Uncategorized

৫ কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে ব‍্যবসায়ীর বাসায় গুলি

চট্টগ্রাম নগরে পুলিশের পাহারায় থাকা এক শীর্ষ ব্যবসায়ীর বসভবন লক্ষ্য করে গুলি করেছে সন্ত্রাসীরা। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৬টার দিকে নগরের চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসায় এ গুলি করা হয়। ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের দাবি, কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারীরা গুলি ছুড়েছে। তবে এতে কেউ হতাহত হয়নি।

এর আগে গত ২ জানুয়ারি ওই বাসায় গুলি করেছিল সন্ত্রাসীরা। গুলিতে বাসার জানালার কাচ ভেঙে গিয়েছিল। বাসার দরজায়ও গুলি লাগে। এরপর থেকে বাসাটি পুলিশের পাহারায় ছিল। পুলিশের পাহারার মধ্যেই বাসাটিতে আবারও গুলির ঘটনায় আশপাশের লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‌‘বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ দীর্ঘদিন ধরে চাঁদা দাবি করে আসছে। প্রথমে ১০ কোটি টাকা, পরে ৫ কোটি টাকা দাবি করে সাজ্জাদ। চাঁদা না দেওয়ায় গত ২ জানুয়ারি আমার বাসায় গুলি করা হয়েছিল। এরপরও চাঁদা না পেয়ে ২০ দিন আগে হোয়াটসঅ্যাপে একটি বার্তা দেয় সাজ্জাদ। এতে লেখা হয়—‘ওয়েট অ্যান্ড সি’। আজ সকালে নামাজ পড়ে সবাই ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সকাল সাড়ে ৬টার দিকে হঠাৎ বাসার পেছনে মুখোশধারী অস্ত্রধারীরা গুলি করতে থাকে। ৬ থেকে ৭ রাউন্ড গুলি করেছে। সিকিউরিটি গার্ড সন্ত্রাসীদের দেখতে পেয়ে বাসার পাহারায় থাকা পাঁচ-ছয় জন পুলিশ সদস্যকে বিষয়টি জানায়। পুলিশ সদস্যরা বাসার দোতলায় উঠে সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য করে গুলি করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তবে এর আগেই সন্ত্রাসীরা চলে যায়। সন্ত্রাসীদের হাতে পিস্তল, চায়নিজ রাইফেলসহ অত্যাধুনিক অস্ত্র ছিল।’ 

এ ঘটনায় মামলা করেছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘মামলা করে কী হবে। পুলিশ আছে, এর মধ্যে গুলি করেছে।’

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মুখোশ পরা চার জন ব্যক্তি আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে ওই ব্যবসায়ীর বাসার কাছে আসে। এরপর বাসাটি লক্ষ্য করে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি ছুড়তে থাকে। চার সন্ত্রাসীর মধ্যে একজনের দুই হাতে দুটি পিস্তল ছিল। বাকি তিন জনের মধ্যে একজন সাব মেশিনগান (এসএমজি), একজন চায়নিজ রাইফেল এবং অন্যজন শটগান থেকে গুলি ছোড়ে।

খবর পেয়ে নগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) হোসাইন কবির ভূঁইয়ার নেতৃত্বে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পুলিশের একটি দল। পরিদর্শন শেষে হোসাইন কবির ভূঁইয়া বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা একটি প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলযোগে ওই এলাকায় আসে। গাড়ি একটু দূরে রেখে হেঁটে বাসার কাছে গিয়ে গুলি করেছে। এরপর কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, চাঁদার জন্য বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ তার লোকজন দিয়ে ঘটনাটি ঘটিয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অস্ত্রধারীরা মুখোশধারী হওয়ায় তাদের সহজে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। তবে সাজ্জাদের সহযোগী সন্ত্রাসী মো. রায়হান ও বোরহান এ ঘটনায় জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।’

স্মার্ট গ্রুপ একটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী। ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের ছোট ভাই মুজিবুর রহমান ২০২৪ সালের নির্বাচনে চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। গত ২ জানুয়ারিও তাদের বাসাটিতে গুলি করার ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছিল পুলিশ। তবে কোনও মামলা করা হয়নি।

