Uncategorized

অসচেতনতা, মানহীন সরঞ্জাম ও নজরদারির ঘাটতি

সারা দেশে রান্নার কাজে এলপিজি (তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস) সিলিন্ডারের ব্যবহার ব্যাপক। সুবিধার কারণে দিন দিন ব্যবহারকারীর সংখ্যাও বাড়ছে। তবে এই জ্বালানিটি যেমন সুবিধাজনক, তেমনি এর অপব্যবহার ও অসচেতনতা ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এর পাশাপাশি প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের পাইপলাইনে লিকেজের কারণেও দেশে দগ্ধের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ বা গ্যাস লিকেজের কারণে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এসব ঘটনায় প্রাণহানি ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। শুধু বাসাবাড়িতেই নয়, রেস্তোরাঁ, শিল্পকারখানা এমনকি হাসপাতালেও অনেক ক্ষেত্রে অগ্নি নিরাপত্তা বিধি যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মানহীন সিলিন্ডার ও এর সরঞ্জাম ব্যবহারের পাশাপাশি সচেতনতার অভাব এসব দুর্ঘটনার বড় কারণ। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির ঘাটতিও দায়ী বলে মনে করেন তারা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গত দুই মাসে গ্যাস লিকেজ বা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে অন্তত ৩০০ জন চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়েছেন রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেককেই শেষ পর্যন্ত বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা

গত ৬ মার্চ ভোরে রাজধানীর তুরাগের কামারপাড়া এলাকার একটি বাসায় গ্যাস বিস্ফোরণে নারী ও শিশুসহ ১০ জন দগ্ধ হন। তাদের জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রবিবার (৮ মার্চ) সকালে সোনিয়া আক্তার (২৫) নামে একজন মারা যান। বাকি ৯ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, বাসার ভেতরে জমে থাকা গ্যাস থেকেই এই বিস্ফোরণ ঘটে। সংস্থাটি জানায়, ওই বাসায় গ্যাস সিলিন্ডার ছিল না। লাইনের গ্যাস ব্যবহার করা হতো। গ্যাস লাইনের লিকেজ অথবা রান্নার চুলার চাবি খোলা থাকায় গ্যাস বের হয়ে ঘরের ভেতরে জমে যায়। দরজা-জানালা বন্ধ থাকায় গ্যাস বের হতে পারেনি। পরে হয়তো বৈদ্যুতিক সুইচ অন করা বা রান্নার জন্য আগুন ধরানোর সময় স্ফুলিঙ্গ থেকে বিস্ফোরণ ঘটে।

একই দিন বিকালে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার সিদলাই ইউনিয়নের পোমকাড়া গ্রামে একটি চায়ের দোকানে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে শিশুসহ দুজন আহত হন।

এরপর ৭ মার্চ ভোররাতে টঙ্গীর দত্তপাড়া জহির মার্কেট এলাকার একটি বাসায় সেহরি রান্না করতে গিয়ে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে মিজানুর রহমান নামে একজন দগ্ধ হন। বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসাধীন। টঙ্গী সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক নাফিয়া শারমিন জানান, মিজানুরের শরীরের প্রায় ৬০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে।

এর আগে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার নারিন্দার মৈশুন্ডি এলাকায় একটি বাসায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর আগুন লেগে মো. সেলিম ব্যাপারী (৩০) দগ্ধ হন। ঘটনার দিন রাতেই জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে তিনি মারা যান। ওই ঘটনায় তার মা সেলিনা বেগম (৪৫) ও বাবা মুক্তার ব্যাপারী (৫৫) একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

২৪ ফেব্রুয়ারি সকালে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে নারী ও শিশুসহ একই পরিবারের চারজন দগ্ধ হন। তাদের জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়। এছাড়া প্রায়ই দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ বা বিস্ফোরণে হতাহতের খবর পাওয়া যাচ্ছে।

২৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের হালিশহরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনায় একই পরিবারের ৯ জন দগ্ধ হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের ৫ জনের মৃত্যু হয়।

ফুটপাতের খাবারের দোকানেও ঝুঁকি

বাসাবাড়ির পাশাপাশি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরের ব্যস্ত সড়কের ফুটপাতে রয়েছে অসংখ্য স্ট্রিট ফুডের দোকান। কোথাও রাস্তার পাশে ছোট কাভার্ড ভ্যান বা ভ্রাম্যমাণ টং দোকানে গরম খাবার তৈরি করে বিক্রি করা হচ্ছে। এসব দোকানে গ্যাস সিলিন্ডার চুলা থেকে মাত্র এক-দেড় হাত দূরে রাস্তা বা ফুটপাতের ওপর রাখা থাকে।

একইভাবে চায়ের দোকানগুলোতেও গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে অগ্নি নিরাপত্তা বিষয়ে তাদের অধিকাংশেরই তেমন সচেতনতা নেই।

ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যান

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের গত এক বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা দেশে গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ৯২০টি। গ্যাস সরবরাহ লাইনের লিকেজ থেকে ৫৬২টি এবং সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্তত ১২১টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে।

২০২৪ সালে ৪৪টি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনায় ৫৩ জন আহত ও ৮ জন নিহত হন। একই বছরে গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে ৭০৪টি অগ্নিকাণ্ড ঘটে, যাতে ৮ জন আহত হন। ২০২৩ সালে গ্যাস সিলিন্ডার থেকে সৃষ্ট আগুনে ২৩ জন আহত ও ৪ জন নিহত হন। ২০২২ সালে ৩০ জন আহত ও ১ জন নিহত হন। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ ও ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে গ্যাস সিলিন্ডারজনিত দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে।

