Uncategorized

জিলাপির নামে কি খাচ্ছি আমরা!

রোজার মাসে ইফতারের সময় জিলাপি অনেকেরই প্রিয় খাবার। সারা দিন রোজা রাখার পর মিষ্টি ও গরম জিলাপি খেলে মনটা ভরে যায়। ইফতারের টেবিলে খেজুর, বেগুনি ও ছোলার সঙ্গে জিলাপি থাকলে আনন্দ আরও বাড়ে। জিলাপিকে দৃষ্টিনন্দন করতে ও দীর্ঘ সময় ধরে মুচমুচে রাখতে অসাধু ব্যবসায়ীরা ব্যবহার করছেন হাইড্রোজ নামে এক ধরনের রাসায়নিক উপাদান; যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এর প্রভাবে কিডনি পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

হাইড্রোজ (সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট) একটি শক্তিশালী রাসায়নিক বিজারক ও ব্লিচিং এজেন্ট। এটি প্রধানত টেক্সটাইল শিল্পে কাপড়ের অতিরিক্ত রং তোলা বা ভ্যাট ডাইং প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয়। এছাড়া কাগজ শিল্পে মণ্ড সাদা করতে এবং খাদ্য শিল্পে চিনি বা গুড় পরিষ্কার ও উজ্জ্বল করতে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।

রাজধানীর নানা এলাকা ও পাড়া-মহল্লার কিছু দোকানে স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে জিলাপি তৈরির ক্ষেত্রে অসাধু কিছু বিক্রেতা ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশিয়ে দিচ্ছেন বলে জানা যাচ্ছে। এতে খাবারের মান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক মনে করা হচ্ছে।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জিলাপিতে এই ক্ষতিকর কেমিক্যাল মেশানোর অভিযোগ উঠেছে।

সরেজমিনে সদরঘাট, লক্ষ্মীবাজার, রায়সাহেব বাজার ও কলতা বাজারের বিভিন্ন দোকানে জিলাপি তৈরিতে হাইড্রোজ মেশাতে দেখা গেছে।

যদিও অনেক দোকানি জানান, তারা ক্ষতিকর হাইড্রোজ সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন। কেউ কেউ এটিকে সাধারণ খাবারের সোডা হিসেবেই মনে করেন।

রায়সাহেব বাজারের দোকানি লুৎফার রহমান বলেন, আমরা এটাকে খাবারের সোডা মনে করি। এটি ব্যবহার করলে জিলাপি মচমচে হয় এবং দেখতে স্বচ্ছ দেখায়। এটি যে ক্ষতিকর হতে পারে, তা আমাদের জানা ছিল না।

আরেক দোকানি আব্দুল করিম বলেন, বাজারে অনেকেই এই উপাদান ব্যবহার করে। আমরা মূলত অন্যদের দেখে ব্যবহার করেছি। এতে জিলাপি দ্রুত ফুলে ওঠে এবং দেখতে সুন্দর লাগে বলে ক্রেতারাও বেশি পছন্দ করেন।

জিলাপি কিনতে আসা মোক্তার আহম্মেদ বলেন, পরিবারের সবাই জিলাপি খুব পছন্দ করে, তাই প্রতিদিন কিনতে হয়। কিন্তু পত্রপত্রিকায় দেখি জিলাপি মচমচে বা উজ্জ্বল করতে হাইড্রোজের মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানো হচ্ছে। আমরা অনেকেই জানি না কোন জিলাপিতে বিষ মেশানো আর কোনটাতে নয়। এই স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে আমাদের মুক্তি মিলবে কবে?

একই বিষয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন পুরান ঢাকার বাসিন্দা ও স্কুল শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, আগে জিলাপি মানেই ছিল একটা আলাদা ঘ্রাণ আর বিশুদ্ধতা। এখন জিলাপির চাকচিক্য বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু রাসায়নিকের ভয়ে নিশ্চিন্তে খাওয়ার উপায় নেই। প্রশাসনের উচিত নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা, যাতে সাধারণ মানুষ অন্তত ইফতারের মতো পবিত্র একটি আয়োজনে ভেজালমুক্ত খাবার পায়।

এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান বলেন, হাইড্রোজ মূলত দেশে আমদানি করা হয় সুতার ফ্যাক্টরিতে ব্যাবহারের জন্য। কিন্তু অত্যান্ত দুঃখের বিষয় বর্তমানে এটি জিলাপি, গুড় ও চিনিতে অপব্যবহার হচ্ছে। যখন এটি ব্যবহার করা হয়, তখন খাবার খাওয়া বা ধূমপান করা সম্পূর্ণ নিষেধ। এমন একটি ভয়ঙ্কর পদার্থ তারা জিলাপির সঙ্গে মিশাচ্ছে! আমরা নিয়মিত তল্লাশি চালাচ্ছি, অপরাধীদের জরিমানা ও শাস্তি দিচ্ছি।

হাইড্রোজ বিক্রি নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই পদার্থ বাংলাদেশ সরকার আমদানি করে সুতার ফ্যাক্টরির জন্য, এটি আমদানি বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের পোশাক শিল্প বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা অভিযানের মাধ্যমে এগুলো নির্মূল করার চেষ্টা করছি।

ভোক্তারা কীভাবে সচেতন হবে সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভোক্তারা সরাসরি দোকানিকে জিজ্ঞেস করবে এই জিলাপিতে হাইড্রোজ আছে কি না। যদি দেওয়া থাকে তাহলে তাহলে ওই দোকান থেকে জিলাপি ক্রয় করা পরিহার করবে। এটা আসলে তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষা করার কোনও বিষয় নয়। আমাদের কাছে যে কিট আছে সেটা দিয়ে শুধু গুড়ের হাইড্রোজ ধরা যায়, জিলাপির হাইড্রোজ ধরার জন্য এখনও কোনও কিট তৈরি হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাবারের সঙ্গে হাইড্রোজ মেশানো স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এটি শরীরে প্রবেশ করলে মুখ ও গলায় জ্বালা, বমি, পেটব্যথা ও হজমজনিত সমস্যা তৈরি হতে পারে। অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহণ করলে পাকস্থলির ভেতরের অংশে ক্ষতি এমনকি শ্বাসকষ্টের মতো গুরুতর সমস্যাও দেখা দিতে পারে। এছাড়াও কিডনি ড্যামেজ ও ক্যানসারের মতো রোগ হতে পারে। খাবারে এ ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি।

হাইড্রোজ ছাড়া কীভাবে জিলাপি তৈরি করা যায়

প্রয়োজনীয় উপকরণ

গোলা তৈরির জন্য: এক কাপ ময়দা, দুই টেবিল চামচ চালের গুঁড়া (মুচমুচে করতে), এক টেবিল চামচ বেসন, এক টেবিল চামচ চিনি, এক টেবিল চামচ ইস্ট, দেড় টেবিল চামচ টক দই, সামান্য ফুড কালার ও তেল।

সিরার জন্য: এক কাপ চিনি, এক কাপের কম পানি, এক চা চামচ লেবুর রস ও কয়েকটি এলাচ।

প্রস্তুত প্রণালি:

ধাপ ১: পারফেক্ট ব্যাটার বা গোলা তৈরি

একটি বড় বাটিতে ময়দা, চালের গুঁড়া, বেসন, চিনি, ইস্ট ও ফুড কালার মিশিয়ে নিন।

এরপর এতে টক দই ও দুই টেবিল চামচ তেল দিন। এবার ধীরে ধীরে কুসুম গরম পানি মিশিয়ে একটি মাঝারি ঘনত্বের গোলা তৈরি করুন। গোলাটি ১৫-২০ মিনিট কোনও গরম জায়গায় ঢেকে রাখুন।

ধাপ ২: চিনির সিরা প্রস্তুত

প্যানে চিনি, পানি ও এলাচ দিয়ে জ্বাল দিন।

সিরাটি ঘন হয়ে আঠালো হলে লেবুর রস দিয়ে নামিয়ে নিন। লেবুর রস সিরাকে জমে যেতে দেবে না।

ধাপ ৩: ভাজা ও পরিবেশন

একটি প্লাস্টিকের সসের বোতলে জিলাপির গোলা ভরে নিন। ফ্রাইপ্যানে ডুবো তেল গরম করে বোতল চেপে প্যাঁচ দিয়ে তেলের ওপর জিলাপি ছাড়ুন। মাঝারি আঁচে লালচে করে ভেজে তুলে সরাসরি চিনির সিরায় ডুবিয়ে দিন।




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button