Uncategorized

সরকার বদলালেই মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাই দরকার হয় কেন

১৯৭১ সালে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে কারা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা, সেই সুরাহা ৫৪ বছরেও শেষ হয়নি। একেক সরকারের আমলে তালিকায় নতুন নাম যুক্ত হয়েছে, বাতিল হয়েছে কিছু নাম। কখনও আবার নির্ধারণ করতে হয়েছে—কারা মুক্তিযোদ্ধা, আর কারা নয়। রবিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) আবারও ঘোষণা দেওয়া হলো যাচাই-বাছাইয়ের। কিন্তু ঠিক কতবার একজন মুক্তিযোদ্ধাকে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এই যাচাই-বাছাই কি কখনোই শেষ হবে না—এ প্রশ্ন মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষকদের।

রবিবার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) সদস্যদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যাচাই-বাছাই ও সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা ও মানদণ্ড এখন পর্যন্ত ১১ বার বদলানো হয়েছে। অপরদিকে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় সংযোজন-বিয়োজন হয়েছে সাতবার। মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা ও তালিকা যাচাইয়ের বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব দেওয়া হয় ফারুক ই আজমকে (বীর প্রতীক)। ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) পুনর্গঠন করা হয়। মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ধারণসহ তালিকা প্রণয়ন ও সংশোধনের কাজটি করে জামুকা।

মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের স্বীকৃতি দিতে ২০০২ সালে গঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এর আগে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম তালিকার উদ্যোগ নেওয়া হয় ১৯৮৬ সালে। তখন জাতীয় কমিটির তৈরি এক লাখ ২ হাজার ৪৫৮ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম পাঁচটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশ করা হয়। তবে ওই তালিকা তখন গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়নি। এর দুই বছর পরে ১৯৮৮ সালে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের করা তালিকায় এ সংখ্যা ছিল ৭০ হাজার ৮৯২ জন। এর মধ্যে বেসামরিক বীর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৫১ হাজার ৫২৬ এবং বিশেষ তালিকায় ছিলেন ১৯ হাজার ৩৬৬ জন। পরে ১৯৯৪ সালে বিএনপি সরকারের সময় ৮৬ হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। এরপর ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ এক লাখ ৮৬ হাজার ৭৯০ জনের নামের তালিকা প্রকাশ করে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার দুই লাখ ১০ হাজার ৫৮১ জনকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে এবং পরে এক লাখ ৯৮ হাজার ৮৮৯ জনের নাম গেজেট আকারে প্রকাশ করে।

২০১১ সালে ওই তালিকা সংশোধনসহ নতুন করে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি দিতে আবেদন গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার। এর আলোকে ২০১৪ সালের ৩১ অক্টোবরের মধ্যে অনলাইন ও সরাসরি প্রায় এক লাখ ৩৯ হাজার আবেদন জমা নেওয়া হয়।

কখনোই তালিকা করার সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে করা হয়নি উল্লেখ করে মুক্তিযুদ্ধ গবেষক আহমেদ শরীফ বলেন, ‘‘তালিকা হওয়ার কোনও একসময় হয়তো দলীয়করণ হয়েছে, সেটাকে ধরে এখন যে সরকারই আসে, একবার যাচাই-বাছাই করে। কিন্তু সঠিক সমাধানে পৌঁছানো বা সৎ উদ্দেশ্যে কাজটি কেউ করেনি। একটা দেশে মুক্তিযুদ্ধ হলে এর বিরোধিতাকারী ছাড়া সবাই মুক্তিযোদ্ধা। তাহলে আপনার উচিত বিরোধিতাকারীর তালিকা করা, সেটা কখনোই হয়নি। ফলে নতুন উদ্যোগে ভালো কিছু হবে কিনা, নাকি আবারও সুবিধাবাদীরা তালিকায় জায়গা করে নিতে চাইবে, সেটা দেখার বিষয়।’’

তিনি বলেন, ‘‘এভাবে চলতে থাকলে প্রকৃত সমাধান হবে না। মূল কথা হলো, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দেওয়ার বোধের জায়গা থেকে কাজটি হয়নি কখনও।’’

বাংলাদেশের মানবাধিকার আন্দোলনের অন্যতম নেতা, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি, বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. সারওয়ার আলী বলেন, ‘‘হুট করে মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন তালিকা করা বা কাউকে এত দিন পর বাদ দিয়ে দেওয়া, এটা মোটেই উচিত না। ক্ষমতায় যে আসে সেই তাদের লোকজনদের কিছু সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার জন্য এটা করে থাকে। এতে করে মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান হয়।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘যাচাই-বাছাইয়ের নিয়মিত একটা প্রক্রিয়া থাকতে পারে। এতে করে ভুয়া কোনও মুক্তিযোদ্ধা থাকলে তা বেরিয়ে আসবে। আবার দেখা যায়, সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা নিয়েও অনেক কথাবার্তা হয়। যেমন- মুজিবনগরে যারা ছিলেন তারা সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা, অন্যরা মুক্তিযোদ্ধা, এটা উচিত না।’’

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত সংখ‍্যা নিয়ে কাজ করার আছে উল্লেখ করে মুক্তিযুদ্ধের গবেষক ডা. এম হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিভিন্ন সময়ে দলীয় বিবেচনায় তালিকা বানানো হয়েছে। যারা ট্রেনিং নিয়েছেন কিন্তু যুদ্ধ করেনি, তারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিবেচিত হবেন কিনা, সেটা নির্ধারণ করতে হবে। এটা সঠিকভাবে করতে গেলে সত‍্য ইতিহাসও বেরিয়ে আসবে।’’

উল্লেখ্য, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরে রবিবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাজনৈতিক অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেন, ‘‘দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং চেতনার এত বেশি অপব্যবহার হয়েছে যে এর ফলে তরুণ প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস জানা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা কী অসীম ত্যাগ ও তিতিক্ষার মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছেন, তা আমাদের নতুন প্রজন্মের অনেকেরই অজানা। আমাদের মনে রাখতে হবে, মুক্তিযুদ্ধই এই রাষ্ট্রের জন্মের মূল ভিত্তি।’’ সভায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যাচাই-বাছাই এবং সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মতবিনিময় সভায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসরাত চৌধুরী, জামুকার সদস্যরা এবং মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button