চিকিৎসকদের পরামর্শ

জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. শাওন বিন রহমান বলেন, গ্যাস লিকেজ ও সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে বাঁচতে কিছু সতর্কতা জরুরি। তিনি বলেন, রান্নাঘরে চুলা জ্বালানোর ১০ থেকে ১৫ মিনিট আগে জানালা খুলে রাখা উচিত। এতে রান্নাঘরে জমে থাকা গ্যাস বের হয়ে যাবে। এছাড়া চুলার স্ক্রু, পাইপ ও অন্যান্য সংযোগ প্রতি ছয় মাস বা অন্তত বছরে একবার পরীক্ষা করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের মূল কারণ গ্যাস লিকেজ। সিলিন্ডারের হোসপাইপ, রেগুলেটর বা ভালভের ত্রুটির কারণে গ্যাস বের হয়ে বাতাসে জমে থাকে। পরে সামান্য স্ফুলিঙ্গ বা আগুনের সংস্পর্শে এলে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে।

বিস্ফোরক পরিদফতরের সহকারী পরিদর্শক মুহাম্মদ মেহেদী ইসলাম খান বলেন, দুর্ঘটনা ঘটলে গুরুত্ব অনুযায়ী পরিদর্শন করে প্রকৃত কারণ বের করার চেষ্টা করা হয়। তবে জনবল সংকটের কারণে সব দুর্ঘটনা বা এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রয় প্রতিষ্ঠানে নজরদারি করা সম্ভব হয় না। তিনি বলেন, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের প্রধান কারণ নিম্নমানের সরঞ্জাম ও অসচেতনতা। অনেকেই মানহীন সিলিন্ডার বা রেগুলেটর ব্যবহার করেন। অথচ প্রতি পাঁচ বছর পরপর সিলিন্ডার পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক হলেও অনেকেই এই নিয়ম মানেন না।

মুহাম্মদ মেহেদী ইসলাম খান আরও বলেন, সাধারণত সিলিন্ডার নিজে বিস্ফোরিত হয় না; বিস্ফোরণ ঘটে এর সঙ্গে যুক্ত যন্ত্রাংশে। বাজারে পাওয়া অনেক রেগুলেটর ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিম্নমানের। এছাড়া সিলিন্ডার চুলার খুব কাছে রাখা, পরিবহন ও রক্ষণাবেক্ষণে নিয়ম না মানা এবং ব্যবহারের পর ঠিকমতো বন্ধ না করার কারণে গ্যাস লিকেজ হয়ে দুর্ঘটনা ঘটে।

সচেতনতার অভাবই বড় কারণ

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার সাধারণত নিরাপদ। তবে সিলিন্ডারের সঙ্গে যুক্ত সরঞ্জাম যেমন রেগুলেটর বা হোসপাইপ নিম্নমানের হলে গ্যাস লিকেজের ঝুঁকি বাড়ে। তিনি বলেন, কম দামের পণ্য কেনার চেয়ে একটু বেশি দাম দিয়ে ভালো মানের রেগুলেটর ও সরঞ্জাম ব্যবহার করলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে। অনেক উন্নত রেগুলেটরে অটোমেটিক সেফটি সিস্টেম থাকে, যা গ্যাস লিকেজ হলে সরবরাহ বন্ধ করে দেয়।

অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন আরও বলেন, ভারতসহ অনেক দেশে বাংলাদেশের তুলনায় বেশি এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করা হলেও দুর্ঘটনা তুলনামূলক কম। এর প্রধান কারণ সেখানে ব্যবহারকারীদের সচেতনতা বেশি। তার মতে, সিলিন্ডার বিক্রির সময় ব্যবহারবিধি সম্পর্কে লিফলেট দেওয়া বা মৌখিকভাবে গ্রাহকদের সচেতন করা হলে দুর্ঘটনা অনেকটাই কমে আসতে পারে।

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, অধিকাংশ দুর্ঘটনা সিলিন্ডার লিকেজ থেকে ঘটে। নিম্নমানের হোসপাইপ, রেগুলেটর, নজল ও ভালভ-এর জন্য দায়ী।

তিনি বলেন, সিলিন্ডার অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে এলে গ্যাসের চাপ বেড়ে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। তাই সিলিন্ডারের মান অনুযায়ী নিয়মিত হাইড্রোলিক পরীক্ষা করা জরুরি। দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সিলিন্ডার আমদানি থেকে বিপণন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থারও দায় রয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তাদের মতে, গ্যাস সিলিন্ডার চুলা থেকে কমপক্ষে ১০ ফুট দূরে রাখা উচিত। সিলিন্ডার কখনও কাত করে রাখা যাবে না। পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা থাকতে হবে। সিলিন্ডার রোদ ও তাপ থেকে দূরে রাখতে হবে।

তারা আরও বলেন, এলপিজি সিলিন্ডার নির্দিষ্ট সময় পরপর পরীক্ষা করা জরুরি। কারণ গ্যাস সাধারণত ১০ বার চাপ দিয়ে রিফিল করা হয়। তাই সিলিন্ডার ব্যবহারের উপযোগী কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button