম্পাদনা বিষয়ে এখানে খুব কম লোকেরই জানাবোঝা রয়েছে। এ নিয়ে কথা বলতে গেলে অনেকেই মনঃক্ষুণ্ন হতে পারেন। ভালো, মানসম্পন্ন প্রকাশনার জন্য প্রাথমিক দায় হলো লেখকের। দ্বিতীয় দায় প্রকাশকের। তৃতীয়ত, দায় পাঠকের। এখানে অনেক বই লেখক কিছু না জেনেই একটি পাঠ তৈরি করেন। তিনি জানেনও না কীভাবে বইয়ের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করতে হয়। নিজের দায়িত্ব জেনে-বুঝে, লেখা শুরু করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে প্রকাশকের কাছে পাণ্ডুলিপি পাঠানোর আগে সেল্ফ-এডিট ও ফিল্টার জরুরি; এটা অনেকেই জানেন না। এটাও মনে রাখা প্রয়োজন, একজন লেখক কিছু না জানলে যে পাণ্ডুলিপি তৈরি বা প্রকাশনায় যেতে পারবেন না; এমন কোনো কথা নেই। সেক্ষেত্রে দায়িত্ব এসে বর্তায় প্রকাশক ও সম্পাদকের ওপর।       

আবার, যেটুকু জানা, অনেক প্রকাশনা-প্রতিষ্ঠানে সম্পাদক বা সম্পাদনা-বোর্ড নেই। প্রকাশনার আগে যে সমূহ সম্পাদনার প্রয়োজন, তা স্বীকার করেন না অনেকেই। সম্পাদনাকর্মের বিভিন্ন ধাপও রয়েছে। এ ধাপগুলো অতিক্রমের ভেতর দিয়ে চূড়ান্ত প্রকাশনায় যেতে হয়। অধিকাংশ প্রকাশনা-প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যের কারণে এদিকে খেয়াল রাখছেন না। এ ছাড়াও যুক্তি সংগত সম্মানী থেকে লেখকদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। যা নিয়ে উদাসীনতা প্রকট। শুধু কী তাই, লেখকরা জানেনই না, একটি অর্থবছরে কয়টি বই বিক্রি হয় বা হয়ে থাকে। প্রকাশক তাকে কিছুই অবহিত করেন না। আবার পাঠক-প্রতিক্রিয়া জানার সুযোগও কেউ রাখছে না। আমার মনে হয় এ বিষয়ে আরো বেশি পেশাদারিত্ব প্রয়োজন।




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button