Uncategorized

যুদ্ধ-পরবর্তী ইরানের পরিস্থিতি কেমন হতে পারে?

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, যদি যুদ্ধ শুরু হয়, তবে তাতে কোনোভাবেই মার্কিন স্থলবাহিনীর অংশগ্রহণ বা দেশ দখলের মতো ঘটনা ঘটবে না। মধ্যপ্রাচ্যে বিমানবাহী রণতরি ও অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প এটিই স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি ইরাক যুদ্ধের মতো ‘বিরাট বড় ভুল’ আর করতে চান না। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করা কিংবা হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরাল্লাহকে হত্যার মতো করেই যুক্তরাষ্ট্র চাইবে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং দমনমূলক ব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিতে। তারপর পরিস্থিতির তাস যেদিকেই মোড় নিক না কেন, তাতে ওয়াশিংটনের মাথাব্যথা থাকবে সামান্যই।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, যুদ্ধের কৌশলগুলো শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াবে?  মার্কিন সাময়িকী ফরেন পলিসি এক প্রতিবেদনে ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চারটি সম্ভাব্য দৃশ্যপটের কথা তুলে ধরেছে।

ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র

অধিকাংশ ইরানি নাগরিক একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেন। তবে কেবল বিমান হামলার মাধ্যমে শাসনব্যবস্থার পতন ঘটালে গণতন্ত্র আসার সম্ভাবনা সবচেয়ে কম। যুদ্ধের ফলে যে প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং অবকাঠামোগত ধ্বংসস্তূপ তৈরি হবে, তা কাটিয়ে উঠতে বিদেশের কোনও অর্থবহ সহায়তা মিলবে না। ট্রাম্পের কাছে ‘গণতন্ত্র’ কোনও অগ্রাধিকার নয়, যার প্রমাণ ভেনেজুয়েলা। এমনকি যুদ্ধ-পরবর্তী ইরান নিয়ে কোনও গোছানো পরিকল্পনাও বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের কাছে নেই।

রাজতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা

যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের কেউ কেউ শাহ রেজা পাহলভিকে সিংহাসনে বসানোর চিন্তা করতে পারেন। কিন্তু পাহলভিকে তেহরানের মসনদে টিকিয়ে রাখতে যে বিপুল পরিমাণ বিদেশি সামরিক সাহায্যের প্রয়োজন হবে, তা দিতে এখন কেউ ইচ্ছুক নয়। তাছাড়া প্রবাসীদের মাঝে তার জনপ্রিয়তা থাকলেও খোদ ইরানের ভেতরে তার প্রতি জনসমর্থন যৎসামান্য। যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের মাঝে তেহরানে বাগদাদের মতো ‘গ্রিন জোন’ তৈরি করার পরিকল্পনাটি ইরানিদের কাছে জনপ্রিয়তা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

গৃহযুদ্ধ ও খণ্ডবিখণ্ড রাষ্ট্র

গণতন্ত্র বা রাজতন্ত্রের চেয়েও বেশি সম্ভাবনা রয়েছে একটি গৃহযুদ্ধ বা রাষ্ট্রকাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়ার। ইসরায়েল হয়তো একটি খণ্ডবিখণ্ড ও দুর্বল ইরান দেখে খুশি হতে পারে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। সিরিয়ার আহমেদ আল-শারা বা ভেনেজুয়েলার বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকালে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র যেকোনও মূল্যে স্থিতিশীলতা চায়। আবার উপসাগরীয় দেশগুলো কোনোভাবেই চায় না আরেকটি অস্থিতিশীল ইরান লাখ লাখ শরণার্থী আর সন্ত্রাসবাদের জন্ম দিক, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের তেল বাণিজ্য এবং ইরাক-সিরিয়ার নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে।

আইআরজিসি বা সামরিক শাসন

ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটলে সবচেয়ে শক্তিশালী ও সুসংগঠিত শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তারা ক্ষমতা দখল করতে পারে। এই নতুন সামরিক সরকার হয়তো উগ্র জাতীয়তাবাদকে পুঁজি করে জনসমর্থন আদায়ের চেষ্টা করবে। এক্ষেত্রে একটি অদ্ভুত সমীকরণ তৈরি হতে পারে, আইআরজিসি নেতৃত্বাধীন ইরান হয়তো সৌদি আরবের বর্তমান ব্যবস্থার মতো হয়ে উঠবে। অর্থাৎ, যেখানে ধর্মীয় গোঁড়ামি কম থাকবে কিন্তু শাসনব্যবস্থা হবে কঠোর স্বৈরাচারী। তারা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের জন্য মুখিয়ে থাকবে কিন্তু অভ্যন্তরীণভাবে থাকবে চরম দমনমূলক।

শেষ পর্যন্ত কী অর্জন হবে?

যদি মার্কিন হামলা কেবল পারমাণবিক কেন্দ্র এবং কিছু শীর্ষ নেতাকে হত্যার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের মতোই হবে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, বিমান হামলা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বড়জোর দু-তিন বছর পিছিয়ে দিতে পারে। আর যদি শাসকগোষ্ঠী টিকে যায়, তবে তারা জাতীয়তাবাদ উসকে দিয়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমানোর সুযোগ পাবে।

শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প হয়তো বড় কোনও বিপর্যয় ছাড়া অভিযান শেষ করে বিজয় ঘোষণা করবেন। কিন্তু ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষকে বছরের পর বছর সেই যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ বয়ে বেড়াতে হবে। জর্জ ডব্লিউ বুশের ইরাক যুদ্ধের ‘মিশন অ্যাকমপ্লিশড’ ঘোষণার মতো এটিও শেষ পর্যন্ত কোনও স্থায়ী জয় বয়ে আনবে কি না, তা নিয়ে গভীর সন্দেহ থেকেই যাবে।

 




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button