কে এই সাজ্জাদ

চট্টগ্রাম নগরের চালিতাতলী এলাকার ঠিকাদার আবদুল গণির ছেলে সাজ্জাদ আলী খান মূলত অপরাধজগতে পরিচিত হয় ১৯৯৯ সালে কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খান খুনের পর। সাক্ষীর অভাবে ওই মামলায় খালাস হলেও নগরের অপরাধজগতে তাকে নিয়ে শুরু হয় নতুন এক অধ্যায়। ২০০০ সালের ১২ জুলাই বহদ্দারহাটে ছাত্রলীগের ছয় নেতাকর্মীসহ আট জনকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়। পুলিশ ও বিভিন্ন সংস্থার দাবি ‘এইট মার্ডার’ নামে পরিচিত সেই হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেয় সাজ্জাদ। একই বছরের অক্টোবরে একে-৪৭ রাইফেলসহ গ্রেফতার হয়। পরে জামিনে বেরিয়ে ২০০৪ সালে দেশ ছাড়ে। এরপর থেকেই বিদেশে বসে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে তার বাহিনী। অবশ্য ‘এইট মার্ডার’ মামলা থেকেও খালাস পায় সাজ্জাদ।

শুরুতে নুরনবী ম্যাক্সন, সরোয়ার হোসেন, আকবর আলী ও ছোট সাজ্জাদকে নিয়ে গড়ে ওঠে এই বাহিনী। ম্যাক্সন ভারতে মারা যায়, সরোয়ার দল ছাড়ে। গত বছরের ৫ নভেম্বর নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় বিএনপির প্রার্থীর নির্বাচনি গণসংযোগে সরোয়ারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য বড় সাজ্জাদকে দায়ী করা হয়। দীর্ঘ দুই দশক ধরে দেশের বাইরে বসেই সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী নিয়ন্ত্রণ করছে নগর ও জেলার বিস্তৃত সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক। সাজ্জাদ ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড আসামির তালিকায় আছে। তালিকা অনুসারে তার নাম সাজ্জাদ খান।

পুলিশ জানায়, চাঁদা না পেলেই গুলি করে সাজ্জাদের অনুসারীরা। নগরের চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী ও পাঁচলাইশ এবং জেলার হাটহাজারী, রাউজানসহ পাঁচ থানার পাঁচ লাখের বেশি মানুষকে সাজ্জাদের বাহিনীর কারণে আতঙ্কে থাকতে হয়।

গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত জেলায় জোড়া খুনসহ ১০টি খুনে সাজ্জাদের অনুসারীদের নাম উঠে এসেছে। তারা কখনও আধিপত্য বজায় রাখতে নিজেদের প্রতিপক্ষকে খুন করছে। আবার কখনও ভাড়াটে খুনি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। ২০১৫ সাল থেকে দেশে বড় সাজ্জাদের বাহিনীর নেতৃত্বে আসে বুড়ির নাতি খ্যাত ছোট সাজ্জাদ ওরফে সাজ্জাদ হোসেন। বর্তমানে সে কারাগারে আছে।

পুলিশ বলছে, গত বছর বড় সাজ্জাদ ও ছোট সাজ্জাদের সমালোচনা করায় এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে নগরীর পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় বায়েজিদের আরেক সন্ত্রাসী আকবর হোসেন ওরফে ঢাকাইয়া আকবরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে সক্রিয় আছে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী। গত ১৫ মার্চ ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর নেতৃত্ব আসে ১৫ মামলার আসামি মোহাম্মদ রায়হান ও মোবারক হোসেন ওরফে ইমনের হাতে।

এই দলে আরও আছে খোরশেদ, ভাতিজা মোহাম্মদ, নাজিম উদ্দিন, ববি আলম, কামাল, হাসান, নুরুল হক, বোরহান, মবিন, কাদের, তপু, আজম, মনির, তুষার, তুহিন, সোহেল, ছালেক ও এরশাদ—যাদের অধিকাংশই অস্ত্র চালনায় বিশেষ দক্ষ। দলটিকে বিদেশ থেকে ফোনে নিয়মিত নির্দেশনা পাঠায় সাজ্জাদ।




Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button